Published : 27 Jun 2025, 01:37 AM
কোরবানির ঈদে সবাই যখন ছুটির আমেজে, তখন পুরান ঢাকার নারিন্দায় ভাঙার চেষ্টা হয় ‘মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন’। শতবর্ষী এ স্থাপনায় কেবল নয়, চলে আরও কয়েকটি ‘ঐতিহ্যবিনাশ অভিযান’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দখলদারের পাশাপাশি পরিবারের উত্তর প্রজন্ম থেকে শুরু করে খোদ সরকারি সংস্থাগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ঐতিহাসিক এসব স্থাপনা। বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ কার্যত নেই।
শরৎগুপ্ত রোডের নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবনটি ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম, সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকে এই বাড়িতে আসেননি- শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের এমন গুণিজন খুব বেশি পাওয়া যাবে না।
এবারের ঈদের ছুটি শুরুর আগেই পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে শতবর্ষী নারিন্দা স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশনের ঐতিহাসিক একটি ভবন। সেটিই ঢাকা ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশন।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে আরবান স্টাডি গ্রুপ।সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “ঈদের আগে ও পরে- বিগত এক মাসের মধ্যে পুরান ঢাকায় অন্তত চারটি ঐতিহাসিক স্থাপনায় ভাঙচুর হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু ঐতিহ্যিক স্থাপনা বেদখল হয়ে আছে। সেগুলো রক্ষায় সরকারের দায়িত্বশীলদের নজর নেই।”
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একযোগে ধ্বংসের প্রচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আরবান স্টাডি গ্রুপ বলছে, “ঈদের ছুটির সুযোগে একযোগে এতগুলো স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে আতঙ্কিত করেছে।”
এই ভাঙচুরের ঘটনাগুলো ঘটেছে কখনও বেসরকারি ভবনে, কখনও সরকারি মালিকানাধীন বা ব্যবস্থাপনাধীন ভবনে। এমনকি আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন ভাঙার চেষ্টা
বছর পাঁচেক আগে ‘মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন’ এ থেকে ‘কাঁটা’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন কবি টোকন ঠাকুর। শহীদুল জহিরের গল্প অবলম্বনে এ সিনেমায় উঠে আসে গেল শতাব্দীর ষাট, সত্তর ও নব্বই দশকের কিছু বিষয়।
এবারের ঈদের ছুটিতে নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়। বিষয়টি জানতে পেয়ে গত ১৪ জুন গেণ্ডারিয়া থানায় জিডি করে আরবান স্টাডি গ্রুপ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তরফেও জিডি করা হয়। এরপর বাড়িটি ভাঙার কাজ ঠেকিয়ে রাখে পুলিশ।
সিনেমার শুটিংয়ের সময় ৯ মাস এই বাড়িতেই থেকেছেন টোকন ঠাকুর। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে আমি ওই বাড়িতে ছিলাম। তখনই শুনেছিলাম বাড়িটি ভেঙে ফেলা হবে। এ নিয়ে পারিবারিক আলাপ চলছিল।
“পরিবারের এক পক্ষ তো বাড়িটি সংরক্ষণের চেষ্টাও করেছিল। তখন সরকার উদ্যোগী হয়নি। এখন উভয়পক্ষের সম্মতিতেই বাড়িটি ভাঙা হচ্ছে বলে শুনেছি।”
ক্ষোভ ঝেড়ে টোকন বলেন, “আমরা যে রাষ্ট্রে বাস করি, সেই রাষ্ট্র কি আসলে ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে চায় কি না- তা তো বুঝতে পারি না। আমি ‘কাঁটা’ সিনেমার শুটিং করেছি প্রায় ৭০টার মতো পুরনো বাড়িতে। সেসব বাড়ির অনেকগুলো এখন আর নাই।”

তিনি বলতে থাকেন, “পুরনো স্মৃতি রাখতে পারব, এমন দেশের নাগরিক তো আমরা না। আমাদের পুরনো কিছুই থাকে না। নাসিরউদ্দীন স্মৃতিভবনের লোকজন যদি এখন বাড়িটি ভেঙে ফেলে, আমাদের কীবা বলার আছে। আমাদের রাষ্ট্রই তো ইতিহাস-ঐহিত্য সংরক্ষণে বিশ্বাস করে না।”
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বলছে, শতবর্ষী স্থাপনা রক্ষায় উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে। সেটির পরিপ্রেক্ষিতেই তারা ‘নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন’ না ভাঙতে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছেন।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাড়িটির ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্য মূল্য বিবেচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য। বাড়িটির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য বিবেচিত হলে বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে এটি রক্ষায় উদ্যোগ নেবে অধিদপ্তর।
গেণ্ডারিয়া থানার ওসি আবু শাহেদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাড়িটি ভাঙার বিষয়ে আমাদের থানায় জিডি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পুলিশ পাঠিয়েছি। আপাতত বাড়িটি ভাঙার কাজ বন্ধ আছে।”
নারিন্দার শরৎগুপ্ত রোডে ১৯ জুনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির মূল প্রবেশ ফটক তালাবন্ধ। তবে রাস্তা থেকেই সীমানা প্রাচীরের ওপর দিয়ে চোখে পড়ে বাড়িটি। নিচতলার একপাশের জানালা খুলে ফেলা হয়েছে। সিঁড়ির সামনে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা ইট-সুড়কি।
বাড়ির ফটক বন্ধ থাকায়, ভেতরটা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- তা দেখা সম্ভব হয়নি। শরৎগুপ্ত রোডের ফুটপাতে আম বেচছিলেন দুই ব্যক্তি।
বাড়িটি সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন বললেন, “এইটা তো শুটিং হাউজ। এখানে সিনেমার শুটিং হইত। এখন নাকি বড় অ্যাপার্টমেন্ট অইব।”
বাড়িটির সামনেই পাওয়া গেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী হাসান আলীকে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন তো অনেক পুরনো বাড়ি। ১০০ বছরের বেশি আগের। এ ধরনের বাড়ি সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা উচিত।
“পুরান ঢাকায় এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে, যার প্রায় সবই দখল হয়ে আছে। কোনোটাই মোটর গাড়ির গ্যারেজ, কোনোটা আবার মশলার দোকান। সরকারের উচিত পুরো এলাকাটাকেই হেরিটেজ ঘোষণা করে সংরক্ষণ করা।”
গেণ্ডারিয়া থানা থেকে নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন এসআই তানজিলুর রহমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন বাড়িটি ভাঙার কোনো কাজ হচ্ছে না।”
সরকারের অবহেলার অভিযোগ
নাসিরউদ্দীন ভবনকে ‘হেরিটেজ’ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন সাংবাদিক নাসিরউদ্দীনের নাতনি ফ্লোরা নাসরিন খান।
জানতে চাইলে ফ্লোরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা পরিবার থেকে তখন চেয়েছিলাম বাড়িটি হেরিটেজ ভবন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। সরকার তো সেটি করেনি।
“পরে আমরা সেই রিট আবেদন থেকে সরে এসেছি। এখন এ নিয়ে আদালতের কোনো ব্যাপার নেই।”
সাংবাদিক নাসিরউদ্দীনের মেয়ে নূরজাহান বেগমের সঙ্গে লেখক, সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক রোকনুজ্জামান খানের বিয়ে হয় ১৯৫২ সালে। অনেকের কাছেই তিনি ‘দাদাভাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত, ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম মারা যান ২০১৬ সালে।
তার বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খান বলেন, “আমার মা মারা যাওয়ার আগে বাড়িটি আমার ছোট বোনকে (রিনা ইয়াসমিন বীথি) দিয়ে গেছেন। এখন বোনের দুই মেয়ে আছেন, তারা অস্ট্রেলিয়া থাকেন। এই বাড়ির ব্যাপারে আমার ভাগ্নিরা যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই পরিবারের সিদ্ধান্ত।”
