Published : 06 Apr 2026, 09:51 PM
প্রায় দেড় বছরের টানাপোড়েন পেরিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ‘রিস্টার্ট’ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। আলোচনার টেবিলে থাকছে গঙ্গা পানিবন্টন চুক্তির নবায়নের বিষয়ও।
ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে মরিশাস যাওয়ার পথে মঙ্গলবার দিল্লি যাবেন তিনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব উপাদান থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এটিকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা সোমবার বলেছেন, “এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুদেশের সম্পর্ক থমকে গিয়েছিল। হয়ত বাংলাদেশের এমন পরিবর্তন ভারত সেভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।
“আমরা সেখান থেকে সম্পর্কটাকে রিস্টার্ট দিতে চাই। পারস্পরিক মঙ্গলের কথা মাথায় রেখে এক্ষেত্রে আমরা কাজ করতে চাই।”
এ সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, “হার্ড ডিটেইল ডিসকাশন আগামীতে আরও হবে। এটা হচ্ছে শুরুটা যে, ‘আসুন আমরা সংলাপের পথটা খুলি’।”
এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুনও।
দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে খলিলুরের।
ওই কর্মকর্তা বলেছেন, দুপক্ষের সময় মিললে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হতে পারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
বৈঠকের আলোচ্যসূচির বিষয়ে শীর্ষ ওই কর্মকর্তা বলেন, গঙ্গা ও তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি, বাণিজ্য, সীমান্ত হত্যার মতো ধারাবাহিক আলোচনার বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎমুখী বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবন্টন চুক্তি সই হয়। সেই হিসাবে, আগামী ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
এ চুক্তির নবায়নের বিষয়ে এবারের দিল্লি সফরের আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন ওই শীর্ষ কর্মকর্তা।

দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ১০ থেকে ১২ এপ্রিল মরিশাস নবম ভারত মহাসাগর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
ওই সফরের আগে মঙ্গলবার বিকালে দিল্লির পথ ধরবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ৯ এপ্রিল পোর্ট লুইসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি।
‘নতুন শুরুর লক্ষ্য’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ওই কর্মকর্তা নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম এ ভারত সফর প্রসঙ্গে বলেন, “সম্পর্ক নতুনভাবে শুরুর ক্ষেত্রে কোন পথে যাবে, সেটা এবারের সফরে ঠিক করতে চাই আমরা। ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি সামনে রেখে সেটাই আমাদের লক্ষ্য। ভারতের দিক থেকেও তেমন মনোভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
এক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নতুন সরকারের অভিষেকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণ এবং সেই সময় দেওয়া ভারত সরকারের বার্তার কথা বলেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সম্পর্কের পথনির্দেশ কী হবে, সেটা ঠিক করার আলোচনা হবে এই সফরে। এরপর কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনার বিষয় আসবে।
ভারতে থাকা ‘অপরাধীদের’ প্রত্যর্পণের বিষয়ও সফরে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতে থাকা অনেকের সাজা হয়েছে বাংলাদেশের আদালতে, অনেকের বিচার চলছে। সে বিষয়ে আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, “ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান শরীফ ওসমান হাদি হত্যা হামলার আসামীদের ভারত প্রত্যর্পণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কেননা, তারা ইমিগ্রেশন আইন ভেঙ্গে সেখানে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লিতে যাওয়ার আগের দিন সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলের পাশাপাশি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকশেষে হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, “ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর আমি যাচ্ছি, কালকে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছিলেন, সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটা শুভেচ্ছার মনোভাব দেখানো, তারপর তাদেরকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য।”

তিনি বলেন, দুদেশের জনগণের একটা ইতিবাচক সম্পর্ক, দুদেশের মনোভাবটাকে ঠিক করলে এটা হবে। দুই জায়গারই মনোভাবের প্রয়োজন আছে। এটা খুবই স্পষ্ট, সম্পর্ক কোন দিকে যাবে।
“আমরা কিছু ইঙ্গিততো দেখেছি। নির্বাচিত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন। ওই চিঠির লেখাটা যদি দেখি, অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন ওনার নির্বাচনের উপর এবং উল্লেখও করেছেন, ওনার নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেবে ভারত। মানে, আগ্রহী। সুতরাং এটা অতীত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
টানাপোড়েনের দেড় বছর
