Published : 14 Aug 2025, 12:55 AM
ভবিষ্যতে রাজনীতি করার ইচ্ছে জানিয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছেন না। নির্বাচনের আগেই সরকার থেকে পদত্যাগ করবেন।
যারা রাজনীতিতে নামতে চান তাদের কারোরই নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা উচিৎ নয় বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
মঙ্গলবার একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত টক শোতে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ।
প্রায় এক ঘণ্টা ৪১ মিনিটের এই টক শোতে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাকে সব প্রশ্নের উত্তর ঠাণ্ডা গলায় দিতে দেখা যায়।
আলোচনায় ইশরাক হোসেনকে ঢাকার মেয়র হতে না দেওয়ার অভিযোগ, তার নিজের ও তার সহকারী একান্ত সচিব-এপিএসের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, তার বাবার বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্কিত এক ইউপি চেয়ারম্যানকে আশ্রয় দেওয়া, বিসিবি সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়াসহ নানা অভিযোগের জবাব দেন তিনি।
পাশাপাশি তার বিভিন্ন ফেইসবুক পোস্ট ধরে প্রশ্নেরও জবাব দেন।
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ওপর হামলার দিন পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে থাকা বা এয়ারপোর্টে তার ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিন উদ্ধারের বিষয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ।
গতবছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ।
৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, সেখানে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে দুই সমন্বয়ককে উপদেষ্টা পদে রাখা হয়। তাদের একজন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ঠিকানা’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে সঞ্চালক খালেদ মুহিউদ্দীনের সঙ্গে আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে এই সরকারকে ‘দুর্বল’ বলে স্বীকার করেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাকে সরকারের সবচেয়ে বড় ‘দুর্বলতা’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
সরকারি পদে থাকা, পতাকাবাহী গাড়ি ব্যবহার, রাজনীতিতে নেমে নির্বাচনে অংশ নেওয়া-এসব বিষয়ে সঞ্চালকের প্রশ্নে আসিফ মাহমুদ বলেন, “পতাকাবাহী গাড়ি বা এ বিষয়গুলো আমরা চাইও নাই বা এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কোন মোহ নেই। আমার বিষয়টা হচ্ছে, আমি তো কিছু দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসছি।
“গণঅভ্যুত্থানের সময় যখন সমন্বয়করা আমাদের সিলেক্ট করে দায়িত্বটা তখন থেকেই দেওয়া। সেটা হচ্ছে সরকারকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে রাখা, পক্ষের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করা এবং ভয়েসটা যাতে থাকে সে বিষয়টা নিশ্চিত করা- এসবের জন্যই আমার সরকারে আসা।”
তিনি বলেন, “এখনো জুলাই সনদ বাকি আছে। এটার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কী হবে…লোকাল গভমেন্টের সংস্কারের রিপোর্টগুলো বাস্তবায়নের বিষয় আছে। আমি মনে করি, যে দায়িত্ব নিয়ে, যাদের ম্যান্ডেট নিয়ে আমি এখানে এসছি সেই দায়িত্বের অনেকগুলোই এখনো বাকি রয়ে গেছে। দায়িত্বগুলো শেষ করতে চাই। শেষ করতে না পারলে সেটা ঐতিহাসিক একটা দায় থেকে যাবে।”
যারা রাজনীতিতে যুক্ত হতে চান তাদের কারোরই নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা উচিৎ নয় মন্তব্য করে আসিফ মাহমুদ বলেন, “তবে আমি যেটা আগেও বলেছি, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কারও সরকারে থাকা উচিৎ না। যদিও এমন কয়েকজনই রয়েছেন। যদি আমি নির্বাচন নাও করি, তবুও আমার নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা উচিৎ না। রাজনীতিতে নামার যাদের ইচ্ছে আছে, এমন কারোরই এই সরকার থেকে সরে আসা উচিৎ তফসিলের আগেই। এটা আমি বা মাহফুজ আলম বা যদি কেউ থাকেন তাদের কারোরই নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা উচিৎ না।”