রিনা ইয়াসমিন বীথির মেয়ে প্রিয়তা ইফতেখারের সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
শরৎগুপ্ত রোডে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িটি একটি আবাসন কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। তারা এটি ভেঙে বহুতল ভবন তৈরি করে ফ্ল্যাট বিক্রি করবে।
ফ্লোরা নাসরিন খানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আবাসন কোম্পানির নাম বলতে চাননি।
তবে তিনি বলেন, “আমার ভাগ্নিরা এখন যেহেতু বাড়িটির মালিক, তারা যাকে খুশি দিতে পারেন। বিক্রিও করতে পারেন।
“আর আমি বাড়িটিকে হেরিটেজ করার জন্য আদালতে যে রিট (মামলা) করেছিলাম, তা তুলে নিয়েছি। এটি পৈত্রিক সম্পত্তি, এটা নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই।”
ঢাকার ইতিহাস গবেষক হাশেম সূফী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নাসিরউদ্দীন সাহেব যখন কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন, এরপর তারা এখানে বসবাস করতে শুরু করেন। এটি বরাদ্দকৃত বাড়ি নাকি কেনা সম্পত্তি- তা স্পষ্ট হওয়া উচিত। সরকারের দায়িত্ব এ বিষয়ে তদন্ত করা।

“যদি পৈত্রিক সম্পত্তিও হয়- তাহলে সরকারের উচিত বাড়িটি কিনে নিয়ে সংরক্ষণ করা। কারণ অনেক ইতিহাসের সঙ্গে এই বাড়িটি জড়িয়ে আছে। কচিকাঁচার মেলা করার কারণে এই বাড়িতে অনেক গিয়েছি।”
বাড়িটি রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তরফে গেণ্ডারিয়া থানায় জিডি করেছেন লালবাগ দুর্গ জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মুখলেছুর রহমান ভূঁঞা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত মূল্য আছে- এমন শতবর্ষী স্থাপনা রক্ষায় মহামান্য আদালতের একটি নির্দেশনা আছে। সে অনুযায়ী বিষয়টি আমরা পুলিশকে অবহিত করেছি।
“আমাদের একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছেন, তারপর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে চিন্তা করা হবে।”
শতবর্ষী স্যুয়ারেজ স্টেশনে ছড়ানো ইট-সুড়কি
নারিন্দা রোড দিয়ে শতবর্ষী স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশনের দিকে এগোতেই কানে এল পাখির আওয়াজ। পুরান ঢাকায় এমন দৃশ্য দেখা যায় বলধা গার্ডেনের মতো গুটিকয়েক এলাকায়। অনেকটাই নীরব, মানুষের আনাগোনাও কম নারিন্দার এই এলাকায়।
একটি আবাসিক এলাকার ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ভেতরে যেতেই দেখা মিলল শতবর্ষী স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশনের ফটক। ছোট একটি অংশ খোলা, তা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে মোবাইল ফোনে দুটি ছবি তোলার পর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক নিরাপত্তা কর্মী।
রিপন নামের ওই নিরাপত্তা কর্মী ছবি তুলতে বারণ করলেন। সাংবাদিক পরিচয় দিলেও তিনি বলেন, “ঢাকা ওয়াসার বড় অফিসারদের অনুমতি ছাড়া ভেতরে যাওয়া যাবে না। ছবিও তোলা যাবে না।”
ভেতরে চোখ পড়তেই দেখা গেল, ছড়িয়ে আছে পুরনো ইট-সুড়কি। ভেঙে ফেলা স্থাপনার স্মৃতি। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাসখানেক আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে ঢাকার প্রথম স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশনের ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।
