Published : 21 May 2026, 02:00 AM
দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর যে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া গেছে, সেখানে নয় মাসের কম বয়সি রয়েছে ২৯ জন।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই যে সময়সূচি ধরে শিশুদের টিকা দেয়, সে অনুযায়ী নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে এই শিশুদের হাম-রুবেলা বা এমআর টিকা পাওয়ার কথা নয়।
তাহলে নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুরা হাম থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুদের ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার কথা।

তাহলে কেন চলতি বছর নয় মাসের কম বয়সি এত শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে? এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা পাওয়ার আগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ তাদের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া। এর পেছনে অপুষ্টিসহ আরো কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি হিসাবে সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত ৪৮১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম আক্রান্ত হয়ে এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮০ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য কী বলছে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬০ শিশু মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ ও মেয়ে ২৯টি; ঢাকায় মারা গেছে ৪৮টি শিশু, বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস বয়সি চারজন, চারমাস বয়সি পাঁচজন, পাঁচ মাস বয়সি দুইজন, ছয়মাস বয়সি চারজন, সাত মাসের সাতজন, আট মাসের সাতজন রয়েছে মৃতদের এ তালিকায়।
নয় মাস বয়সী তিনজন, ১০ মাস বয়সী আটজন এবং ১১ মাস বয়সী চারজন শিশু মারা গেছে।
১২ মাস বয়সী দুইজন, ১৩ মাস বয়সী দুইজন, ১৫ মাস বয়সী দুইজন এবং ১৬ মাস বয়সী একজন শিশু মারা গেছে।
দুই বছর বা ২৪ মাস বয়সী একজন, ২৭ মাস বয়সী দুইজন, ৩০ মাস বয়সী একজন, তিন বছর বা ৩৬ মাস বয়সী দুইজন, ৪২ মাস বয়সী একজন, ৫১ মাস বয়সী একজন এবং নয় বছর বা ১০৮ মাস বয়সী একজন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এই বিশ্লেষণ বলছে, নয় মাস থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশু মারা গেছে ২১ জন। আর নয় মাসের কম বয়সী ২৯ শিশু মারা গেছে।

ইপিআইয়ের টিকাদানের সময়সূচি অনুযায়ী ছয় মাস থেকে আট মাস বয়সী ১৮ শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার কথা। আর নয় থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ শিশুই দুই ডোজ টিকাই পাওয়ার কথা।
তাহলে কী এই শিশুরা টিকার কোনো ডোজ পায়নি অথবা পূর্ণ ডোজ টিকা পায়নি?
বিগত সরকারগুলোর সময়ে কয়েক বছর ধরে টিকাদান কার্যক্রমে ছেদ পড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে কভিড মহামারী ও ২০২৪ সালে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা আলোচনায় আসছে।
টিকা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে মূলত বয়স এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। হামের টিকা ছয় থেকে নয় মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কাজ করে। নয় থেকে ১২ মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ কাজ করে। আর ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।
“তবে দুই ডোজ নেওয়ার পরও কারো হাম হতে পারে। সেটি নির্ভর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। দেখা যাচ্ছে, ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কত দিন পর শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা সব শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে বলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
মৃত শিশুদের তালিকায়, বরিশালে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া পাঁচজনের মৃত্যু তারিখ রয়েছে। তবে তারা কবে ওই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল, সেই তারিখ নেই।
এ ছাড়া শিশুদের টিকার তথ্য, হাসপাতালের আইসিইউ তথ্য বা অন্য কোনো জটিলতা ছিল কিনা, এ ধরনের তথ্যও নেই সেখানে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোগীদের মৃত্যু যাচাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটির জন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, শারীরিক অবস্থাসহ অনেক বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণে রাখতে হয়। কারণ এর আলোকে জটিল রোগীদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “মৃত্যু পর্যালোচনা করা খুব সহজ বিষয় নয়। তবে আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখছি। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শক সংস্থা নাইট্যাগ বা অন্যরা কোনো কিছু জানায়নি।
“তাই এ বিষয়ে অধিদপ্তর বিশেষভাবে কোনো কাজ করছে না। তবে আইসিডিডিআর,বি হাম নিয়ে কাজ করছে।”
এবার কেন হামে এত শিশুর মৃত্যু হল, মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাসের কোনো নতুন ধরন তৈরি হল কিনা, সেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআর,বি বিস্তারিত কাজ করছে।
আলোচনায় ‘অ্যান্টিবডি’
অ্যান্টিবডি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল উপাদান। গর্ভাবস্থায় মায়ের কাছে থেকে অ্যান্টিবডি পায় শিশুরা। আর জন্মের পর পর তাদের শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে।
রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাম ডেডিকেটেড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আসিফ হায়দার বলেন, মায়ের শরীর থেকে মূলত বাচ্চারা অ্যান্টিবডি পায়। কিন্তু বর্তমানে অনেক মায়েরাই অপুষ্টিতে ভুগছেন, আবার নানা কারণে শিশুরাও অপুষ্ট হচ্ছে। এতে করে হামের প্রকোপ বাড়ছে। তাই মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি।
ডা. আসিফ বলেন, “আগে আমরা এক ধরনের শক্তিশালী, ৯৫ শতাংশ মানুষের ‘হার্ড ইমিউনিটির’ বলয়ে ছিলাম। সেটি ভেঙে যাওয়ার ফলে এবার বড় প্রকোপ দেখা দিয়েছে।”

ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন-এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “মায়ের শরীরে যদি হামের অ্যান্টিবডি না থাকে বা টিকা নেওয়া না থাকে তাহলে শিশুরা অ্যান্টিবডি পাবে না। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। এসব বিষয়ে নিয়ে আমাদের দেশের সেভাবে ‘স্টাডি’ নেই।
“তাই এসব বিষয়ে জানা-শোনা এবং গবেষণা হওয়া প্রয়োজন তারপর বোঝা যাবে আসলে কোন ‘ফ্যাক্টরের’ জন্য হামের এই পরিস্থিতি।”
হাম ভাইরাসের কোনো মিউটেশন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন পর্যন্ত হামের কোনো মিউটেশনের খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি বলছেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে সঠিক ‘অ্যান্টিবডি’ পাচ্ছে কি না সেটা দেখা প্রয়োজন।
ডা. বেনজিরের মতে, বর্তমানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া মায়ের যে শাল দুধ বাচ্চাকে খাওয়াতে হয়, এটি আর সম্ভব হয় না। এমন কিছু কারণে বাচ্চাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হচ্ছে।

টিকা ও পুষ্টি ঘাটতি
ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশের নয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাকে কার্যকর করতে হলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার।
কিন্তু করোনার কারণে ২০২০ সালে টিকাদান কর্মসূচি সেভাবে হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আরেকবার এ কর্মসূচি হয়নি।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছে, গেল বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও হামের টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল। হয়নি ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি।
গেল ১১ মে ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ তার উপস্থাপনায় বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হল, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।
এভাবে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে বেড়েছে। যার ফলে এবারের হামে এত মৃত্যু হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৫ সালে একাধিকবার বার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। তাই শিশুদের পুষ্টির ঘাটতিও হয়েছে।

টিকাদানের সময়সূচি
ইপিআই অনুযায়ী, রোগ প্রতিরোধের জন্য জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে মোট ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকা হল-
• জন্মের পরপরই যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা দেওয়া হয়।
• ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি) এবং ওপিভি (পোলিও) ও পিসিভি (নিউমোনিয়া) টিাকা দেওয়া হয়।
• ৬ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে ‘ইনজেকটেবল’ পোলিও (এফআইপিভি) দেওয়া হয়।
• ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়।
• টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের জন্য ১৫ মাস বয়সে এক ডোজ টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেওয়া হয়।
এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কিশোরীদের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা দেওয়া হয়। মূলত পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০–১৪ বছর বয়সীদের দেওয়া হয় এ টিকা।
আর প্রজননযোগ্য বয়সী নারীদের (১৫–৪৯ বছর) ধনুষ্টঙ্কার বা টিটেনাস থেকে সুরক্ষার জন্য ৫ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এটি মা ও ভবিষ্যৎ সন্তানের দু’জনকেই প্রাণঘাতী ধনুষ্টঙ্কার থেকে রক্ষা করে।
ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে নাইট্যাগ শিশুদের টিকাদানের বয়স নির্ধারণ করে দেয়।

হামের টিকা ছয় মাস বয়সে
দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে। এবার প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় বাংলাদেশের টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ) ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
গেল ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে বুধবার শেষ হওয়া মাসব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নয় মাসের আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় নয় মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি দেশের শিশুরা টিকা নেওয়ার বয়সের আগে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে এটি নিয়ে ‘স্টাডি’ হয়েছে, সেটির ভিত্তিতে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ক্যাম্পেইনের জন্য বয়স ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
“এখনো নিয়মিত টিকার ক্ষেত্রে বয়স নয় মাসই রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নয় মাস বয়সী শিশুদের শরীরেও সেভাবে অ্যান্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই টিকা দেওয়ার সময় কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।”
টিকা দেওয়ার বয়স কমিয়ে আনা এবং টিকার কার্যকারিতার বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “আসলে এবারের প্রকোপ থেকে বাঁচাতেই বয়স কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এই কম বয়সে টিকা খুব বেশি কাজ করে না। তবে যে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কাজ করে সেটার মাধ্যমেও অনেক শিশুকে প্রকোপ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।”

