Published : 24 Aug 2025, 01:26 AM
পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয় সাবেকমন্ত্রী আনিসুল হক ও রাশেদ খান মেনন এবং মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীকে। তাদের একসঙ্গে রাখা হয় আদালতের হাজতখানায়; পরে নিয়ে যাওয়া হয় কাঠগড়ায়।
শনিবার বিকালে পৃথক মামলায় তাদের ঢাকার মহানগর হাকিম মো. রাকিবুল হাসানের আদালতে তোলা হয়।
শুনানি শেষে অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে মেহেদী হাসান হত্যা মামলায় আনিসুল ও মেননকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। তবে এরপরও তাদের কাঠগড়ায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখে পুলিশ।
এতে অধৈর্য হয়ে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল এবং সাবেক বিমানমন্ত্রী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মেননকে।
একই আদালতে তখন যাত্রাবাড়ী থানায় আন্দোলনের সময়কার আসাদুল হক বাবু হত্যা মামলার আসামি মাইটিভির সাথীর শুনানি শুরু হয়। ওই থানার পুলিশ এ শুনানি শেষের জন্য আনিসুল ও মেননকে সেখানে অপেক্ষায় রাখেন।
এদিন বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটের দিকে হাজতখানা থেকে দুই মিনিটের পথ পেরিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে তাদের তিনজনকে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত ভবনের সামনে আনা হয়। আদালতে তোলার সময় সবার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে পেছন থেকে পিছমোড়া করে বাঁধা, মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর লিফটে করে আদালতের নবম তলায় ঢাকার মহানগর হাকিম রাকিবুল হাসানের আদালতে তাদের হাজির করে পুলিশ। ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে তিন আসামিকে কাঠগড়ায় তুলে হেলমেট ও হাতের হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। এরপর তারা দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রথমেই শুনানি শুরু হয় নাসিরের।
সাথীর আইনজীবী মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “আমরা তিনটি আবেদন করেছি। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। জামিনের প্রার্থনা। তার স্ত্রী-কন্যার সাথে কথা বলার অনুমতি এবং জামিন নামঞ্জুর হলে কারাগারে ডিভিশন আবেদন।”
বিচারক আইনজীবীকে বলেন, “শুনানি চলাকালেই তারা কথা বলতে পারেন।”
তখন স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে কথা বলতে সুযোগ করে দেওয়া সাথীকে। আসামির কাঠগড়ার একেবারে সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলেন তারা।
স্বামীর মুখে, বুকে হাত বোলাতে দেখা যায় সাথীর স্ত্রী আসফিয়াকে। বাবাকে যতটুকু পেরেছেন জড়িয়ে ধরেন মেয়ে। তাদের তিনজনের চোখ ছলছল করে ওঠে, কাঁদতে দেখা যায়। ৪টা ১ মিনিটের দিকে মেয়ের কপালে চুমু খান সাথী। এসময় সাথীর বাম চোখ মুছে দেন আসফিয়া। ডান চোখ নিজে মুছে নেন সাথী।
এসময় অন্যদিকে পাশে দাঁড়িয়ে পেছনে দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকেন আনিসুল হক ও রাশেদ খান মেনন।
সাথীর আইনজীবী আদালতকে বলেন, “মামলার বাদী হলফনামা দিয়ে বলেছেন, ভুল তথ্যে তাকে (সাথী) আসামি করা হয়েছে। জামিন, অব্যাহতি বা খালাস পেলে তার কোনো আপত্তি নেই।
“বাদীরও জামিন পেলে আপত্তি নেই। জামিন পেলে তিনি পলাতক হবেন না। তাছাড়া তিনি অসুস্থ, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগও নেই।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন নয়ন জামিনের বিরোধীত করে বলেন, “এটি একটি হত্যা মামলা। আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।”
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিনের আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ। কারাবিধি অনুযায়ী ডিভিশন দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
এ সময়ও সাথী তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
এরপর আনিসুল ও মেননকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। শুনানি শেষে তাদের দুইজনকে ৪টা ১০ মিনিটের দিকে কাঠগড়া থেকে বের করে এজলাসের দরজার সামনে রাখা হয়।
এরপর সাথীকে কারাগারে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