আরবান স্টাডি গ্রুপ এক বিবৃতিতে বলেছে, “এটি ঢাকার প্রথম আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার অংশ। এই স্থাপনাটি ভাঙার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। ঢাকা ওয়াসা উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে এটি ভেঙে ফেলেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আইন লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ। সরকারের মালিকানাধীন এই স্থাপনাটি উচ্চ আদালতের রায় লঙ্ঘন করে সরকারি উদ্যোগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) প্রকৌশলী এ কে এম সহিদ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তার পাশেই আরেকটা ভবনও আছে; সেটা চেষ্টা করব হেরিটেজ হিসেবে যেন থাকে।”
পাম্পিং স্টেশনটি নিরাপত্তারক্ষীর বাধার কারণে ভেতরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন, মূল যে ভবন, সেটিই ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গবেষক হাশেম সূফী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নারিন্দার যে সুয়ারেজ স্টেশনের ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, এটি খুবই অন্যায় হয়েছে। আধুনিক সুয়ারেজ ব্যবস্থার ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য ঢাকা ওয়াসারই উচিত ছিল- এটাকে সংরক্ষণ করা।
“সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ভবন দরকার হয়। এজন্য পাশের আলাদা জায়গায় আধুনিক ভবন তৈরি করা যেত। কিন্তু প্রাচীন ভবনটিও সংরক্ষণ করা দরকার ছিল।”
শঙ্খনিধি হাউজ মোটর গ্যারেজের দখলে
পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে রয়েছে শতবর্ষী শঙ্খনিধি হাউজ (রাধাকৃষ্ণ মন্দির)। কয়েক বছর আগে এই ভবনটির ঝুল বারান্দাসহ সামনের অংশটি ধসে পড়ে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
আরবান স্টাডি গ্রুপ বলছে, কয়েক দশক ধরে জবরদখল, অবৈধ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও ধ্বংসের শিকার এই ঐতিহাসিক ভবনটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভবনটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।
টিপু সুলতান রোডে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে শতবর্ষী শঙ্খনিধি হাউজ। ভবনটিতে রয়েছে একাধিক মোটর গাড়ি মেরামতের দোকান। তার পাশেই হযরত খোরেদ শাহ (রা.) দরবার শরিফ ও সলিমুল্লাহ কলেজ।

ভবনটিতে একটি লাল রঙের সাইনবোর্ডে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লিখেই দায় সেরেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউক ভবনটি ব্যবহারে বিরত থাকার কথা বললেও ভবনটির নিচতলাতেই দেখা যায়, মোটর গাড়ি মেরামতে শ্রমিকদের ব্যস্ততা। ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে পিকআপ ট্রাকও প্রবেশ করছে।
শঙ্খনিধি হাউজ ভবনেই বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির একটি সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। তবে ভেতরে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি কথা বলার জন্য। মোটর গ্যারেজে কাজে ব্যস্ত থাকা কেউ মন্তব্য করতেও রাজি হননি।
ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে শঙ্খনিধি হাউজ। তবে শতবর্ষী এই স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই।
চার দশক আগে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয় স্থাপনাটি। নিয়ম অনুযায়ী, সংরক্ষণের কথা থাকলেও ভবনটি সংরক্ষণে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২) কামরুল ইসলামের সঙ্গে ২২ জুন যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে ফোন কেটে দেন।
রাজউকের পরিচালক (জোন-৭) রাজিয়া সুলতানা বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শঙ্খনিধি হাউজ ভবনটি এখন কোন অবস্থায় আছে, দখলদার আছে কি না, তা জেনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনব।”
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কী করছে?
