Published : 04 Sep 2025, 12:22 AM
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘মব’, প্রতিহিংসামূলক হামলা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে না থাকার মধ্যে নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস’ (এসএএইচআর) নামের মানবাধিকার সংগঠন।
সংগঠনটি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিশৃঙ্খল’ হিসেবে মন্তব্য করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বুধবার রাজধানী ঢাকার পান্থপথে দৃক পাঠ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের এমন নানা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এসএএইচআর প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গণহারে হত্যা মামলা অভিযুক্তদের জামিন থেকে বঞ্চিত হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁকফোঁকড় ও বিলম্ব মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছে সংগঠনটি।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মীদের নিয়ে ২০২০ সালে গঠিত সংস্থাটির প্রতিনিধি দলটি ২৮ অগাস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংগঠনটির সহ-সভাপতি রশমি গোস্বামী, মানবাধিকারকর্মী সারূপ ইজাজ ও নির্বাহী পরিচালক দীক্সা ইল্লাঙ্গাসিংহে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিনিধি দলটি বলেছে, ভোটের আগে বিদ্যমান অস্থায় চরমপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের পদক্ষেপগুলোকে বিলম্বিত অথবা বাধাগ্রস্থ করতে চায়।
তাদের এ সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসার ও সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। এ লক্ষ্যে তারা প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টা, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এ সফরে নিয়ে তারা নয়টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে তারা এর আগে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করেছিলেন কিনা জানতে চাইলে সংগঠনটির সহসভাপতি রশমি গোস্বামী বলেন, এর আগে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় তারা এসেছিলেন এবং কিছু অনুসন্ধান করেছিলেন। এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিয়েও তারা কাজ করেছিলেন।
তিনি বলেন, আগের শাসকের আমলে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের জন্য বাংলাদেশে অনুকূল পরিবেশ ছিল না।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রশমি বলেন, এগুলো খুবই জটিল বিষয়। তবে এসব নিয়ে তারা বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই কাজ করছেন। যারা সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে কাজ করছে তাদের সঙ্গে তারা নিবির যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
তাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে-
# ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, যা অবিলম্বে সমাধান করা প্রয়োজন। জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নিরাপত্তা বাহিনী মব, প্রতিহিংসামূলক হামলা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। গণহারে হত্যা মামলা অভিযুক্তদের জামিন থেকে বঞ্চিত হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁকফোঁকড় ও বিলম্ব মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
# অন্তর্বর্তী সরকারের ১১টি সংস্কার কমিশন এবং একটি ঐক্যমত কমিশন গঠন করার প্রশংসা করে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এগুলো দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ ও স্বল্পমেয়াদী সংস্কারগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন ও কার্যকর করা জরুরি। যাতে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
# গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায় বিচার দিতে এই সরকার এক বছরে অনেকগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনগত ও প্রশাসনিক স্তরে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে।
# বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মত আগের সরকারের নিবর্তনমূলক আইনগুলোর ব্যবহার অব্যাহত রাখা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল এই দমনমূলক আইনগুলোর ব্যবহার বন্ধ করা।
# হিন্দু, আহমদিয়া ও সুফি মতাবলম্বীসহ সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী, লিঙ্গভিত্তিক সংখ্যালঘু এবং নারীদের ওপর নিরাপত্তাবাহিনী, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সংগঠিত মবের উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষত বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
# দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সংশয়পূর্ণ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি একটি অবাধ ও সুষ্ঠা নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
# গত এক বছরে সাংবাদিক হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। মানবাধিকারকর্মীদের জন্য নাগরিক পরিসর সংকোচন অব্যাহত রয়েছে।
# জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের অচলাবস্থা কাটিয়ে কার্যকর করার বিষয়ে জোর দিয়ে এসএএইচআর প্রতিনিধিরা বলছেন, এই দুটো কমিশন কখনোই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বাধীন জনপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি।
# পটপরিবর্তনের পর নাগরিক সমাজের মধ্যকার মেরুকরণ ও বিভক্তি আরও গভীর হয়েছে তুলে ধরে সংগঠনটি বলছে, বাংলাদেশের ইতিবাচক রূপান্তরের এই সময়ে নাগরিক সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যাতে করে তারা এই রূপান্তরকে ধারণ করে দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে।