Published : 26 Aug 2025, 10:47 PM
দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ঢাকা-১ আসনের প্রস্তাবিত সীমানা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন আবেদনকারী।
তারা ২০০১ সালের নির্বাচনের আসন ধরে দুই উপজেলা নিয়ে আলাদা দুটি আসন দাবি করেছেন।
তবে ‘দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে একদল এলাকাবাসী ঢাকা-১ আসনকে পুনর্বিন্যাস না করারও দাবি জানিয়েছে।
আর ঢাকা-২ আসনের প্রস্তাবিত সীমানা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আগের সীমানা পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছেন কামরাঙ্গীরচর এলাকার কয়েকজন আবেদনকারী।
মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে বেলা আড়াইটা থেকে ৫টা পযন্ত ঢাকা-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ১০, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮ ও ১৯ আসনের দাবি-আপত্তি শুনানি হয়।
দোহার-নবাবগঞ্জ নিয়ে কাড়াকাড়ি
দোহার-নবাবগঞ্জ নিয়ে ঢাকা-১ আসন। গতবারের মতো এবারও একই সীমানা রেখেছে নির্বাচন কমিশন-ইসি।
এ খসড়ার বিরোধিতা করেছে একদল প্রতিনিধি, আরেক পক্ষ ইসির সিদ্ধান্তে খুশি।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সামনে আসেন আসনটি বহাল রাখার পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, “দোহার-নবাবগঞ্জকে আলাদা করে দোহারকে একটা আসন করা হলে উন্নয়নমূলক কাজে বাধাগ্রস্ত হবে। আবার অনেকে নির্বাচনকে বিলম্বিত করার জন্য ঢাকা-১ আসনকে ভাগ করতে চাচ্ছে। আমরা মনে করি, এটা একটা ষড়যন্ত্র। আমরা আশা করি এটা যেভাবে আছে, সেভাবেই রাখা হবে।”
ইসির প্রস্তাবের পক্ষে শুনানি করা আরেক আইনজীবী আবদুর রশিদ মোল্লা বলেন, “আমরা চাই সবার স্বার্থে ঢাকা-১ আসনকে একসাথেই রাখা হোক। আমরা দোহার-নবাবগঞ্জবাসী একসাথেই থাকতে চাই। কেউ বিভ্রান্ত সৃষ্টি করলে কোন কাজ হবে না।”
দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে আলাদা দুটি আসন করার দাবি জানিয়েছেন দোহার ও নবাবগঞ্জ সংসদীয় আসন (ঢাকা-১ ও ২) পুনরুদ্ধার কমিটির আহ্বায়ক মো. হুমায়ূন কবীর।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “২০০৮ সালের আগে বিগত সব নির্বাচনে দোহার উপজেলা নিয়ে ঢাকা-১ ও নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ঢাকা-২ আসন গঠিত ছিল। এত বড় সংসদীয় আসন একজন জনপ্রতিনিধির প্রতিনিধিত্ব করা কঠিন।”
ঢাকা-২ নিয়ে আপত্তি, আগের সীমানা চায়
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-২ আসনের সীমানা ছিল- জিনজিরা, আগানগর, তেঘরিয়া, কোন্ডা, শুভাঢ্যা ছাড়া কেরানীগঞ্জ উপজেলার বাকি সব ইউনিয়ন; দক্ষিণ সিটির ৫৫-৫৭ নম্বর ওয়ার্ড (কামারাঙ্গীরচর থানা এলাকা) এবং সাভার উপজেলার আমিনবাজার, তেঁতুলঝরা ও ভাকুর্তা।
এবার কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকার এসব ওয়ার্ড বাদ দিয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার তাড়ানগর, কালাতিয়া, হজরতপুর, রুহিতপুর ও শাক্তা ইউনিয়ন এবং সাভার উপজেলার আমীনবাজার, তেতুলজোড়া, ভাকুর্তা, কাউন্দিয়া, বনগাঁও ও বিরুলিয়া ইউনিয়ন নিয়ে এ আসনটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
কামারাঙ্গীরচর থানার ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড তিনটি ঢাকা-২ আসনের সঙ্গেই রাখার দাবি জানানো হয়েছে শুনানিতে।
শুনানি শেষে আইনজীবী নুরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ সাংবাদিকদের বলেন, এসব ওয়ার্ডকে ঢাকা-২ আসন থেকে আলাদা করেছে কমিশন। সেখানে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডকে ঢাকা ১০ আসনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। আর ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ঢাকা-৭ আসনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইসি এই আসনটির প্রস্তাবিত সীমানা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ৫৯টি আবেদন পড়েছে। ৫৯টি আবেদনের মধ্যে ৫৭টি আবেদন হচ্ছে বিপক্ষে আর দুটি আবেদন পক্ষে।
সোহাগ বলেন, “৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কামরাঙ্গীরচরের অধীনে যেটা আছে, এই তিনটি ওয়ার্ড, ঢাকা-২ আসনের মধ্যেই থাকবে।…এই তিনটি ওয়ার্ডকে যদি এ আসন থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ঢাকা দুই আসনে কোনো থানা থাকে না।
“আমরা বলেছি যে পূর্বের ঢাকা-২ আসনে কেরানীগঞ্জের ছয়টি সাতটি ইউনিয়ন, সাভারের কয়েকটি ইউনিয়ন এবং কামরাঙ্গীরচর থানার ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড রয়েছে। এটাই কামরাঙ্গীচরের জনগণ এবং ঢাকা-২ আসনের সর্বস্তরের জনগণ চাওয়া।”

ঢাকা ১৬ ও ১৮ আসন
ইসি ঢাকা উত্তর সিটির ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-১৬ আসন প্রস্তাব করেছে।
আর ১, ১৭, ৪৩ থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড ও বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে ঢাকা-১৮ আসনের খসড়া করা হয়েছে।
৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ ওযার্ড নিয়ে তুরাগ থানা এলাকা।
শুনানি শেষে ইসির এ প্রস্তাবের পক্ষের ফুয়াদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তুরাগের জনগণ ঢাকা-১৮ এর সঙ্গে অভ্যস্ত। তারা ঢাকা-১৬ আসনের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চান না।
“আশা করি, নির্বাচন কমিশন ঢাকা-১৮ আসনের জনগণের এ দাবিকে মূল্যায়ন করবে।”
তৃতীয় দিনের শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ পরিচালক মো. শরিফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, এদিন ঢাকা অঞ্চলের ২৮টি আসনে ৩০৯টি আবেদনের শুনানি হয়। এর মধ্যে ইসির প্রকাশিত খসড়ার বিপক্ষে ২৫৯টি এবং পক্ষে ৫০টি আবেদনের শুনানি হয়েছে।
এদিন মানিকগঞ্জ-১, ২, ৩; মুন্সীগঞ্জ ১, ২, ৩; গাজীপুর ১, ২, ৬; নরসিংদী-৩, ৪, ৫, নারায়ণগঞ্জ-৩, ৪, ৫; আড়াইটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঢাকা-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ১০, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮ ও ১৯ আসনের শুনানি হয়।
গেল ৩০ জুলাই ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে ভোটার সংখ্যার সমতা আনতে গিয়ে বাগেরহাটের আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটির প্রস্তাব করা হয়। আর গাজীপুর জেলায় একটি আসন বাড়িয়ে করা হয় ছয়টি।
গাজীপুরের ক্ষেত্রে ইসি যা প্রস্তাব করেছে-
|
আসন |
দ্বাদশ সংসদের এলাকা |
ত্রয়োদশ সংসদের প্রস্তাবিত এলাকা |
|
গাজীপুর-১ |
কালিয়াকৈর; গাজীপুর সিটির ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড |
কালিয়াকৈর; গাজীপুর সিটির ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ড |
|
গাজীপুর-২ |
গাজীপুর সিটির ১৯ থেকে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড ও ৪৩ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা |
গাজীপুর সিটির ১৩ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড; গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউনিয়ন |
|
গাজীপুর-৩ |
শ্রীপুর, গাজীপুর সদরের মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়, পিরুজালী ইউপি |
শ্রীপুর উপজেলা, গাজীপুর সদরের মির্জাপুর,ভাওয়াল গড় ও পিরুজালী ইউপি এবং গাজীপুর সেনানিবাস |
|
গাজীপুর-৫ |
কালীগঞ্জ, গাজীপুর সিটির ৪০ থেকে ৪২ নম্বর ওয়ার্ড, গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউপি |
কালীগঞ্জ উপজেলা |
|
গাজীপুর-৬ |
আগে ছিল না |
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩৪ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড |
মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে চার আসন দাবি
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে চারটি আসন পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন জেলা দুটির প্রতিনিধিরা।
মঙ্গলবার সকালের শুনানিতে মানিকগঞ্জের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার খাইরুল আলম চৌধুরী বলেন, “২০০১ সাল পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলায় চারটি সংসদীয় আসন ছিল। ২০০৮ সালে মানিকগঞ্জে একটি আসন কমিয়ে তিনটি করা হয়।
“এতে করে সংসদে মানিকগঞ্জের জনগণের প্রতিনিধিত্ব কমেছে। চারটি আসন থাকায় মানিকগঞ্জে যে বরাদ্দ ছিল তা কমে গেছে। আমরা চারটি আসনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছি।”
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা বলেন, “আমি এখানে এসেছি মানিকগঞ্জের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে। ২০০১ সালের ন্যায় মানিকগঞ্জে চারটি আসনের দাবি- মানিকগঞ্জের সকল স্তরের মানুষের দাবি।”
এদিকে মুন্সীগঞ্জের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক খায়রুল বারী রনি বলেন, “মুন্সীগঞ্জের এখন তিনটি আসন রয়েছে। এর আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ২০০১ সালের মতো চারটি আসন করার জন্য আমরা দাবি জানিয়েছি। সেই সঙ্গে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেছি।”
শেষদিন বুধবার শুনানি হবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চলের। সেদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পঞ্চগড়-১, ২, রংপুর-১, কুড়িগ্রাম-৪, সিরাজগঞ্জ-২, ৫, ৬, পাবনা-১; আড়াইটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টাঙ্গাইল-৬, জামালপুর-২, কিশোরগঞ্জ-১, সিলেট-১, ফরিদপুর- ১, ৪, মাদারীপুর-২, ৩, শরীয়তপুর-২ ও ৩ আসনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
রংপুরের সাতটি, রাজশাহীর ২৩২টি, ময়মনসিংহের তিনটি, ফরিদপুরে ১৮টি এবং সিলেট অঞ্চলের দুটি দাবি আপত্তির শুনানি হবে।
১০ অগাস্ট পর্যন্ত ৮৩টি সংসদীয় এলাকার সীমানা নিয়ে এক হাজার ৭৬০টি আপত্তি-পরামর্শের আবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা হয়। শুনানি শেষে এসব আপত্তি নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করবে ইসি।
আরও পড়ুন: