Published : 13 Jul 2025, 01:53 AM
সাদা ছড়ি হাতে নীলক্ষেত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের হলে ফিরছিলেন শিক্ষার্থী তাফসিরুল্লাহ। চোখে না দেখতে পেলেও ফুটপাতের ট্যাকটাইলসের খোঁচা-খোঁচা স্পর্শই তার জন্য পথনির্দেশক; আর তা মেনেই হাঁটছিলেন।
কিন্তু মাঝপথে ফুটপাতের উপরে পুঁতে রাখা এক রডে ধাক্কা খেয়ে আঘাত পেলেন তাফসির। তাতে হাতের কবজি থেকে কিছুটা রক্ত ঝরল। প্রায়ই এমন দুর্ঘটনার মুখে পড়ায় এসব গা সওয়া হয়েছে তাফসিরের।
তার ভাষ্যে, “রাস্তা দিয়ে চলছি, ট্যাকটাইলস বসানো, কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে অনুভব করি ট্যাকটাইলস আর নেই বা ভাঙা। তখন গিয়ে বিপদে পড়তে হয়। রাস্তাটা তো শেষ হয়ে গেল- এখন কোন দিকে যাব?
“এছাড়া অনেক জায়গায় চলতে গিয়ে নানান ধরনের বেগ পেতে হয়, আমি ট্যাকটাইলস ধরে হাঁটছি। কিন্তু পাশ থেকে একজন আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরে হাঁটতে বলবে। কারণ উনি জানেন না এই লাইনটা কেন?”
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তাফসির বলছিলেন, কেবল দুর্ঘটনা নয়; ট্যাকটাইলস ধরে হাঁটতে গিয়ে রোজ রোজ যেমন মানুষের ধাক্কা খেতে হয়, তেমনই ট্যাকটাইলস সম্পর্কে না জানা অনেক পথচারী উল্টো তাকে সেই পথ ছেড়ে পাশ দিয়ে যেতে বলেন। তাছাড়া ঢাকার অনেক স্থানে ফুটপাত দোকানপাটের দখলে থাকায় পথনির্দেশক আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে কেবল দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।
ট্যাকটাইলসের বিশেষত্ব কী?
ঢাকার ফুটপাতে তাকালেই লাল টাইলসের পাশাপাশি দেখা যায় হলুদ টাইলস। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত এ টাইলসে রয়েছে বিশেষ নির্দেশক। লম্বাটে খানিকটা উঁচু রেখার নকশার মানে সামনে আগানোর পথ। আর সেই টাইলসে গোলাকৃতির নির্দেশক থাকার অর্থ- এখানে থামতে বা সতর্ক হতে হবে।
তবে কোথাও কোথাও বিশেষ নকশার হলুদ টাইলসগুলোর উপরে রয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিফোন বক্স, কোথাও রয়েছে মোটরসাইকেল আটকানোর রড, কোথাও রয়েছে ম্যানহোলের ঢাকনি। আবার কোথাও কোথাও রয়েছে আস্ত গাছ, ফুটব্রিজের সেতু; অনেকেই আবার সেই বিশেষ টাইলসের উপর দোকানও বসিয়ে থাকেন।
আবার প্রচারের অভাবে ফুটপাতের এ বিশেষ টাইলস সম্পর্কে জানেন না দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অনেকেই। জনসচেতনতা তৈরি না করায় এ বিষয়ে ধারণা নেই বেশির ভাগ পথচারীর।
তাফসিরের অভিজ্ঞতা শোনার পর ফুটপাতের ট্যাকটাইলস বা হলুদ টাইলসে বিশেষ নজর রাখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। কয়েকদিন ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখাল, নারিন্দা, শাহবাগ, মিরপুর, আগারগাঁও, উত্তরাসহ কয়েকটি স্থান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আলাপ করে পথচারী, দোকানি, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ, নগর পরিকল্পনাবিদ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং তাদের সংগঠনের সঙ্গে।

দেখা গেছে অনেক জায়গাতেই দায়সারাভাবে বসানো হয়েছে এই বিশেষ ধরনের টাইলস বা ট্যাকটাইলস। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব যেমন দেখা গেছে, তেমনই এই টাইলস বরাবর বিদ্যুতের খুঁটিসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সামনে এসেছে।
আবার অনেক জায়গায় মাঝপথে ট্যাকটাইলস শেষ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পুরো ফুটপাত দখল করে আছে বিভিন্ন দোকানপাট। তাছাড়া ফুটপাতে গাড়ি পার্কিং তো রয়েছেই।
