Published : 17 May 2025, 08:39 PM
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে দুই ভাগ করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা করতে ‘তড়িঘড়ি করে’ অধ্যাদেশ জারি এবং এর ফলে রাজস্ব ব্যবস্থা ‘নির্বাহী বিভাগের করায়ত্ত হওয়ায় ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, নীতির স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো ও রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী বিভাগ থেকে যে ন্যূনতম স্বাধীনতা ভোগ করার কথা তার সুযোগ রাখা হয়নি।
রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি অবিলম্বে অধ্যাদেশটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।
১৭ এপ্রিল উপদেষ্টা পরিষদ খসড়া অধ্যাদেশটি অনুমোদন দেয়। এরপর ১২ মে মধ্য রাতে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।
এরপর এই অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শনিবার কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রোববারও একই দাবিতে কলম বিরতির ডাক দিয়েছেন তারা; আওতার বাইরে থাকবে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা, রপ্তানি কার্যক্রম ও বাজেট কার্যক্রম।

এনবিআর সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ‘পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে’ অধ্যাদেশ জারির সিদ্ধান্ত ‘নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে’ বলে মনে করছে টিআইবি।
প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ একই কাঠামোর মধ্যে থেকে বের করে আনার দাবি বহুদিনের। কারণ একক কাঠামোর মধ্যে এই দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় অনেক সময় স্বার্থের দ্বন্দ্ব, যোগসাজশের দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি রাজস্ব লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রতকর অবস্থায় নিমজ্জিত ছিল।
“বিভিন্ন অংশীজন ও বিশেষজ্ঞসহ সর্বশেষ রাজস্ব বিষয়ক পরামর্শক কমিটিরও রাজস্ব ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের পেছনের নীতিগত সিদ্ধান্তকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই।”
তিনি বলেন, “রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার নামে যে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে প্রক্রিয়াটিই স্বচ্ছ কি-না, এমন প্রশ্ন ওঠাও অমূলক নয়। তা ছাড়া, এই তুঘলকি পরিবর্তনের ফলে এর মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি কতটুকু বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে নির্মোহ সংশ্লিষ্ট জ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ কতটুকু করা হয়েছে?”
অধ্যাদেশে রাজস্ব বোর্ডের বিকেন্দ্রীকরণের নামে সরকারের, বিশেষত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে বলে দাবি করেন ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি মনে করেন, পরামর্শক কমিটির মূল সুপারিশকে উপেক্ষা করে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে নির্বাহী বিভাগের ‘অধীনস্ত’ দুটি বিভাগে পরিণত করা হয়েছে।
এর ফলে কর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতসহ বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ’ থেকেই যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এ সুযোগ আরো বাড়তে পারে- এমন সম্ভাবনাও অমূলক নয়।”
নবগঠিত বিভাগ দুটিকে আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বলয়ের বাইরে রাখার কোনো বিকল্প নেই মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে চলমান আন্তঃক্যাডার টেনশনে নতুন ইন্ধন জুগিয়েছে- তাও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।”
আবার রাজস্ব ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে- এমন ভাবার সুযোগ নেই বলেও মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, “রাজস্ব নিরূপণ ও আদায়ে অনিয়ম এবং যোগসাজশমূলক জালিয়াতি যে বাংলাদেশে কর ফাঁকির অন্যতম মাধ্যম- তা মোটেও অজানা নয়।
“বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও আমরা দেখেছি, আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট আদায়-প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে অনলাইন করা যায়নি, হয়রানি ও দুর্নীতি কমেনি, চালান জালিয়াতি নিয়ন্ত্রিত হয়নি, করফাঁকি আর অর্থপাচার নিয়ন্ত্রিত হয়নি।”
আমলাতন্ত্রের ভেতরে থাকা ‘স্বার্থান্বেষী’ মহল, যারা সংস্কার ঠেকাতে চায় আরও একবার নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে পৃথকীকরণের নামে নিজেদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখার ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হল বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।