Published : 01 Dec 2025, 09:42 PM
পূর্বাচলে শেখ রেহানার প্লট দুর্নীতির মামলায় সোমবার ঢাকার আদালত যে রায় দিয়েছে, তা দেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি ছাপা হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও।
এই মামলায় ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীকেও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর টিউলিপের মা রেহানার ৭ বছর, খালা শেখ হাসিনার ৫ বছর সাজা ঘোষণা করা হয়েছে।
পারিবারিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠার পর যুক্তরাজ্যে প্রতিমন্ত্রীর পদ খোয়ানো টিউলিপের এই সাজার রায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ ছেপেছে। তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আদালতে চলা বিচারের বিষয়টি সামনে এনেছে বিবিসি ও রয়টার্সসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম।

টিউলিপের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগ, তিনি তার মাকে পূর্বাচলের ১০ কাঠার প্লট পাইয়ে দিতে খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবিত করেছেন।
তবে এই অভিযোগসহ পারিবারিক সব দুর্নীতির অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন ব্রিটিশ লেবার এমপি টিউলিপ। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক’ বলেছেন তিনি।
রায় ঘোষণার পর বিবিসি খবরের শিরোনাম করেছে, ‘টিউলিপ সিদ্দিক এমপি গিভেন জেইল সেনটেন্স ইন বাংলাদেশ আফটার ট্রায়াল ইন হার অ্যাবসেন্স’।
প্রতিবেদনে শুরুতে টিউলিপের অনুপস্থিতির বিষয়টিসহ রায়ের তথ্য লেখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এরপর মামলার অভিযোগ প্রত্যাখান করে টিউলিপ যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি তুলে ধরা হয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, “লন্ডনে বাস করা টিউলিপ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার সাজা খাটার সম্ভাবনাও নেই। এই লেবার এমপি বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক।”
বার্তা সংস্থা রয়টার্স শিরোনাম করেছে ‘ইউকে ল মেকার টিউলিপ সিদ্দিক হ্যান্ডেড জেইল সেনটেন্স ইন অ্যাবসেনশিয়া ইন বাংলাদেশ গ্রাফট কেইস’।
প্রতিবেদনে রায়ের খবর পরই সিদ্দিকীর অভিযোগ অস্বীকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। টিউলিপ এক বিবৃতিতে এই বিচারকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক’ বলেছেন, লিখেছে রয়টার্স।
প্রতিবেদনে টিউলিপের বক্তব্যে লেখা হয়েছে, “এই ক্যাঙ্গারু কোর্টের ফলাফল যেমন অনুমেয়, তেমনি অযৌক্তিকও।”

লেবার পার্টির একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, “যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পাননি টিউলিপ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিস্তারিতও তাকে জানানো হয়নি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে তাকে আইনি প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই মামলায় সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা এই বিচার মানি না।”
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের যে অপরাধী প্রত্যাবর্তন চুক্তি নেই, সে কথাও লেখা হয়েছে প্রতিবেদনে।
গার্ডিয়ান শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশ কোর্ট সেনটেন্সেস ইউকে এমপি টিউলিপ সিদ্দিক টু টু ইয়ার্স ইন প্রিজন ইন অ্যাবসেনশিয়া’।
প্রতিবেদনে রায়ের তথ্যের পর গার্ডিয়ান লিখেছে, টিউলিপের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলেছে। সোমবার রায় ঘোষণার সময় হাসিনা, টিউলিপ, রেহানা এমনকি পরিবারের এক ডজনের বেশি সদস্যের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

“বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অপরাধী প্রত্যাবর্তন চুক্তি নেই এবং টিউলিপের সাজা খাটারও সম্ভাবনা নেই। লেবার পার্টি বলছে, টিউলিপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি সাজার রায়কে তারা স্বীকৃতি দিচ্ছে না। কারণ এ মামলায় তাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
রায়ের পর টিউলিপ গার্ডিয়ানকে বলেন, এ রায়কে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু তিনি দেখছেন না।
“এই পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ ফলাফল যেমন অনুমানযোগ্য ছিল, তেমনি এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
দ্য টেলিগ্রাফ শিরোনাম করেছে, ‘টিউলিপ সিদ্দিক সেনটেন্সড টু টু ইয়ার্স ইন প্রিজন ওভার করাপশন ইন বাংলাদেশ’।
প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, প্রাক্তন এ লেবার প্রতিমন্ত্রীর অনুপস্থিতিত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর মামলায় তার কী দায়, সেটি লেখা হয়েছে। মামলার রায় সম্পর্কে টিউলিপ সিদ্দিকের বক্তব্যও স্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয়, “সোমবার রায় ঘোষণার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোনস স্কাই ডটকমকে বলেন, ‘টিউলিপ খুব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অনিয়মের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
“যতদূর জানি, তিনি বাংলাদেশের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে সফল হননি এবং এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি যতটা না আইনি, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক।”
এই ক্ষেত্রে সরকার (ব্রিটিশ) টিউলিপকে সমর্থন দিচ্ছে কিনা, এই প্রশ্নে জোনস ‘সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন’।
অপরদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস শিরোনাম করেছে, ‘এক্স-ইউকে মিনিস্টিার টিউলিপ সিদ্দিক রিসিভস টু-ইয়ার জেইল সেনটেন্স ইন বাংলাদেশ’।
প্রতিবেদনের রায়ের তথ্যের পর লেখা হয়েছে, আসামিদের অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকার ফলে রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ইনডিপেন্ডেন্ট খবরের শিরোনাম করেছে, ‘লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক হ্যান্ডেড টু-ইয়ার প্রিজন সেনটেন্স ফর করাপশন ইন বাংলাদেশ’।
আসামিদের অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এমপি টিউলিপ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর বাংলাদেশের সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকার ফলে সাজা কার্যকরের সম্ভাবনাও নেই।

ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড শিরোনাম করেছে, ‘টিউলিপ সিদ্দিক হিটস আউট অ্যাট ‘ফ্লড অ্যান্ড ফার্সিক্যাল’ করাপশন ভার্ডিক্ট অ্যাজ সি গেটস জেইল সেনটেন্স ইন বাংলাদেশ’।
প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, দুর্নীতির মামলায় টিউলিপের অনুপস্থিতিতে চলা বিচারে তার দুই বছরের সাজা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের আদালত। আদালতের আনা অভিযোগ ও সেটি প্রত্যাখান করে টিউলিপের দেওয়ার বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।
ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে, সোমবার সকালে এই ব্রিটিশ এমপিকে তার উত্তর লন্ডনের বাড়িতে দেখা গেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায়কে ‘বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম সোমবার টিউলিপের মা শেখ রেহানার এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
মামলার অভিযোগ ছিল, ঢাকা শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন সুবিধা থাকার পরেও ‘সেই তথ্য গোপন করে আইন ভেঙে দুর্নীতির মাধ্যমে’ শেখ রেহানা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। শেখ হাসিনা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে বোনকে প্লট বরাদ্দে ‘সহায়তা’ করেন। এবং ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানাকে প্লট পাইয়ে দিতে খালা শেখ হাসিনাকে ‘প্রভাবিত’ করেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে টিউলিপ বলে আসছেন, এগুলো ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান। বোন শেখ রেহানাও সে সময় তার সঙ্গে যান। আর টিউলিপ যুক্তরাজ্যেই থাকেন।
তাদের ‘পলাতক’ দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে। ফলে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা লড়ার সুযোগ পাননি।
আরও পড়ুন-
আদালতের রায়কে 'প্রহসন' বললেন টিউলিপ
রেহানার প্লট দুর্নীতি: খুশি নন খুরশীদের আইনজীবী, দুদকও অসন্তুষ্ট