শতাধিক পথচারীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এ বিশেষ টাইলস সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। দৃষ্টিনন্দনের জন্য এই নকশা করা হয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে।
‘এ পথেই বিপদ বেশি’
এতসব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে এই টাইলস কি আসলে কাজে দিচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় বেশ কয়েকজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে।
বাজে সব অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী তাফসির বলেন, “দোকান বসানো থাকে বেশিরভাগ জায়গায়, তাদের আচরণ এবং কথাবার্তা শুনে মনে হয় রাস্তাটা দোকানের জন্যই। আমি এইখান দিয়ে হাঁটতে গিয়ে ভুল করেছি।
“এছাড়া মোটর সাইকেল আটকানোর জন্য পিলার বসানো, সেখানে হোঁচট খাচ্ছি, বৈদ্যুতিক খাম্বা তো আছেই, একদম ট্যাকটাইলসের মাঝ বরাবর বসানো থাকে। তাই ট্যাকটাইলসের লাইন ধরে হাঁটলেই বরং আমাদের বিপদ বেড়ে যায়।”
সাড়ে তিন বছর বয়সে গুটিবসন্তে দৃষ্টিশক্তি হারান উজ্জ্বলা বণিক। শাহবাগে একটি কাজে এসেছেন উত্তর বাড্ডা থেকে, সঙ্গে আছেন এক আত্মীয়। পরিচিত রাস্তায় একা হাঁটতে পারলেও অপরিচিত রাস্তায় কখনো একা চলতে পারেন না তিনি।
আক্ষেপ প্রকাশ করে উজ্জ্বলা বললেন, এই শহরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের একা চলাচলের মত পরিবেশ নেই।
“ট্যাকটাইলস বসানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা আমাদের উপযোগী করে নয়; একা একা সাদা ছড়ি নিয়ে চলাচলের জন্য যে প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশগম্যতা থাকতে হয় তা নেই। তাই অপরিচিত রাস্তায় হাঁটা বা চলাচলের জন্য আমার সহযোগীর প্রয়োজন হয়।”
ক্ষোভ ঝেরে উজ্জ্বলা বললেন, “ট্যাকটাইলস যারা বসিয়েছে, তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়া শুধু কাজ দেখানোর জন্যই বসিয়েছে।”

ট্যাকটাইলস ধরে হেঁটে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হওয়ার কথা জানালেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আমজাদ হোসেন।
এই ব্যাংকার বললেন, “২০২১ সালে একটা ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য আমি বের হয়েছি। ভাড়ার মোটর বাইক থেকে নেমে ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে ফুটপাতের ট্যাকটাইলস দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। মাঝখানে একটা জায়গায় পুরোপুরি ভাঙা, স্ল্যাব নেই।
“আমার লাঠি সেটা ধরতে পারেনি, পা স্লিপ করে একবারে ম্যানহোলের ভেতরে পড়লাম। প্যান্ট-শার্ট শেষ, হাতে ব্যথা পেলাম। চাকরির যে সম্ভাবনা ছিল তাও গেল।
“আরেকবার হাঁটতে গিয়ে ফুটপাতের মাঝখানে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে চোখের উপরে অনেকটুকু কেটে গেছে।”
আমজাদের ভাষ্য, ঢাকার ফুটপাতে ট্যাকটাইলস বসানো হয়েছে বিদেশি অনুদানের প্রকল্প হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ব্যবহারকারীর জন্য কতটা উপযোগী তা মাথায় নেওয়া হয়নি। আর নিরাপত্তার তো বালাই নেই।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে সবার চলাচলের দিক চিন্তা করে রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়নি। কোনো বিদেশি সংস্থা বা প্রকল্প বিনিয়োগ করেছে আর আমাদের দায়িত্বশীলরা সেটা বাস্তবায়ন করছে।
