Published : 26 Jun 2026, 11:48 AM
কালো পোশাক পরে, খালি পায়ে, শোকের পতাকা হাতে নিয়ে ‘হায় হোসেন হায় হোসেন’ মাতম তুলে রাজধানীতে তাজিয়া মিছিল বের করেছে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।
শুক্রবার সকালে আশুরা উপলক্ষে পুরান ঢাকার হোসেনী দালান ইমামবাড়া প্রাঙ্গণ থেকে এই মিছিল বের হয়।
হিজরি ৬১তম বর্ষের (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ১০ মহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মুসলমানদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) শহীদ হন।
সেই থেকে ১০ মহররম মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের প্রতীক। বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে দিনটিকে পালন করেন ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে।
এই দিনে প্রতিবছর ইমামবাড়া থেকে বের হয় আশুরার প্রধান তাজিয়া মিছিল। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ধানমণ্ডিতে প্রতীকী ‘কারবালা’ প্রাঙ্গণে তা শেষ হয়। কেবল কোভিড মহামারীরর সময় স্বাস্থ্য বিধিনিষেধের কারণে তা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

সকাল থেকে পুরান ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিশু, নারী থেকে নানা বয়সের মানুষ ভিড় করেন মিছিলে অংশ নিতে। সে সময় কারও চোখে অশ্রু, কারও বুক চাপড়ানোর দৃশ্যে ফুটে ওঠে কারবালার বেদনার স্মৃতি। সকাল ১০টার কিছু পর হোসেনী দালান থেকে বের হয় এবারের তাজিয়া মিছিল।
মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া পারভেজ রেজা বলেন, "প্রতি বছর এই দিনে আমরা মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনকে স্মরণ করি। ইসলামের জন্য তিনি ও তার পরিবারের যে আত্মত্যাগ, সেটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, কী নির্মমতার মধ্য দিয়ে কারবালায় সত্যের পক্ষে থাকা মানুষগুলো শহীদ হয়েছিলেন।"
তবে শোক প্রকাশের এই আয়োজন নিয়ে সমালোচনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

"অনেকে এটাকে বিদআত বলেন, মানুষকে শোক পালন থেকে বিরত থাকতে বলেন। কিন্তু আমরা তো ইয়াজিদের বিরুদ্ধে আর ইমাম হোসাইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই এই শোক পালন করি। তাই এসব বন্ধ করতে চাওয়া খুবই দুঃখজনক," বলেন তিনি।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও দেখা যায়।
কামরাঙ্গীরচর থেকে আসা মাসুদ রানা বলেন, "আজ আমরা শোক প্রকাশ করতে এসেছি। ইসলামের জন্য ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও এই মিছিলে অংশ নিই।"
হাজারীবাগ থেকে সন্তানদের নিয়ে আসা সামিনা রহমান বলেন, "আমার শাশুড়ি প্রতি বছরই আসেন। আমিও এখন তার সঙ্গে আসি। শোক পালনের পাশাপাশি ঘোড়ার পা ধোয়া দুধ সংগ্রহ করে গায়ে মাখি, বোতলে করে বাড়িতেও নিয়ে যাই। আমাদের বিশ্বাস, এতে মনের অনেক বাসনা পূরণ হয়।"

হোসেনী দালান থেকে বের হয়ে মিছিলটি পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পুরো আয়োজনে শোক, সংযম আর ইতিহাস স্মরণের আবহ ফুটে ওঠে। কেউ বুক চাপড়ে মাতম করেছেন, কেউ নীরবে হেঁটেছেন। অংশগ্রহণকারীদের কথায়, কারবালা শুধু একটি যুদ্ধের স্মৃতি নয়; এটি সত্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক।
মিছিল ঘিরে ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলে দা, ছোরা, তলোয়ার, বল্লম, কাঁটা, আতশবাজি ও বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু বহনে আগেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল পুলিশ। মিছিলের পথে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশও মোতায়েন দেখা গেছে।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে আজিমপুর, নিউমার্কেট হয়ে ধানমন্ডি লেকে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে তাজিয়া মিছিলটির।