Published : 11 Nov 2025, 09:07 PM
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে তা স্পষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আইনগত সহায়তা প্রদান অধ্যাদেশ সংশোধন বিষয়ক এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
আইন উপদেষ্টা বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে আমাদের একটা ঐক্যবদ্ধ নির্দেশনা দেবেন, এ ধরনের প্রত্যাশা আমরা করেছিলাম। কিন্তু প্রত্যাশা করেই আমরা বসে থাকিনি। আমরা নিজেদের মতো কাজ করেছি।
“সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তা আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে পরিষ্কারভাবে জানতে পারবেন।”
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট কবে হবে—সেই বিরোধ মিটিয়ে দলগুলোকে সমঝোতায় আসতে অন্তর্বর্তী সরকার সাত দিন সময় দিয়েছিল, তা ফুরিয়েছে সোমবার।
এই সাত দিনে সমঝোতার কোনো খবর সরকার কিংবা দলগুলোর তরফে আসেনি। এমনকি দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে একসঙ্গে বসার কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়নি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভাষ্য, তারা আলোচনায় বসার জন্য বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাড়া মেলেনি।
অন্যদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে যতটুকু সমঝোতা, তা হয়ে গেছে। এ নিয়ে আলোচনার আর কোনো সুযোগ নেই। আর নতুন করে আলোচনায় বসতে হলে সেটার প্রস্তাব সরকারের তরফে আসতে হবে, কোনো দলের কাছ থেকে নয়।
আসিফ নজরুল বলেন, “আমরা উপদেষ্টা পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ে এটা আলোচনা করছি। সব দলের প্রত্যাশার প্রতি সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের এবং জনগণের স্বার্থে যা করা দরকার সেটাই আমরা করতে যাচ্ছি।”
গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভাজনের সূত্রপাত মূলত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রায় আট মাসের সংলাপের শেষ দিকে এসে।
তবে এই বিরোধকে একপাশে রেখে ঐকমত্যে পৌঁছানো একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’–এ সাক্ষর করে দলগুলো।
২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা এই দলিলে সই করেন।
সবশেষ গেল ২৮ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন।
এর মধ্যে গণভোটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনেও হতে পারে, নির্বাচেনের আগেও হতে পারে।
কমিশনের এমন সুপারিশের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে। কিন্তু সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সুপারিশ হাতে পাওয়ার ছয় দিনের মাথায় এসে গত ৩ নভেম্বর দলগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানায়; সময় দেয় এক সপ্তাহ।
সেদিন উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গণভোট কখন হবে, গণভোটের বিষয়বস্তু কী হবে, জুলাই সনদে বর্ণিত ভিন্ন মতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবগুলোর আলোকে জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ।
“এসব ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
এরপর গেল শনিববার ঢাকায় ‘নির্বাচনী ইশতেহারে প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “যদি রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।”
আর সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দলগুলো মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নিজ থেকেই একটি ‘সিদ্ধান্ত নেবে’।
তিনি বলেন, “সরকার দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দিয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসেনি। তারা যেহেতু সাত দিনের মধ্যে আলোচনায় বসেনি, সেক্ষেত্রে সরকার একটা সিদ্ধান্ত নেবে। আমি তো কাউকে বলতে শুনিনি যে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।”
‘আইনগত সহায়তা প্রদান (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ’-এর খসড়া
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মতবিনিময় সভায় এদিন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পক্ষ থেকে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া উপস্থাপন করা হয়।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ এবং জুলাই সনদে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের উপর গুরুত্ব আরোপ করার প্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সংস্থার কার্যপরিধি সম্প্রসারণ এবং আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংস্থাটিকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে অধিদপ্তরের দায়িত্ব ও কার্যাবলি, আইনগত সহায়তা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, মহানগর কমিটি গঠন, বেসরকারি সংস্থার কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ এবং মধ্যস্থতাকারীদের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সাবেক জেলা জজ মোতাহার হোসেন, ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল কনসালটেন্ট ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন সভায় উপস্থিত ছিলেন।