Published : 15 Jun 2026, 06:20 PM
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠানের ১২৪ দিন পর এ বিষয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কমনওয়েলথের পর্যবেক্ষক দল (সিওজি)।
রোববার নিজেদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে সিওজি গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করে গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত এবং দেশের প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে নতুন সরকারকে বিভিন্ন খাতে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে।
প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষক দলটি প্রবাসী ভোটার এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বড় পরিসরে ‘পোস্টাল ভোটিং’ ব্যবস্থা চালুর প্রশংসা করেছে। এই উদ্যোগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ দেওয়া হয়েছে।
ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডোর নেতৃত্বে এই পর্যবেক্ষক দলে এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান, ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আরও ১২ জন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গত ৪ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি তারা বাংলাদেশে অবস্থান করে নির্বাচনপূর্ব, ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।

এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তারা গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তবে আওয়ামী লীগ আমলের ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিয়ে আগে যে উদ্বেগ ছিল, তা স্বীকার করেছে পর্যবেক্ষক দল।
তবে সব মিলিয়ে তাদের মূল্যায়ন বলছে, এবারের ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফলাফল ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াটি ‘অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে’ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটটিও ছিল ‘অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ’। তবে গণভোটের মূল বিষয়বস্তু বা সারমর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা যে ‘কম’ ছিল, সে কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তি বা সবার অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও সামনে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া এবং তাদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ‘অত্যন্ত কম’। মোট প্রার্থীর মাত্র চার শতাংশ ছিলেন নারীরা। তাদের মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন।
এছাড়া ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও তরুণদের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের হার ‘বেশ কম’ ছিল বলে মনে করছে সিওজি।
পর্যপেক্ষক দল বলছে, বাংলাদেশে আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার নির্বাচনি প্রচারের সময় সংবাদমাধ্যমের কাজের পরিবেশ ছিল ‘অনেকটাই উন্মুক্ত’। তবে আইনি বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এখনও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ‘প্রভাবিত’ করছে।
সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য করা সুপারিশের মধ্যে পর্যবেক্ষক দলটি নির্বাচনী প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা বাড়াতে নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে।
কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বচওয়ে বলেন, “বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন এবং গণভোট তাদের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের প্রতি অঙ্গীকারের প্রমাণ দেয়। আমরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হওয়া এই নির্বাচনকে স্বাগত জানাই।
“একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, তা পূরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পেশ করা হয়েছে। আমরা চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত এবং নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারকে উৎসাহিত করছি। কমনওয়েলথ এই প্রচেষ্টায় পাশে থাকতে প্রস্তুত।”
সিওজির প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মহলে পাঠানো হয়েছে।