আপনার কী রাজনীতি করার ইচ্ছে আছে? আপনি নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবেন, সরাসরি জানতে চাইলে আসিফ বলেন, “আমি তো ভাই ২০১৮ সাল থেকে রাজনীতিতে যুক্ত এবং আমি নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছি না অবশ্যই।”
রাজনীতিতে এলেও কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন করবেন, নিজের জন্মস্থান কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে করবেন না বলে জানিয়েছেন আসিফ।

মেয়র পদে ইশরাকের বসতে না পারা প্রসঙ্গ
আদালতের রায়ের পরও বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে শপথ না পড়ানো এবং এ নিয়ে আন্দোলন ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছিলেন কিনা জানতে চান সঞ্চালক।
জবাবে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেন, “প্রথমত এটা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার কিছু নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পরিষদ থেকেই হয়েছে। আইনি জটিলতা ছিল অনেকগুলো। ইশরাক ভাইয়ের লাস্ট দু-একটা ব্রিফিংয়ে উনি নিজেও বলেছেন এটা উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত।”
চট্টগ্রামের শাহদাত যখন মেয়র ছিলেন তখন উপদেষ্টা ছিলেন এ এফ হাসান আরিফ আর ইশরাক যখন মেয়র হতে পারলেন না তখন উপদেষ্টা হচ্ছেন আসিফ মাহমুদ। সেজন্য প্রশ্ন উঠেছে আসিফ কিছু করলেন কী না?
আসিফ মাহমুদের জবাব দেন, “না, হাসান আরিফ স্যারের সময়টার কথা আমার ঠিক মনে নাই। বা উনি হয়তো বিষয়টা উপদেষ্টা পরিষদের আনেননি বা হয়তো বিষয়টাতে আইনি জটিলতা তেমন ছিল না। উপদেষ্টা পরিষদে যখন যায় তখন আমারতো স্টেশনের দায়িত্বে থাকার জায়গা থেকে ওই সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়ন করা আমার দায়িত্ব। এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আসিফ নজরুল স্যারও সহযোগিতা করেছেন। ”
উত্তর ঢাকায় উপদেষ্টার একক সিদ্ধান্তে মোহাম্মদ এজাজকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার যে কথা শোনা যায় তা নিয়ে আসিফ বলেন, “এজাজ ভাইয়ের নিয়োগটাও উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত। এবং আমি ওই বৈঠকেও ছিলাম না। আমাকে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে আমি সেটা বাস্তবায়ন করেছি।”
ইশরাকের মেয়র হতে না পারার বিষয়টি যে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত সেটা সরকারের কোন উপদেষ্টা বা প্রেস সচিব বা সরকারের কোন পক্ষ থেকেই জোরালোভাবে বলা হয়নি।
জবাবে আসিফ বলেন, এটা হয়তো সরকারের ‘যোগাযোগের ত্রুটির’ বিষয় হতে পারে। এটা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও ভালো যোগাযোগ হতে পারতো বলে মনে করেন তিনি।

মুরাদনগরে তিন হত্যা প্রসঙ্গ
‘মব’ তৈরি করে মুরাদনগরে একই পরিবারে তিনজনকে হত্যা, চাঁদাবাজি, সালিশ নিয়ে চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকার প্রসঙ্গ আসে টকশোতে।
এই চেয়ারম্যানকে আশ্রয় দেওয়া, ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙে না দেওয়া এবং চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত না করার বিষয়টিও উঠে আসে।
এসব বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, “ইউপিগুলোতে প্রশাসক দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অফিসার সরকারের নেই। তাই সব ইউনিয়ন পরিষদ ভাঙা হয়নি। শুধু যারা পলাতক তাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ৬০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে বরখাস্ত করা হবে। কিন্তু ওই ইউপির চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাল ৫ অগাস্টের পর একদিনের জন্যও অনুপস্থিত ছিলেন না বলে আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি। যার কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়নি।”
শিমুল বিল্লাল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না বলে উপদেষ্টা মনে করেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা আমি জানি না, তবে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। আর যে ছবিটা দিয়ে শেল্টার দেওয়ার অভিযোগটি তোলা হয় সেটা আসলে ৫ অগাস্টের অনেক আগের। যে ফোন দিয়ে ছবিটা তোলা হয়েছিল সেখানে তারিখ ও সময়ও উল্লেখ ছিল। তবে চালাকি করে সেই দিন-তারিখটি কেটে দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে দিন-তারিখসহ ছবিটা আছে।”