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যিক স্থাপনা রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের যে দায়িত্ব তা ঠিকমতো পালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন হাশেম সূফী।
তিনি বলেন, “তাদের সঙ্গে কথা বললে, তারা বলে জনবল নেই। যে জনবল আছে, তাও তো ঠিকমতো কাজ করছে না। সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকেও তদারকি প্রয়োজন।”
এ ধরনের স্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে হাশেম সূফী বলেন, “ভিন্ন স্থাপত্য নকশা বা বিশেষ কোনো ইতিহাসের ঘটনার জন্য ঐতিহাসিক মূল্য বা ঐতিহ্যগত মূল্য তৈরি হতে পারে। আর সেটি বিবেচনায় এ ধরনের স্থাপনা সংরক্ষণ জরুরি- যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ইতিহাস বা ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। স্থাপত্য শিক্ষায়ও এই ভবনগুলোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।”
স্থপতি ও স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, “আদালতে আরবান স্টাডি গ্রুপ থেকে যে রিট (মামলা) করা হয়েছিল, সেখানে ২,২০০টি প্রাচীন স্থাপনাকে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। ২০১৮ সালে এসব স্থাপনা অক্ষত রেখে সেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য নির্ণয়ে নির্দেশ দেন হাই কোর্ট।
“মাঠপর্যায়ে জরিপ করে সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন ৭ বছরেও দাখিল করতে পারেনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।”
এ বিষয়ে জানতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাবিনা আলমকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
অধিদপ্তরের প্রত্নসম্পদ ও সংরক্ষণ শাখার উপপরিচালক রাখী রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদালতে তিন মাস পর পর আমরা প্রতিবেদন দাখিল করছি। কাজটি মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে এখনো পুরো সম্পন্ন করা যায়নি। তবে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে, যা আমরা আদালতে ধারাবাহিকভাবে অবহিত করছি।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তো সেই জনবল নেই যে- এসব বাড়ি দখল মুক্ত রাখবে। সরকারের অন্যান্য দপ্তর সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব না। এক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে আরো উদ্যোগী হতে হবে।”
এ বিষয়ে কথা বলতে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমানকে দুই দিনে কয়েকবার ফোন করা হলেও তারা ধরেননি। হোয়াটস অ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠিয়েও তাদের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সরকার যদি আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করে- তাহলে প্রাচীন স্থাপনা রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ এম আহমেদ।
তিনি বলেন, “অনেক স্থাপনা তো আছে ব্যক্তি মালিকানাধীন। এখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অনেকে ভেঙে ফেলছেন। যেসব জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে, সেখানে অন্য স্থাপনা করা যাবে না বলে আইনও আছে। তাই কেউ কেউ রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলছেন।
“শুধু আইন থাকলেই তো চলবে না। সেসব স্থাপনা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি, তারা তো সেখানে নতুন স্থাপনা করবেনই। এখন সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।”
ঐতিহ্য রক্ষার দাবি
আরবান স্টাডি গ্রুপ বলছে, “২০১৮ সালে হাই কোর্ট থেকে ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে একটি রায় দেওয়া হলেও গত সাত বছরে সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা, অবহেলা এবং সদিচ্ছার অভাব-বিশেষ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে- এই রায়ের কোনো সুফল পাওয়া যায় নাই।
“এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গত সাত বছরেও প্রয়োজনীয় অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে তালিকাভুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এগুলোর অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন। এভাবেই নিলাম ঘর, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রাচীন ভবন, বড় কাটরার একাংশ আমরা হারিয়েছি।”
আরবান স্টাডি গ্রুপের তাইমুল ইসলাম বলেন, ফরাশগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা মঙ্গলালয়েও ভাঙচুর করা হয়েছে।
“গত দুই বছরে বেশ কয়েকবার পুলিশের সহযোগিতায় এই ভাঙচুর প্রতিরোধ করা গেলেও এবার এটি ভাঙার চেষ্টা চলছে। ভবনটির প্রায় সব অলংকরণ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফরাশগঞ্জ এলাকাটিকে ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি।”
ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের ‘বিবেকবান’ সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করে আরবান স্টাডি গ্রুপ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে-
• পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর উপর চলমান ধ্বংসযজ্ঞ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
• তালিকাভুক্ত সব স্থাপনাকে যথাযথভাবে সুরক্ষা দিতে হবে এবং সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
• ঢাকা মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী আরবান স্টাডি গ্রুপের তালিকাভুক্ত সব স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
• আরবান স্টাডি গ্রুপের তালিকাভুক্ত সব স্থাপনা যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত তালিকাভুক্তি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
• ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক ঐতিহ্য রক্ষায় একটি স্পষ্ট, কার্যকর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।