Published : 27 Nov 2025, 01:00 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বাহিনী মোতায়েন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন ভবনে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে চার নির্বাচন কমিশনার, স্বরাষ্ট্র সচিব, ইসি সচিবসহ বাহিনী ও সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিরা বৈঠকে অংশ নেবেন।
নির্বাচনে নিরাপত্তা পর্যালোচনা করে কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে নির্দেশনা দেবে ইসি, সেইসঙ্গে ভোটের আগে-পরে কতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে এবং ভোটকেন্দ্রে কতজন সদস্য নিয়োজিত থাকবে, তাও চূড়ান্ত হবে এ বৈঠকে।
সভার আগের দিন বুধবার বিজিবির ‘নির্বাচনি মহড়া’ পরিদর্শন করে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেড, ইয়েলো এবং গ্রিন জোনে ভাগ করে সে অনুযায়ী ‘ডেপ্লয়মেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন কৌশল) ঠিক করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে ‘ডেপ্লয়মেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ ফাইনাল হবে।”
এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হবে। দেশের পৌনে ১৩ কোটি ভোটার দুটি ভোট দেবেন। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে পৌনে ৩ লাখের মত ভোটকক্ষ রাখার পরিকল্পনা করছে ইসি।
প্রথম দফা প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বৈঠক গত ২০ অক্টোবর হয়েছিল, যেখানে সংসদ নির্বাচনকে ঘিয়ে সার্বিক বিষয় আলোচনা হয়। এ সভায় ভোটের আগে-পরে আট দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব আসে। এবার ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য থাকতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ লাখের বেশি সদস্য ভোটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সংখ্যাই হবে সাড়ে ৫ লাখের মত। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এছাড়া পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড রয়েছে।
এবারের বৈঠকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ দুই ডজন বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভোটের তফসিল ও তারিখ নির্ধারণ করা হবে। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাজেট নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বুধবার বলেন, “আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকে প্রধানত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা হবে। সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে উন্নত হয়েছে, আরও কীভাবে উন্নত করা যায়—এসব বিষয়েই আলোচনা হবে।
“গুটিকয়েক দিনের মধ্যে ভোট হবে, তার আগে কতখানি পরিস্থিতির অগ্রগতি হয়েছে এবং একটি সুষ্ঠু ভোট পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কতটা প্রস্তুত—সভায় সেগুলো আমাদের জানানো হবে।”
সবশেষ ভোটের দুই সপ্তাহ আগে আরেকটা আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের (ভেটিং নিয়ে) পর আইনশৃঙ্খলা মোতায়েন সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আরপিওতে ‘ছোট’ সংশোধন
সব ধরনের প্রস্তুতির মধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) তে একটা সংশোধন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রবাসী ভোট সংক্রান্ত বিষয়ে আরপিওতে ‘সামান্য পরিবর্তন’ আনতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আরপিওর প্রবাসী ভোট সংক্রান্ত বিষয়ে ছোট্ট সংশোধনী আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। এরপর তফসিল দেওয়ার ক্ষণগণনা শুরু হবে।”
বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা বৈঠক ও ২৯ নভেম্বর দুই নির্বাচনের ‘মক ভোটিং’। ৩০ নভেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা রয়েছে। ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত, মনোনয়নপত্র মুদ্রণ, আরপিও-বিধিমালা ও ম্যানুয়াল মুদ্রণ শেষ করে তফসিল কবে দেওয়া হবে তা জানিয়ে দিতে চায় নির্বাচন কমিশন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনারদের একজন বলেন, “এ সপ্তাহে জানিয়ে দেব কবে তফসিল ঘোষণা করা হবে। সাত তারিখের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে—তফসিল কোন দিনে ঘোষণা করা হবে।”
তফসিল কবে নাগাদ হবে, এ প্রশ্নে বুধবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সাধারণত ৬০ দিনের গ্যাপ রাখা হবে- এমন কথা নেই; প্লাস–মাইনাস দুয়েক দিন হতে পারে। ভোটের দিন থেকে ৫৮-৬২ দিনের ব্যবধান রেখে তফসিল ঘোষণা করার কথা ভাবা হচ্ছে।”
মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রত্যাহারের শেষ সময় ও ভোটের দিন রেখে তফসিল ঘোষণা করা হয়। এবার বাছাইয়ের সময় তুলনামূলক বেশি দিন রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বৃহস্পতিবারের সভার আলোচনা
সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনী প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, মহাপুলিশ পরিদর্শক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ/কোস্টগার্ড/আনসার ওভিডিপি/ডিজিএফআই/এনএসআই/এনটিএমসি/র্যাবের মহাপরিচালক এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)/ সিআইডি অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বৃহস্পতিবারের সভায়।
সভার আলোচনার বিষয়ের মধ্যে রয়েছে-
>> অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার রোধ ও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ।
>> বৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
>> মনোনয়নপত্র দাখিল হতে প্রতীক বরাদ্দ পর্যন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পাদনের জন্য রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে অধিক সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন।
>> সারা দেশ থেকে পোস্টার, ব্যানার, গেইট, তোরণ ইত্যাদি প্রচারসামগ্রী অপসারণ।
>> নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে করণীয় নির্ধারণ।
>>. ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি এলাকা তথা সমগ্র দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।
>> আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন ও সুসংহত করা।
>> সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও সংখ্যালঘুসহ সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> নির্বাচনি দ্রব্যাদি পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> পার্বত্য/দুর্গম এলাকায় নির্বাচনি দ্রব্যাদি পরিবহণ এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের জন্য হেলিকপ্টার সহায়তা।
>> রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের বাসস্থান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসহ বাসস্থানের নিরাপত্তা জোরদার করা।
>> নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির দায়িত্বপালনকালে পুলিশ ফোর্স নিয়োজিত করা।
>> নির্বাচনি আইন, বিধিবিধান প্রতিপালন নিশ্চিতকরণে করণীয় নির্ধারণ।
>> নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা।
>> গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের মতামত/পরামর্শের আলোকে শান্তিশৃঙ্খলা বিষয়ক কার্যক্রম গ্রহণ।
>> নির্বাচনে বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক-পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রদান।
>> অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণ।
>> গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।
>> পোস্টাল ভোটিং (OCV-ICPV) ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা প্রদান।
>> প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে ভুল ও মিথ্যা তথ্যের প্রচারণা রোধের কৌশল নির্ধারণ।
>> ড্রোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
>> বিবিধ (বাজেট সংক্রান্ত)।
আরও পড়ুন-
সংসদ নির্বাচন: অঞ্চলভেদে থাকবে কমান্ডো বাহিনী, কঠোর বার্তা ইসির
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করতে ২৮০০ কোটি টাকা চায় ইসি
সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে সামলাবে কীভাবে ইসি?