ইউনিসেফ বলছে টিকা পায়নি অনেকে
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রথম ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়, চলে ২০ মে পর্যন্ত। টিকাদানের এই কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
টিকাদান কর্মসূচির শেষ দিন বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তরফে বলা হয়েছে, ১ কোটি ৮৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ জন শিশু টিকা পেয়েছে। টিকার আওতায় ১০২ শতাংশ শিশুকে আনা হয়েছে বলেও দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অন্যদিকে গেল ১১ মে টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি-আরসিএমের ভিত্তিতে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেছিলেন, তখন পর্যন্ত শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
নাম প্রকাশ না করে ইপিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে টার্গেট শিশুদের গণনার সময়ও কিছু শিশু বাদ পড়তে পারে। এই বাদ পড়া শিশুদের পরবর্তীতে টিকা দেওয়ার কার্যক্রমও চালু আছে আমাদের।”
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আরসিএম পদ্ধতিতে যাচাই করে যেসব শিশু টিকা পায়নি তাদের খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে। এটির জন্য মাঠকর্মীদের ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে।
“আর টিকার কভারেজ শুধু পাঁচ বছরের বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, বরং আরো কিছু বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকায় আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।”
বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমাদের টিকা কার্যক্রম চালু আছে। যেসব শিশুরা এখনো টিকা পায়নি তারা যেকোনো সেন্টার থেকে টিকা নিতে পারবে। এটির জন্য আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছি।”

মৃত্যু থামবে কবে?
বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৮৫৬। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এদিন সকাল ৮টার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩৮ জনের।
অর্থাৎ প্রতিদিনই হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে, মৃত্যুও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় যেভাবে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ তৈরি করা হয়েছিল, তেমন একটি জরুরি টিম করা প্রয়োজন। এতে মৃত্যু কমানো যাবে।
আর চলতি মাসের শেষের দিক থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমতে পারে, এমন আশার কথা বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, “হামে মৃত্যু কবে কমবে, এটি বলা খুবই কঠিন। তবে হাম মোকাবিলার জন্য সর্বতোভাবে কাজ করলে দ্রুত সময়েই কমতে পারে।”
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, “হামের চিকিৎসায় কোনো ‘অ্যান্টিভাইরাল’ ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়।
“হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। তবে আমরা সব শিশুর ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
একটি জরুরি টিম থাকলে কাজ করা আরো সহজ হতো বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “করোনার সময় যেমন আদালত কোথায় বেড, আইসিইউ ফাঁকা রয়েছে সেগুলোর তথ্য প্রকাশ করার আদেশ দিয়েছিল, এটি করতে পারলে সাধারণ মানুষরা দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারবে। রোগীরাও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।
“এখন প্রতিদিন গণমাধ্যমে খবর আসে রোগীরা হাসপাতালে-হাসপাতালে ঘুরছে।”
ডা. মুশতাক বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসার ব্যয়সহ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এটি না করলে অনেক মানুষই মনে করে হাসপাতালে নিয়ে আসা অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু পরে যখন অবস্থা খুব খারাপ হয়, তারা হাসপাতালে শিশুদের নিয়ে আসে। এতে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। এসব ব্যবস্থা নিলে শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আসলে হাম মোকাবিলার প্রধান একটি বিষয় হলো টিকা প্রদান। আমরা সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। সরকার খুব আন্তরিকতার সঙ্গে হাম মোকাবিলায় চেষ্টা করছে।
“আসলে আমাদের ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে গত মাসের ২০ তারিখ থেকে। আর টিকা গ্রহণের পর অন্তত তিন সপ্তাহ লাগে শিশুদের শরীরে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পেতে, তাই চলতি মাসের ২০ তারিখের পর থেকে হামের প্রকোপ কমবে।”
এখনো যারা টিকা পায়নি তাদের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে তুলে ধরে তিনি আগামী জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে হামের প্রকোপ একেবারে কমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
“আমরা শুরুতে উচ্চঝুঁকি বিবেচনায় ৫ এপ্রিল থেকে যেসব এলাকায় টিকা দিয়েছিলাম সেখানে বর্তমানে হামের সংক্রমণ খুবই কম। সেদিক বিবেচনায় জুন মাসের শেষে হামের প্রকোপ দৃশ্যমানভাবে কমবে।”
আগের খবর:
'জোড়াতালি' দিয়ে চলছে হাম মোকাবিলা, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ 'উপেক্ষা'
হামের রোগী ফেরত না পাঠানোর নির্দেশনা কতটা মানতে পারছে হাসপাতালগুল
হামের চিকিৎসা: কিনতে হয় সবই, খরচের চাপে অভিভাবকরা