“কারণ বিদেশি সংস্থাগুলো চায়- বাংলাদেশটা ইনক্লুসিভ হোক। তাহলে ইনক্লুসিভ বোঝানোর জন্য কী করতে হবে; ট্যাকটাইলস বসিয়ে দিলাম, ইনক্লুসিভ হয়ে গেল? প্রয়োজন বুঝে কিন্তু তা বসানো হয়নি।”
পরিকল্পনার অভাবের কথা জানিয়ে আমজাদ বলেন, “যারা ট্যাকটাইলস বসিয়েছে, তারাই আবার ট্যাকটাইলসের মাঝখানে বিদ্যুতের খাম্বা বা ল্যাম্পপোস্ট বসিয়ে দিচ্ছে। জিগজ্যাগ করে পিলার বসাচ্ছেন।
“দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কীভাবে চলবেন, সেটা ভাবছেন না। তাহলে এই জায়গাটায় কোনো পরিকল্পনা নেই। যারা তৈরি করছেন, তারাই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দিলেন।”
এ সংকটের গভীরে কেবল অবকাঠামো নয়, শিক্ষাগত ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে মনে করেন ব্যাংকার আমজাদ হোসেন।
“মানুষ জানেই না ট্যাকটাইলস কী কাজে লাগে; কারণ স্কুল-কলেজে মনন চর্চা হয় না। কোথাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে অন্তর্ভুক্তি তৈরি করতে হবে, সেসব নিয়ে আলোচনা হয় না। তাদের নিয়ে ভাবাও হয় না।”
প্রতিবন্ধীবান্ধব শহর গঠনে কী করা উচিত, এ প্রশ্নের উত্তরে আমজাদ বলেন, “পুলিশ, সিটি করপোরেশন, জনপ্রতিনিধি সবাইকে যুক্ত করে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শুধু ১৫ অক্টোবর সাদাছড়ি (নিরাপত্তা) দিবসে র্যালি করলেই চলবে না।
“আমাদের নীতির মধ্যেও দায়িত্ববোধ আনতে হবে। সব পর্যায়ের মানুষদের নিয়ে কমিউনিটি তৈরি করতে হবে, যৌথ প্রয়াসে এগিয়ে আসতে হবে সবার।”
একই ধরনের মত বিবি কুলসুম লিপির, যিনি কাজ করছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। ফুটপাত ও ট্যাকটাইলস বসানোয় পরিকল্পনার অভাবও দেখছেন তিনি।
লিপির কথায়, “এই যে ট্যাকটাইলসে বৈদ্যুতিক খাম্বা, ল্যাম্পপোস্ট, ম্যানহোল বসানো এটা তো সরকারিভাবেই হয়েছে, আমাদের নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন আছে, এনজিও আছে। তারা তখন কোথায় ছিল, কেন বাধা দেয়নি, প্রতিবন্ধীদের চলার উপযোগী কোনো পরিকল্পনা কেন সরকারকে দেয়নি?”
কোথাও ট্যাকটাইলস নেই, কোথাও ত্রুটিপূর্ণ
ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতে ট্যাকটাইলস বসানো হলেও কোথাও কোথাও তা অসম্পূর্ণ, এলোমেলো; আবার অনেকক্ষেত্রে অনুপস্থিতও। এই যেমন যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে ফুটপাত থাকলেও কোনো ট্যাকটাইলস নেই। পাশের পশ্চিম যাত্রাবাড়ীতে কিছু কিছু জায়গায় ছোট ছোট ট্যাকটাইলস সংযোগ আছে, তবে পুরো ফুটপাতে নেই।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এলাকার অবস্থা আরও করুণ; ট্যাকটাইলস নেই বললেই চলে। সেখানে ফুটপাত থাকলেও তা কার্যত দখল হয়ে আছে। বিভিন্ন আসবাবপত্রের দোকান, খাবারের দোকান, কাপড়ের দোকানসহ বিকেলবেলা সেখানে বিভিন্ন পণ্যের মেলাও বসে।
অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কের অর্ধেক অংশে ট্যাকটাইলস বসানো, আর অর্ধেকে নেই। জজ কোর্ট মোড়ের দুই পাশে ট্যাকটাইলসের কিছুটা ধারাবাহিকতা আছে।
নারিন্দা মোড় থেকে লোহারপুল, মুরগিটোলা মোড় থেকে দয়াগঞ্জ, রায়সাহেব বাজার থেকে নবাবপুর ও তাঁতীবাজার হয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত রাস্তাগুলোতে ট্যাকটাইলস আছে। তাও অনেক জায়গায় সেগুলো টিকে নেই।

শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেত এলাকায় ফুটপাতে ট্যাকটাইলস আছে; কিন্তু শাহবাগ থেকে কাঁটাবন, সায়েন্সল্যাব প্রধান সড়ক ধরে ফুটপাত থাকলেও ট্যাকটাইলসের অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। এসব ফুটপাতেরও বেশিরভাগই দখলে; চায়ের দোকান, খাবারের দোকান বা অস্থায়ী স্টল রয়েছে।
