হাবিবুর রহমানের বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্ম জানবে কীভাবে?

আয়েত আলী মেম্বার বলেন, “উনার সম্পর্কে আমাদের গ্রামের লোকজনও খুব বেশি জানে না। উনি বীর উত্তম, এটা শুনে আসছি।"

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 March 2024, 05:37 PM
Updated : 25 March 2024, 05:37 PM

মুক্তিযুদ্ধে যার বীরত্বগাথা গর্বিত করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে, বীর উত্তম খোতাবপ্রাপ্ত সেই হাবিবুর রহমানকে কতটা মনে রেখেছে তার এলাকার মানুষ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মিলেছে হতাশাজনক চিত্র। বিস্মৃতপ্রায় এই বীরের সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানানোর কোনো চিহ্ন নেই কোথাও! খোদ নিজের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও হাবিবুর রহমানের নাম অম্লান করে রাখার কোনো উদ্যোগ নেই।

হাবিবুর রহমানের জন্ম ১৯৩০ সালের ৩ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ গ্রামে মাতুলালয়ে। তার পৈত্রিক নিবাস মৈন্দ গ্রামের পূর্বপাড়ায়।

তার বাবার নাম মুহাম্মদ আজিজুর রহমান ও মাতা আমেনা খাতুন। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারান।

হাবিবুর রহমানের শিক্ষাজীবনের শুরু মৈন্দ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৪৯ সালে সরাইল অন্নদা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৫০ সালে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সুবেদার পদে কর্মরত। 

২০১৬ সালের ৭ অগাস্ট ৮৪ বছর বয়সে মারা যান হাবিবুর রহমান বীর উত্তম। তিনি তিন ছেলে ও চার মেয়ে রেখে গেছেন।

স্বাধীনতার পর সরকার হাবিবুর রহমানকে বীর উত্তম খেতাব (সনদ নম্বর ৩৩) দেওয়ার বাইরে ঢাকার পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদর দপ্তরের তিন নম্বর গেইটটি তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।

মার্চের এক বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৈন্দ গ্রামের পূর্ব পাড়ায় হাবিবুর রহমানের পৈত্রিক নিবাসে কথা হয় তার ছেলে মো. আফজালুর রহমান এবং নাতি মোস্তাফিজুর রহমান সেতুর সঙ্গে। মৈন্দ গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আয়েত আলী ছিলেন সেখানে।

তারাই জানালেন, বীর এই যোদ্ধার যুদ্ধকালীন স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। হাবিবুর রহমানের পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন সময় তথ্যউপাত্ত, নথিপত্র নিলেও সেগুলো আর ফেরত দেননি।

যুদ্ধদিনে হাবিব

মুক্তিযুদ্ধের আগের বছরের ডিসেম্বর থেকেই হাবিবুর রহমানের কোনো খবর জানতে পারছিলেন না পরিবার। মার্চে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন তিনি মারা গেছেন। পরে জুলাই মাসে আসে একটি চিঠি, যার মধ্য দিয়ে পরিবার জেনেছিল হাবিব বেঁচে আছেন।

কয়েক বছর আগে ‘বায়ান্ন বাজার’ নামে একটি মাসিক পত্রিকায় ছাপা হওয়া হাবিবুর রহমানের সেই চিঠির পেপার কাটিং দেখিয়ে তার ছেলে আফজালুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই চিঠির মূল কপিটি অনেক দিন আমার মা যত্নে রেখেছিলেন। তখন আব্বা বেঁচেছিলেন, পরে একজন গবেষক আব্বার কাছ থেকে নিয়েছিলেন, আর ফেরত দেননি।”

হাবিবুর রহমানের স্ত্রীর  নাম মোছাম্মৎ মেহেরুন নেছা, হাবিব তাকে ডাকতেন মেরু বলে। ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই ময়মনসিংহের বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে স্ত্রী মেরুকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন হাবিব।

চিঠিতে হাবিব লিখেছিলেন, “মেরু, প্রতিদিনের মতো মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মহান স্রষ্টার অশেষ কৃপায় আজও বেঁচে আছি। তুমি কেমন আছো? জানি না। জাতির অত্যন্ত ক্রান্তিলগ্নে বিবেকের তাড়নায় ত্যাগের মহিমায় স্বদেশের মুক্তির লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গের মহান ব্রতে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলাম। হয়ত আর কোনোদিন দেখা হবে না। দুঃখ করো না। হয়ত আত্ম উৎসর্গকারী যোদ্ধার বীরত্বগাথার অনন্য অবদানের অংশিদার হয়ে গর্বিত স্ত্রীর সমহিমায় অম্লান বদনে বেঁচে থাকবে। বাবা-মা ও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখিও। আজ রাতেই যুদ্ধের ময়দানে যেতে হবে। খোদা হাফেজ। তোমারই হাবিব।”

হাবিবের বীরত্বগাথা

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড’ বইয়ে হাবিবুর রহমানের যুদ্ধদিনের বীরত্বগাথা উঠে এসেছে।

বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দিনাজপুর ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ছাতক, গোয়াইনঘাটসহ কয়েকটি অপারেশনে তিনি অংশ নেন।

তার বীরত্বপূর্ণ একটি ঘটনার উল্লেখ করে এই বইয়ে লেখা হয়েছে, সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার (বর্তমানে উপজেলা) অন্তর্গত সীমান্ত এলাকার ছোট একটি বাজার রাধানগরে ১৯৭১ সালে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান। সেখানে নিয়োজিত ছিল ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও টসি ব্যাটালিয়ন।