তখন মাইটিভিসহ কোম্পানির কর্মচারীদের বেতনের জন্য সাথীর স্ত্রী আসফিয়া উদ্দিনের নামে বিশেষ ক্ষমতা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে সই করার আবেদন করেন আইনজীবী। কিছুটা সময় এ নিয়ে শুনানি হয়।
শুনানির একপর্যায়ে কয়েক মিনিটের জন্য বিরতিতে যান আদালত।
এ শুনানি শেষ না হওয়ায় বাইরে প্রায় ৪ থেকে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন আনিসুল ও মেনন। একসময় তারা অধৈর্য হয়ে পড়েন। তাদের ফের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।
এসময় দেখা যায় সাথীকে কাঠগড়ায় বসতে একটি টুল দেওয়া হয়। আনিসুল ও মেনন তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।
কাঠগড়ায় আশেপাশে থাকা কয়েকজন এসময় সাথীর কী লাগবে, কী খাবেন তা জানতে ব্যস্থ হয়ে পড়েন। কেউ টিস্যু বাড়িয়ে দেন, কেউ পানি।
সাথীকে তার স্ত্রী বলেন, “বাসা থেকে খাবার রান্না করে এসেছি। খাবে না।” তখন সাথী বলেন, “আমি খেয়ে এসেছি। এখানে খাওয়া যাবে না।”
তখন পাশ থেকে একজন বলেন, “খাবার আনো। সাথে দিয়ে দেব।“
তবে সাথী মানা করেন, সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমার ছেলের দিকে খেয়াল রেখ। তোমরাও আমার সন্তানের মত। এসময় অনেককে কাঁদতে দেখা যায়।”
এদিকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল কাঠগড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের বলেন, “আমরাতো কেরানীগঞ্জে বিশেষ কারাগারে থাকি। আমাদের আটকে রাখছেন কেন? উনিতো (সাথী) যাবেন ভিন্ন জায়গায়। গাড়ি ডেকে আমাদের পাঠিয়ে দিন। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব।”
তখন মেননও পুলিশ সদস্যদের একই কথা বলতে থাকেন। বলেন, “এভাবে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। আমাদের নিয়ে যান।”
পুলিশ সদস্যরা বলেন, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে যাওয়া হবে।
তখন আনিসুল দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে কোমরে হাত দিয়ে পেছনের দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ান। মেননও পেছনে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ান।
এরইমধ্যে বিকাল ৪টা ২৮ মিনিটে বিচারক ফের এজলাসে ওঠেন। আনিসুল চেয়ারে বসে থাকা সাথীকে উঠে দাঁড়াতে বলেন। তখন তিনি দাঁড়ান।
এরপর শুনানি শেষে বিচারক আইনজীবীদের বলেন, “নিয়মিত কোর্টে আমলি আদালতে স্ত্রীকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে আসামির স্বাক্ষরের জন্য আবেদন করুন।”
এরপর ফের কারাগারে নিয়ে যেতে হেলমেট পরানোর সময় সাথীকে উদ্দেশ্য করে আনিসুল বলতে থাকেন, “প্রোডাকশন কোর্টের এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আমলি কোর্টে আবেদন করতে বলেন আইনজীবীকে।”
এরপর ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে তাদের ফের হাতে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরিয়ে লিফটে করে নিচে নামানো হয়। পরে প্রিজনভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি মেহেদী হাসান হত্যা মামলায় আনিসুল ও মেননের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ২০ আগস্ট তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেন তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মো. কাউসার হুসাইন।
এজাহারে বলা হয়, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন মেহেদী হাসান। এসময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে আহত হন তিনি। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সন্ধ্যা ৬টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সাথীর মামলার অভিযোগে বলা হয়, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট যাত্রাবাড়ী থানাধীন পাকা রাস্তার ওপর আন্দোলনে অংশ নেন মো. আসাদুল হক বাবু। দুপুর আড়াইটার দিকে আসামিদের ছোঁড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন আসাদ। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন নিহতের বাবা জয়নাল আবেদীন। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়। সাথী ২২ নম্বার এবং তার ছেলে তৌহিদ আফ্রিদি ১১ নম্বর আসামি।
গুলশান থেকে গত ১৭ অগাস্ট সাথীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।