মেট্রোরেল ঘিরে ফার্মগেইট থেকে মিরপুর ১০ পর্যন্ত যেসব এলাকায় নতুন স্টেশন হয়েছে, সেখানে কিছু নতুন ট্যাকটাইলস বসানো হয়েছে। কিন্তু পুরনো সড়কগুলোতে এমনটা চোখে পড়ে না।
ফার্মগেইটে আবার কিছু জায়গায় মোটরসাইকেল আটকাতে ট্যাকটাইলসের মধ্যেই পিলার বসানো হয়েছে।
মহাখালী রেলগেইট থেকে বিজয়সরণির দিকে যেতে এসকে টাওয়ারের বিপরীত পাশে পুরো ফুটপাত জুড়েই বিভিন্ন খাবারের দোকান, জিনিসপত্রের দোকান বসানো।
মহাখালী থেকে বনানী, গুলশান এলাকায় ট্যাকটাইলস আছে, কিন্তু এসব টাইলের মাঝ বরাবর কখনো বিদ্যুতের খুঁটি, ল্যাম্পপোস্টের পিলার, ম্যানহোলের জন্য করা উঁচুনিচু ঢালাইসহ বেশিরভাগ ট্যাকটাইলস ভাঙা দেখা গেছে। আবার টাইলস খুলে খুলে যেতেও দেখা গেছে।
ট্যাকটাইলস কী, জানেন না বেশিরভাগ মানুষ
কয়েক বছর আগে ঢাকার সড়কে ট্যাকটাইলস বসানো হলেও এর ব্যবহার ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানেন না বেশিরভাগ মানুষ।
নীলক্ষেত থেকে টিএসসি যেতে ট্যাকটাইলস ধরে হাঁটছিলেন এক পথচারী। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়, এই টাইলস কেন বসানো হয়েছে?
অপলক দৃষ্টিতে তিনি বললেন, “কখনো খেয়াল করা হয়নি, এটা যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য, আমি আজ জানলাম। মাঝখানে দোকান বসলে তারা চলবে কীভাবে? এসব নিয়ে সবার ভাবা উচিত।”
আগারগাঁও থেকে ফার্মগেইটের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন চাকরিজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
ট্যাকটাইলস নিয়ে তার ধারণা আছে জানিয়ে মামুন বললেন, “ট্যাকটাইলস নিয়ে জানি, কিন্তু রাস্তাটা ছেড়ে দিয়ে কখনো হাঁটা হয়নি। অনেক সময় খেয়াল করি হঠাৎ করেই ট্যাকটাইলসটা শেষ হয়ে যায়, ফুটপাতের উঁচু থেকে নামার রাস্তাটা ঠিকভাবে নেই।
“এই দেশটা এক অদ্ভুত দেশ। সাধারণ মানুষেরই হাঁটার পথে নানান ধরনের বাধা, দুর্গন্ধ- নাক চেপে হাঁটতে হয়। উন্নয়ন হচ্ছে সেটা সবার জন্য হোক, রাস্তায় স্বাধীনভাবে সবাই চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হোক।”
ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছয়জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলেন শেওড়াপাড়া এলাকায়। ট্যাকটাইলস ধরে হাঁটলেও এই টাইলস নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই বলে সরল স্বীকারোক্তি দিলেন।

বিমান বাহিনী জাদুঘরের সামনে মেট্রো স্টেশন ঘিরে ট্যাকটাইলসের উপরে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম বেচছিলেন সরওয়ার।
তিনি বললেন, “এটা নতুন রাস্তা, তাই হলুদ টাইলসগুলো ডিজাইন করে বসানো হয়েছে।”
সেখানে আইসক্রিম কিনছিলেন দুই বন্ধু। তারাও জানালেন, ট্যাকটাইলস নিয়ে তাদের ধারণা নেই।
মিরপুর ১০-এ রাস্তার পাশে একটি বুথে সিকিউরিটি ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছেন নাসিরউদ্দিন।
ট্যাকটাইলস নিয়ে তার ভাষ্য, “এটার ডিজাইনটা এইরকম। যেরকম ডিজাইন করবেন, সেরকমই হবে। যারা রাস্তা করেছেন, তাদের মন চাইছে- রাস্তায় দুই রকম ডিজাইন করা টাইলস বসাবেন, তারা বসাইছেন।”
মহাখালী রেলগেইটে ফুটপাত ধরে বেশ কিছু দোকান রয়েছে। সেখানে হেডফোন, চার্জার, লাইটের দোকান দিয়েছেন শামীম হোসেন।
“শুধু লাল-হলুদ টাইলসের ওপরে কেন, আমরা এখানে বহুদিন ধরেই দোকান নিয়ে বসি। আমাদের কেউ কিছু কয় না,” বলছিলেন শামীম।

তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী অদিতি রয় বলেন, “আমি খেয়াল করেছি এই লাইনটা ভিন্ন, কিন্তু কেন ভিন্ন সেটা জানতাম না বা জানার চেষ্টা করিনি। আমরা চাই না দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হোক।
“পরবর্তী সময়ে হয়ত হাঁটার সময় মাথায় রাখব লাইনটা ছেড়ে হাঁটার। এসব নিয়ে সোশাল মিডিয়া বা অন্য কোনো প্লাটফর্মে সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত।”
গুলশান ১-এ ফুটপাতে ট্যাকটাইলস ধরে নামার রাস্তায় রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন।
ট্যাকটাইলস নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এইটা কী, কিসের লাইন, আগে কখনো ভাবিনি। মাঝে মাঝে দেখি রাস্তায় এই ডিজাইন করা ইট বসানো, কিন্তু এর মানে জানতাম না। এখন বুঝলাম, এটা কারো পথ চিনতে সাহায্য করে।”
ঘরের বাইরে বের হওয়া এমন নানা পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ট্যাকটাইলস নিয়ে তারা জানেন না, সচেতনতা তৈরির কোনো পদক্ষেপও চোখে পড়ে না।
২০১৩ সালে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ পাস হওয়ার পর ‘সহজ প্রবেশযোগ্য পরিবেশ’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। সেই লক্ষ্যেই ঢাকায় রাস্তা নির্মাণের সময় ট্যাকটাইলস যুক্ত করা হয়। কিন্তু নকশা অনুযায়ী নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখলমুক্ত রাখা- এসব না থাকায় ট্যাকটাইলস অনেক জায়গায় কেবলই ‘প্রতীকী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতা সহজ করা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেইঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)।
এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, “২০১৩ সালের আগে বাংলাদেশে এই টাইলস তৈরি হত না, চাহিদা থেকেই এই দেশে তা তৈরি করা। যখন এই টাইলস বসাবে, তখন আমাদের ডাকা হয়।
“এই টাইলসে দুই ধরনের প্যাটার্ন আছে, একটা ডট আকৃতি, একটা লাইন আকৃতি। ডটে তারা থামবে, আর লাইনে তারা চলার নির্দেশনা পাবে।”
তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হয়নি জানিয়ে মাহবুব বলেন, “এই টাইলসের একটা মাপ আমরা করে দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা তারা ফলো করেনি। কর্তৃপক্ষের আমাদের সঙ্গে সমন্বয় ছিল না।
“ফলে এই টাইলস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কোনো কাজে আসছে না। সাধারণ মানুষের জন্যও একটা লার্নিংয়ের বিষয় ছিল, যেটা তারা করেননি।”

অন্তর্ভুক্তিমূলক শহর থেকে ঢাকা কতটা পিছিয়ে, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা অনেক অনেক দূরে। এখানে প্রতিবন্ধীদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
“কর্তৃপক্ষদের মধ্যে একজন ফোকাল পারসন নিয়োগ করা দরকার, যারা শুধু এক্সেসিবিলিটি নিয়ে কাজ করবে।”
পরিকল্পনার সময় প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সক্রিয় সংগঠনগুলোকে রাখা হয় না বলে ভাষ্য প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা আরেক সংগঠন ভিজ্যুয়ালি ইম্পায়ার্ড পিপলস সোসাইটির (ভিআইপিএস)।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান অমিত বলেন, “এখানে পরিকল্পনার অনেক বড় অভাব। পরিকল্পনার সময় আমাদের মতামত নেওয়া হয় না, আমাদের সংযুক্ত করা হয় না।
“ট্যাকটাইলস নিয়ে আমরা ইনডিভিজুয়াল অডিট করেছিলাম। কিন্তু টাইলস বসানোর পরে এটা আর কার্যকরী হয় না। তবে ট্যাকটাইলস নিয়ে আমাদের কাজ করার অনেক ইচ্ছে আছে।”

‘ট্যাকটাইলস বসানো অনেকটাই লোক দেখানো’
ঢাকা শহরে ফুটপাতগুলোর উন্নয়ন ও রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