“১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর রাধানগরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের দিকে বেপরোয়াভাবে এগিয়ে আসছে একদল পাকিস্তানি সেনা। হাবিবুর রহমান মেশিনগান দিয়ে গুলি করে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো বাধাই পাকিস্তানি সেনারা মানছে না। এ সময় হাবিবুর রহমানের মেশিনগানের গুলি শেষ হয়ে যায়। তার কাছে শেষ সম্বল চারটি গ্রেনেড। সেগুলো পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে ছুড়ে দেন। সুবেদার হাবিবের কারণে পাকিস্তানি সেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গুলি বন্ধ হয়ে গেলে পাকিস্তানি সেনারা তার অবস্থানের ওপর চড়াও হয়। হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করার পর আত্মরক্ষার জন্য তার আর কিছু ছিল না। 

“পাকিস্তানি সেনারা তাকে অসংখ্য গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা করে মৃত ভেবে ফেলে চলে যায়। গভীর রাতে গ্রামের মসজিদের ইমাম ওই বাংকারের কাছে এসে অস্ফুট আওয়াজ শুনে উঁকি দিয়ে তাকে দেখতে পান। তিনি হাবিবকে উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। এ যুদ্ধে ৫/৫ গুর্খা রেজিমেন্টের কোম্পানি কমান্ডার, একজন লেফটেন্যান্টসহ প্রায় ১৫০ জন শহীদ হন।”

একই যুদ্ধের বর্ণনায় হাসান মোরশেদের লেখা ‘ইশানে নিশান’ বইয়ে লেখা হয়েছে- “বিকেলের দিকে শিমুলতলায় অবস্থিত ডেল্টা কোম্পানির প্লাটুনটি দ্বারিখেল গ্রামে পশ্চাদপসরণ করে সেখানকার অবস্থানটির শক্তি বৃদ্ধি করে। শিমুলতলায় অবস্থানরত প্লাটুনটির কমান্ডার সুবেদার হাবিব নিজ অবস্থানে অটল থেকে তার অস্ত্রের শেষ বুলেটটি পর্যন্ত নিক্ষেপ করে পাকিস্তানিদের ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। 

“গুলি ফুরিয়ে গেলে পাকিস্তান বাহিনী তার বাংকারের উপর চড়াও হয় এবং বাংকার লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। সুবেদার হাবির তার শেষ সম্বল ৪টি হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এরপর পাকিস্তানিরা তাকে সরাসরি গুলি করে মৃত ভেবে ফেলে যায়। রাতের বেলা গ্রামের লোকজন তাকে উদ্ধার করে দ্বারিখেল পৌঁছে দেন। সেখান থেকে তাকে ডাউকিতে পাঠানো হয়। শিলং মিলিটারি হাসপাতালে তার দু পা কেটে ফেলতে হয়। পরে কৃত্রিম পা সংযোজিত হয়।”

বিস্মৃতপ্রায় এক বীরকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই উদ্যোগ

গবেষকরা বলছেন, এই বীর যোদ্ধার সাহসিকতার গল্প নতুন প্রজন্মকে জানাতে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল বা কলেজের নামকরণ তার নামে করার মধ্য দিয়ে এই বীরের সাহসিকতার গল্প নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তাকে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়েও তাকে জানার আগ্রহ জাগিয়ে তোলা জরুরি।

বাবার স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় আক্ষেপ ঝরেছে হাবিবুর রহমানের ছেলে আফজালুর রহমানের কণ্ঠে।

তিনি জানালেন, তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় খ্যাতিমান অনেক গবেষক নানা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেগুলো পরে আর ফেরত দেননি। এখন তাদের সংগ্রহেও তেমন কিছু নেই।

“আমাদের গ্রামে বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনোকিছু নেই,” বলেন হাবিবুর রহমানের নাতি মোস্তাফিজুর রহমান।

আয়েত আলী মেম্বার বলেন, “উনার সম্পর্কে আমাদের গ্রামের লোকজনও খুব বেশি জানে না। উনি বীর উত্তম, এটা শুনে আসছি। কিন্ত উনার সেই বীরত্বের কথা এ প্রজন্মের জানা উচিত। উনার মতো বীর যোদ্ধাকে সম্মান দিয়ে আমাদের গ্রামে সরকারি উদ্যোগে কিছু করা উচিত, যাতে করে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন গবেষক জয়দুল হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাবিবুর রহমানের নামে কোনো স্কুল, কলেজ বা স্থাপনা আছে বলে আমার জানা নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধে তার যে অবদান, তা স্মরণে রেখে এই বীর যোদ্ধার নামাঙ্কিত কোনো কলেজ বা উনার গ্রামের স্কুলটি তার নামে করা উচিত।”

মৈন্দ গ্রামের এফ আর আদর্শ বিদ্যাকানন থেকে প্রায় এক যুগ আগে সম্মাননা জানানো হয়েছিল হাবিবুর রহমান বীর উত্তমকে। 

সেই স্মৃতি মনে করে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজকর্মী বজলুর রহমান বলেন, “এফ আর আদর্শ বিদ্যাকানন থেকে উনাকে আমরা সম্মাননা জানিয়েছিলাম। তিনি তখন জীবিত ছিলেন। স্কুলের শিক্ষার্থিদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, গান ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম। হাবিবুর রহমান বীর উত্তম উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেছিলেন। তিনি এখন বেঁচে নেই। তার সাহসী অবদান নতুন প্রজন্মকে জানাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম এম মাহমুদুর রহমান বলেন, “উনাকে সম্মান জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিছু করা যায় কিনা, সেটি আমরা চিন্তা করব। এর আগে কোনো পরিকল্পনা কখনো নেওয়া হয়েছিল কিনা, তাও খুঁজে দেখব।”