বনশ্রীতে গৃহকর্মীর মৃত্যু: সংঘাতের ঘটনায় আসামি ২ সহস্রাধিক, গ্রেপ্তার নেই
মামলা হয়েছে তিনটি। তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন, জানান রামপুরা থানার ওসি।
ঢাকার বনশ্রী আবাসিক এলাকায় এক গৃহকর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পর রামপুরা থানায় তিনটি মামলা হয়েছে।
রোববার রাতে করা এসব মামলায় দুই সহস্রাধিক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের খবর দিতে পারেনি পুলিশ।
বনশ্রীর ডি ব্লকে রোববার সকালের দিকে হোসেন মঞ্জিল নামের এক বাড়ির গেইটের সামনে এক নারীর রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। আসমা বেগম নামের ওই গৃহকর্মী কানিজ ফাতেমা নামের এক নারীর মিরপুরের বাসায় থাকতেন। কানিজ তিন দিন আগে গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বনশ্রীতে বাবা দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে এসেছিলেন।
ওই লাশ দেখে আসমাকে হত্যা করা হয়েছে-এমন কথা ছড়িয়ে পড়লে বনশ্রী এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। আশপাশের বাড়ির গৃহকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমজীবীরাও সেখানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন।
এরইমধ্যে পুলিশ সেখানে গিয়ে মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেলে পাঠানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়রা বাধা দেয়। এক পর্যায়ে লোকজন ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে। তারা ওই বাড়ির নিচতলায় ভাঙচুর চালায় এবং নিচতলায় থাকা দুটি গাড়িতে আগুন দেয়। সেই আগুন পরে বাড়ির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাতে রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমানসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।
এ ঘটনায় তিনটি মামলা হওয়ার কথা জানিয়ে ওসি মশিউর জানান, সোমবার পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।
নিহতের একমাত্র সন্তান বাল্কহেড কর্মী আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।
বাড়িটিতে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় হাজার-বারোশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন গাড়ি চালক উজ্জ্বল ভুঁইয়া।
আর পুলিশের কাজে বাধা, হামলা ও মোবাইল চুরির ঘটনায় আরেকটি মামলা করেছেন রামপুরা থানার এসআই কামরুল হাসান। ওই মামলাতেও অজ্ঞাত পরিচয়ের হাজার-বারোশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
নিহতের ছেলে আজিজুলের অপমৃত্যুর মামলার এজাহারে বলা হয়, রেশমা বেগম নামের এক নারীর মাধ্যমে আড়াই মাস আগে ফাতেমা নামের আরেক নারীর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে যোগ দেয় তার মা। সবশেষ ২৯ ডিসেম্বর মায়ের সঙ্গে কথা হয় আজিজুলের। এরপর রোববার সকালে চাচাতো ভাইয়ের ফোনে আজিজুল জানতে পারেন, তার মা উপর থেকে পড়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।
তবে আজিজুলেরে দাবি, মামলায় তাদের যে অভিযোগ তা পুরোপুরি লেখা হয়নি। পুলিশের চাপাচাপির কারণে তিনি মামলায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সোমবার তিনি বলেন, “আমরা এলাকায় গেলে পরে লোকজন কইছে, ওই বাড়িতে খারাপ লোকজন থাকে। তারা মহিলাদের খারাপ কইরা উপ্রে থিক্কা ফিক্কা ফালায়। আমার মায়েরে তারা মাইরা ফেলছে।
“ওই বাড়ির দারোয়ান লোকজনরে স্টেটমেন্ট দিছে যে, বাড়ির মালিকের মেয়ে (কানিজ ফাতেমা) বস্তায় ভইরা মায়ের লাশ ছাদে নিয়া ফিক্কা ফেলছে। তবে পুলিশ আমরারে কইছে আগে একটা (অপমৃত্যুর) মামলা দিতে। লাশের পোস্টমর্টেমে কিছু পাওয়া গেলে সেইটা পরে খুনের মামলা হইব।”
এ বিষয়ে রামপুরা থানার ওসি মশিউর বলেন, “আসমা কী করে মারা গেলেন, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে উপর থেকে পড়তে দেখা গেছে। তবে তিনি কী করে পড়লেন, সেটা জানার চেষ্টা চলছে। অনুসন্ধানের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা চলবে।”
ওই বাড়ির নীচতলায় তিনটি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করেছেন বাড়ির মালিক দেলোয়ারের গাড়িচালক উজ্জ্বল ভুঁইয়া। মামলায় কারও নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি।
উজ্জ্বল বলছেন, ওই নারী যখন পড়ে যান, তখন তিনি বাসায় ছিলেন না। সংঘাত শুরুর আগে বাসায় আসেন। তিনি শুনেছেন আসমা বেগম আত্মহত্যা করেছেন, তার ‘মাথায় সমস্যা’ ছিল বলে বাড়িওয়ালার পরিবার তাকে জানিয়েছে।
তবে আসমার ছেলে আজিজুল ইসলামের ভাষ্য, তার মা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। সুস্থ ছিলেন দেখেই মাসে ১২ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্ত্রী তাকে কাজে নিযুক্ত করেন। তার মা কয়েকমাস ধরে সেখানে কাজও করছিলেন।
সবশেষ ২৯ ডিসেম্বর যখন মায়ের সঙ্গে ফোনে তার কথা হয়, তখন মা জানান, তিনি গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে কয়েকদিনের জন্য বাড়ির বাইরে যাবেন-তার ফোন বন্ধ থাকতে পারে।
আজিজুল বলেন, “মা সুস্থ না হইলে তারা এতদিন কামে রাখলো ক্যামনে?”
পুলিশের মামলায় বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে সেখানকার লোকজন পুলিশের কথায় না শুনে হামলা চালায়। তারা রামপুরা থানার ৬-৭ জন সদস্যকে আটকে রাখে।
এ সময় রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মউলার সরকারি সিমযুক্ত একটি ফোন খোয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ১৬ রাউন্ড টিয়ার শেল ও ৪৫ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুঁড়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
