Published : 07 Apr 2026, 10:06 PM
ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে মরিশাস যাওয়ার পথে মঙ্গলবার দিল্লি গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা বিকেলে দিল্লি পৌঁছালে তাদের ‘উষ্ণ’ অভ্যর্থনা জানান ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভাগের প্রধান বি শ্যাম এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে ‘থমকে’ যাওয়া সম্পর্ক ‘মেরামত’ করাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফরের উদ্দেশ্য।
তবে দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রায় সব উপাদান থাকলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়াকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ হিসাবেই দেখাতে চাইছে সরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক ভারত সফর।
নতুন সরকারের প্রথম মাসে বিদেশে অন্যান্য সফরের মত দিল্লি ও পোর্ট লুইসেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
এক্স অ্যাকাউন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি পৌঁছানোর দুটি ছবি প্রকাশ করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “আজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি আগমনে উষ্ণ অভ্যর্থনা। ভারত ও বাংলাদেশের রয়েছে অভিন্ন উষ্ণ ও ঐতিহাসিক বন্ধন, যার ভিত্তি জনগণের সঙ্গে জনগণের শক্তিশালী সম্পর্কের মধ্যে। এই সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে।”
নানা সমালোচনা থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘অন্য উচ্চতায়’ পৌঁছেছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক ‘টানাপোড়েন’ শুরু হয়।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিভিন্ন কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে ‘চ্যালেঞ্জের’ মুখে পড়ে। ফলে নতুন বাস্তবতায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘নবায়ন করার’ লক্ষ্য নিয়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি গেছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা সূচি অনুযায়ী, বুধবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরির সঙ্গে বৈঠক করবেন খলিলুর রহমান।
এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসএম মাহবুবুল আলম।
দিল্লিতে ‘সিরিজ’ বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার সকালে মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসের বিমান ধরবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এয়ার মরিশাসের একই বাণিজ্যিক ফ্লাইটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের যাওয়ার তথ্য দিয়েছে বিবিসি বাংলা।
Warm welcome to FM Khalilur Rahman of Bangladesh on his arrival in New Delhi today
India and Bangladesh share warm and historic ties anchored in strong people to people relations. The visit will further bolster India Bangladesh partnership.
🇮🇳 🇧🇩 pic.twitter.com/ig80XLKesb
— Randhir Jaiswal (@MEAIndia) April 7, 2026
খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়ে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “এটা অস্বীকারের উপায় নেই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুদেশের সম্পর্ক থমকে গিয়েছিল। হয়ত বাংলাদেশের এমন পরিবর্তন ভারত সেভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। আমরা সেখান থেকে সম্পর্কটাকে রিস্টার্ট দিতে চাই। পারস্পরিক মঙ্গলের কথা মাথায় রেখে এ ক্ষেত্রে আমরা কাজ করতে চাই।”
দিল্লিতে বিভিন্ন বৈঠকের আলোচ্যসূচির বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্য, সীমান্ত হত্যার মত ধারাবাহিক আলোচনার বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎমুখী বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়। সেই হিসাবে, আগামী ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
এ চুক্তির নবায়নের বিষয়ে এবার দিল্লি সফরের আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন ওই শীর্ষ কর্মকর্তা।
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গও দিল্লিতে তোলার কথা বলেছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় গ্রেপ্তার ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরতের বিষয়েও সফরে অগ্রগতির আশা করছে ঢাকা।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগেরদিন সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা।
ওই বৈঠকের পর দিল্লি সফর প্রসঙ্গে উপদেষ্টা হুমায়ুন বলেন, “হার্ড ডিটেইল ডিসকাশন আগামীতে আরও হবে। এটা হচ্ছে শুরুটা যে, আসুন আমরা সংলাপের পথটা খুলি।”
সম্পর্কে যেভাবে ‘নানামুখী টানাপোড়েন’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুদেশের সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়ে’ থাকার কথা বলত ঢাকা ও দিল্লি। চব্বিশের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনাবসনের পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শুরু থেকে টানাপোড়েন দেখা দেয় দিল্লির।
বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে বসে বাংলাদেশকে ‘অস্থিতিশীলতা’ সৃষ্টির প্রচেষ্টার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনে ইউনূস সরকার।
অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায় ভারত সরকার। পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য’ এবং ‘অতিরঞ্জিত প্রচারণার’ অভিযোগ করে বাংলাদেশ।
বিভিন্ন বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত প্রসঙ্গ এবং দিল্লি থেকে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক তলবের ঘটনাও ঘটেছে দুই দেশের মধ্যে।
কূটনৈতিক এ টানাপোড়নের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও ঘটে। ২০২৫ সালের ১৭ মে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত। পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভের মধ্যেই দুই দেশের সরকারের মধ্যে ‘অনমনীয় মনোভাব’ পরিস্থিতিকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
এর মধ্যে ভারত সরকার বলে আসছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নয়, নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকার শাসন ক্ষমতায় আসা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে তারা।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দিল্লির মনোভাবে পরিবর্তন দেখা যায়।
সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেকের মায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে চিঠিতে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সে সসয় তার বার্তা নিয়ে ঢাকা সফর করেন জয়শঙ্কর; দেখা করেন তারেক রহমানের সঙ্গে।
এরপর জাতীয় নির্বাচনে জিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নতুন সরকার গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদের শপথে যোগ দিতে আসেন ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
গত ২০ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সুযোগ পান দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
পুরোনো খবর
সম্পর্ক ‘রিস্টার্টে’ দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গঙ্গা চুক্তি নবায়নও থাকছে আলোচনায়