উত্তর সিটির নগর পরিকল্পনাবিদ সানজিদা হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শহরে কী পরিমাণ ফুটপাতে ট্যাকটাইলস বসানো হয়েছে, সেটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। তবে ফুটপাতের বেশির ভাগই দখল হয়ে যায়, আমরা অভিযান চালিয়ে দখল মুক্ত করি–আবার সেটা দখল হয়ে যায়।
“এখানে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে, চাঁদাবাজদের কারণে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। তার পরেও আমরা চাই ফুটপাত যেন মানুষের হাঁটার জন্য কোনো বাধা না থাকে।”

ট্যাকটাইলসে বিদ্যুতের খুঁটি, ল্যাম্পপোস্ট, মোটর সাইকেলকে বাধা দিতে বসানো হয়েছে পিলার। সেক্ষেত্রে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হাঁটার কোনো সুবিধা থাকছে না।
তাহলে ট্যাকটাইলস বসানোর উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তরে উত্তর সিটির পরিকল্পনাবিদ সানজিদা বলেন, “একটা সমস্যা ঠিক করতে গয়ে আরেকটা তৈরি হচ্ছে। এর জন্য দরকার জনসচেতনতা।
“ফুটপাতে বাইক না উঠলে কিন্তু রডের স্ট্যান্ড বসাবে না, তখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারবে। সবার আগে সচেতনতা দরকার।”
ট্যাকটাইলসের কার্যকারিতা কতোটা সফল হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তরে দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, “যদি প্রকল্প সফল হত, তাহলে তো এই প্রতিবন্ধকতার প্রশ্ন উঠত না। আমাদের ট্যাকটাইলস বসানোর নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়, তাই আমরা বসাই।
“এটা নিয়ে আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থগুলো একটা ডেডলাইন দেয়। তারা বলে দেয় ট্যাকটাইলস না বসালে তোমাদের আমরা টাকা দেব না। এই ধরনের স্ট্যান্ডার্ড তোমাদের মেইনটেইন করতে হবে। তাই আমরা আমাদের নিয়মের স্বার্থে ট্যাকটাইলস বসাই।”
তিনি বলেন, “এই যে ফুটপাত দখল, মোটর সাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, এগুলো আমাদের সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব না। এগুলো সরকারের অন্য সংস্থার অধীনে পড়ে। তারা সেটা ঠিকভাবে পালন করলে হয়তো সফল হতো উদ্যোগ।”
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সহায়ক কাঠামো তৈরিতে ঢাকার চলমান উদ্যোগগুলো এখনো অনেকটাই লোক দেখানো এবং অপরিকল্পিত।
তিনি বলেন, “একজন সুস্থ মানুষই এই শহরে চলতে হিমশিম খান। সেই শহর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কতটা উপযোগী তা বলাই বাহুল্য। ট্যাকটাইলস বসানো হলেও তা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়।
“অনেক জায়গায় তা অসম্পূর্ণ, কোথাও মাঝপথে থেমে যায়, আবার কোথাও দখলে। ট্যাকটাইলস বসানো- আমাদের এইসব লোক দেখানো চটকদার কাজকারবার। টাকাও ব্যয় হচ্ছে, কোনো কাজে আসছে না। বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে।”
তাহলে বিআইপি বা পরিকল্পনাবিদরা নিজেরা উদ্যোগ নেননি কেন, এ প্রশ্নের উত্তরে আদিল খান বলেন, “আমরা যেহেতু নীতিগত পর্যায়ে কাজ করি, তাই বারবার বলি- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জায়গাগুলোতে র্যাম্প থাকতে হবে, গণপরিবহন সহজলভ্য হতে হবে। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
“এই শহর যদি সত্যিকার অর্থে ইনক্লুসিভ হতে চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তববাদী পরিকল্পনা নিতে হবে এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে।”