১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অকালবৃষ্টিতে ডুবেছে ক্ষেতের ফসল; ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে

“এই সময়ের বৃষ্টি আমন চাষিদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।”

ইমরান হোসেন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Nov 2025, 11:50 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:35 PM

গত তিন দিনের অস্বাভাবিক ভারি বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডুবে গেছে কাটার উপযোগী ধান ও সবজির ক্ষেত; আবহাওয়া অফিস বলছে, নভেম্বর মাসে এমন বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে বিরল। 

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ২৮ অক্টোবর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোনথার অবশিষ্টাংশ থেকেই এমন বৃষ্টির সূত্রপাত। প্রথমে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এবং পরে মধ্যাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি ঝরায়।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২ নভেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় টাঙ্গাইলে দেশের সর্বোচ্চ ১৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৮৭ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর নভেম্বর মাসে একদিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টি।

এর আগে নভেম্বরে একদিনে সর্বোচ্চ ৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড ছিল ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বর।

আবহাওয়াবিদ তারিফুল নেওয়াজ কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নভেম্বরে এত বৃষ্টি খুবই বিরল ঘটনা।”

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোনথার অবশিষ্টাংশ পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে বিহার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, ফলে ভারি বর্ষণ হয়।

মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পর নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় একটি সাধারণ ঘটনা। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এ মাসে এত বৃষ্টি আগে হয়নি। 

সিরাজগঞ্জের তারাশে ৩১ অক্টোবর সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় একই সময়ে বৃষ্টি হয়েছে ১৬২ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষায়, ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতকে ‘অতি ভারি বৃষ্টি’ বলা হয়। সে হিসেবে গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জেও অতি ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যদিও সেখানে নতুন আবহাওয়া স্টেশন স্থাপনের কারণে আগের তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়নি।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক একেএম রুহুল আমিন বলেন, “এই সময়ের বৃষ্টি আমন চাষিদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।”

আমন হল বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রধান ধানের মৌসুম। সারা বছর যত ধান উৎপাদন হয়, এই আমন মৌসুমেই তার ৪১ শতাংশের (প্রায় চার কোটি টন) ফলন হয়।  

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্যও আমন মৌসুম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা এই ধানের একটি বড় অংশ নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখেন।

রুহুল আমিন বলেন, বৃষ্টির কারণে উত্তরের বিশাল এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, অনেক আমন চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রংপুর সদর উপজেলার পানবাড়ি এলাকার কৃষক অবিনাশ মহরী বলেন, “অনেক কষ্ট করে চার একর জমিতে আমন আবাদ করেছি এখন যখন কাটার সময়, তখনই বৃষ্টি এসে সব নষ্ট করে দিল।”

হতাশার সুরে তিনি বলেন, “ধানের ফলন ভালো হওয়া দেখে আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। কিন্তু এখন জমিতে পানি জমে শীষ ভিজে যাচ্ছে, ফলন অর্ধেক হয়ে যেতে পারে।”

পীরগঞ্জ উপজেলার আবুল হোসেন বলেন, “অসময়ে এমন বৃষ্টি হওয়ার কারণে আমাদের ক্ষেতের ধান মাটিতে নুয়ে পড়ছে, অর্ধেক ধান নষ্ট হয়ে যাবে।”

মিঠাপুকুর উপজেলার ধাপের হাট এলাকার কৃষক খিতিশ চন্দ্র বমর্ন বলেন, “যে ধানগাছ বাতাসে শুয়ে পড়েছে, তাতে কয়েক দিনের মধ্যেই পোকা ধরবে। তখন ধান চিটা হয়ে যাবে। এত পরিশ্রমের ফসল এভাবে নষ্ট হতে বসেছে, ভাবতেই পারছি না।”

নভেম্বর মাসেই শীতকালীন সবজি তোলা শুরু হয়, যা কৃষকদের ধানের দুই মৌসুমের মাঝের সময়টায় কিছু নগদ আয়ের ব্যবস্থা করে দেয়। এবার সেখানেও তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।    

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার পোলাডাঙ্গা এলাকার কৃষক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, তাদের এলাকায় বৃষ্টিতে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া ও টমেটোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পেঁয়াজ ও মরিচের ক্ষেতও ডুবে গেছে।

সরিষা ও মসুর ডালের মত শীতকালীন ফসলও এই অকালবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিন দিনের এই বৃষ্টিতে কৃষির ক্ষতির জেলাভিত্তিক কিছু তথ্য মিললেও সরকারিভাবে সামগ্রিক কোনো হিসাব এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

রংপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “নিম্নচাপের প্রভাবে জেলার পাঁচ উপজেলায় অন্তত ৭৫ হেক্টর জমির ধান গাছ ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি- যেসব জমিতে ধান শুয়ে পড়েছে, সেগুলো গোছা করে বেঁধে দিতে। এতে ক্ষতি কিছুটা কমবে।”

রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা রেকর্ড রাখা শুরুর পর নভেম্বর মাসে একদিনে সপ্তম সর্বোচ্চ।

ঢাকায় এ মাসে সর্বোচ্চ ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৩০ নভেম্বর।

গত বছর আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে গত চার দশকে বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়ার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমেছে, বেড়েছে তাপপ্রবাহ।

এ বছর মৌসুমি বায়ু গত চার দশকের তুলনায় আগেভাগে শুরু হলেও তার প্রভাব ছিল দুর্বল। মৌসুমি বায়ুর প্রথম দুই মাস জুন ও জুলাইয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম বৃষ্টি হয়। 

অগাস্টে মোটামুটি স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলেও সেপ্টেম্বরে আবার স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়। অক্টোবরের বৃষ্টিপাতের হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি।

এপিডেমিওলজিস্ট এ এম জাকির হুসেনের মতে, এই অকালবৃষ্টির একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে যে, ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমতে পারে। তবে সেটা নির্ভার করছে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমার ওপর।

“তবে এই বৃষ্টি যদি শীত আনতে না পারে, তাপ ও আর্দ্রতা ধরে রাখে, তাহলে মশার প্রজনন ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে। সেক্ষেত্রে ডেঙ্গুর প্রকোপ নভেম্বর জুড়েই থাকবে।”

মশাবাহিত এ রোগে অক্টোবরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২২ হাজার ৫২০ জন; আর মৃত্যু হয়েছে ৮০ জনের। মাসভিত্তিক হিসাবে এই দুই সংখ্যাই এ বছরের সর্বোচ্চ। 

সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৬২ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন; মৃত্যু হয়েছে আরো পাঁচজনের। 

সব মিলিয়ে এ বছর ২৮৩ জনের মৃত্যু ঘটিয়েছে ডেঙ্গু। এ রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭১ হাজার ৬৭৫ জন।