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুদেশের সম্পর্কের ‘সোনালী অধ্যায়ে’ থাকার কথা বলত ঢাকা ও দিল্লি। চব্বিশের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনাবসনের পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শুরু থেকে টানাপোড়েন দেখা দেয় দিল্লির।
বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে বসে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনে ইউনূস সরকার।
অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায় ভারত সরকার। পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য’ এবং ‘অতিরঞ্জিত প্রচারণার’ অভিযোগ বাংলাদেশ সরকার করে।
বিভিন্ন বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত প্রসঙ্গ এবং দিল্লি থেকে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক তলবের ঘটনাও ঘটেছে।
কূটনৈতিক এ টানাপোড়নের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও ঘটে। ২০২৫ সালের ১৭ মে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত।; পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলবের ঘটনাও ঘটে।
এর মধ্যে ভারত সরকার বলে আসছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নয়, নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকার শাসন ক্ষমতায় আসা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে তারা।
একই দিনে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিকদের তলবের রেশ না কাটার প্রেক্ষাপটেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দিল্লির মনোভাবে পরিবর্তন দেখা যায়।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেকের মায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে চিঠিতে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেসসয় তার বার্তা নিয়ে ঢাকা সফর করেন জয়শঙ্কর; দেখা করেন তারেক রহমানের সঙ্গে।
খলিল দিল্লি যাচ্ছেন ৭ এপ্রিল, কাদের সঙ্গে বৈঠক?
এরপর জাতীয় নির্বাচনে জিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নতুন সরকার আসে বাংলাদেশে। সরকারের অভিষেকে যোগ দিতে আসেন ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদেশের সম্পর্কের ওই টানাপড়েন পেরিয়ে প্রায় এক বছরের মাথায় গত ২০ মার্চ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সুযোগ পান দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
গঙ্গা পানিবন্টন চুক্তি নবায়ন
গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় লোকসভায় এক প্রশ্নে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেছিলেন, চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখনও আলোচনা শুরু করেনি দুদেশ।
চুক্তি নবায়ন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল।
“২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এই চুক্তি নবায়নের জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনও শুরু হয়নি।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরকালে এ নিয়ে আলোচনার কথা সোমবার বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি নিয়ে কাজ করে থাকে ইন্দো-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন। যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের সর্বশেষ সভা ২০২২ সালে হলেও কর্মকর্তা পর্যায়ের সভা নিয়মিতই হয়েছে।
এমনই একটি সভার অংশ নিতে ভারতীয় একটি দলের ঢাকায় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) প্রধান কর্মকর্তা মো. আনোয়ার কাদির।
কমিশনের এই সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমান চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রতি বছর তিনটি করে সভা হয়। এখন ভারতীয় একটি টিম ঢাকায় আছে। মঙ্গলবার তারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পরিদর্শনে যাবে এবং পানিবন্টনের পরিস্থিতি দেখবে। এরপর ঢাকায় বৈঠক হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনারের সাক্ষাৎ
“এর আগে বাংলাদেশের একটি টিম ফারাক্কায় গিয়েছিল, এরপর কলকাতাতে বৈঠক হয়েছিল। এগুলো একেবারে রুটিন বৈঠক।”
শেখ হাসিনাকে ফেরানো প্রসঙ্গে
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গও দিল্লিতে তোলার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা।
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আলোচনা হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা এবং রাজনৈতিক কিছু নেতৃবৃন্দ সেখানে রয়েছেন। তাদের কারও কারও বিচার হয়ে গেছে।
“শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য বিগত সরকারের সময়ে আমরা চিঠি দিয়েছি। এটা আমরা আবার তাদেরকে বলব।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা না হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার ব্যাপারতো জুডিশিয়াল প্রসেসে আছে। একটাই ফাঁসি হয়ে গেছে। ফাঁসি হইলে আইনি প্রক্রিয়ায়তো থাকবেই। শেখ হাসিনা এবং তার সাথে আওয়ামী লীগের ক্রিমিনালরা আছে ওখানে, এটা আমরা বিভিন্ন জায়গায় পরিষ্কারভাবে জানি।
“আজকে ওনার ডিটেইলস নিয়ে ডিসকাস করিনি। আজকের মূল বিষয়টা ছিল, হাই কমিশনার কনগ্রেচুলিটেং কল অন করেছে।”