আর তিন খুনের শিকার পরিবার প্রথম ১৫ দিন তার বা তার পরিবারের কারো নাম বলেননি দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেন, “কিন্তু পরে তারা চাপের মুখে আমাদের নাম জড়িয়েছে।”
এটা নিয়ে তিনি ‘সোস্যাল জাস্টিসের’ শিকার হয়েছেন দাবি করেন উপদেষ্টা আসিফ।
বিষয়টি নিয়ে ইশরাক হোসেনের মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল বাংলা ভিশনের করা একটি প্রতিবেদন ধরে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, “অবশ্যই আমি মানহানির মামলা করবো। সেজন্য প্রয়োজনীয় সকল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করছি। আমি প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছিলাম বাংলাদেশের যে কোন মিডিয়াকে দুই পক্ষের কথা শুনে একটি তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট করার জন্য।”

ডিজিএফআই ও অন্যান্য
তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসিফ বলেন, তিনি প্রবল নজরদারির মধ্যে থাকেন। দুর্নীতি করলে তো এতোদিনে কোন প্রমাণ থাকতো। তার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে যে শতকোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তারও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ মেলেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ওপর নজরদারির জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেন, যখন বিমানবন্দরে তার ব্যাগে ম্যাগাজিন ধরা পড়ে এর কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় বিমানবন্দরের সিসি ক্যামেরার সেই ভিডিও বিদেশি সাংবাদিকরা শেয়ার দিচ্ছেন।
বিমানবন্দরের মতো নিরাপদ জায়গায় তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসিফ বলেন, এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
আলোচনার শুরুটাই হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে নিয়ে। সঞ্চালক বলছিলেন, “এমনও কথা শোনা যাচ্ছে যে শেখ হাসিনার সময়কার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো অ্যাক্টিভ আছে। ডিজিএফআই’র কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ডিজিএফআই তো সরকার প্রধানকে রিপোর্ট করেন, সেনাপ্রধানকে নয়। এটা এখন ড. ইউনূসের আন্ডারে। তাহলে এই মেকানিজমগুলো কী আপনারা করছেন নাকি সরকারের ভেতরের অন্য একটা সরকার যাকে আমরা চিনি না- তারা করছে।”
জবাবে উপদেষ্টা আসিফ বলেন, “অন পেপার তো অনেক কিছুই থাকে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা ভিন্ন কিছু হয়ে যায়। শেখ হাসিনার সময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ।
“(গত বছরের) ৫ অগাস্টের পর ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো অনেক দিকে ভাগ হয়ে গেছে। এখন সরকার একমাত্র ক্ষমতার কেন্দ্র না। ঘটনা প্রবাহে অনেকের অনেক ভুল ছিল। সেই ভুলগুলোর জন্য ক্ষমতার কেন্দ্র বিভাজিত হয়েছে।”
রাজনৈতিক দলগুলো এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে দাবি করে তিনি বলেন, “কারণ সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়া নেওয়া যাচ্ছে না। মিলিটারি একটা ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, ৫ অগাস্টে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সেই ম্যান্ডেটটা দিয়েছে বলে আমি মনে করি।
“এই কমপ্লেক্স সিচুয়েশনের কারণে অন পেপারস যে রকম আছে যে ডিজিএফআই প্রধান উপদেষ্টাকে রিপোর্ট করবে বা যেটা যেভাবে চলা উচিৎ, সেটা সেভাবে চলছে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা মতে, শুধু এই সরকার না, এই সরকার তো অপেক্ষাকৃত দুর্বল সরকার হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী সরকার এলেও আওয়ামী লীগের সময়ে যে ব্যবস্থা আছে, বিভিন্ন জায়গায় রয়ে গেছে, এটার জন্য ভুগতে হবে দীর্ঘ সময়। পরবর্তী যে কোনো সরকারের জন্য এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিত হবে।