Published : 18 Sep 2025, 08:32 AM
প্রথম সংসদ নির্বাচনের আগে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা।
এরপর বাড়াতে বাড়াতে সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এ ব্যয় ধরা হয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা।
কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট ব্যয়সীমা তুলে দিতে চায় নির্বাচন কমিশন। এর পরিবর্তে ভোটার প্রতি ১০ টাকা ব্যয় বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব তুলেছে তারা।
ইসির এ প্রস্তাব আরপিওতে যুক্ত হলে সাড়ে সাত লাখ ভোটারের আসনে একজন প্রার্থী ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করারও সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে এবার আরপিওতে নতুন অনেক বিষয় যেমন যুক্ত হতে যাচ্ছে, তেমনি অনেক কিছু বাদও পড়ছে।
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে আরপিও জারি হয়। এ নিয়ে অন্তত ১৪ বার নানা ধরনের সংস্কার এসেছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে, দফা, উপদফা বা করণিকসহ ২৪১টি বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে।
সংখ্যা হিসাব বিবেচনায় নিলে এবার তৃতীয় সর্বোচ্চ সংশোধনী আসতে যাচ্ছে আরপিওতে।
সবশেষ ২০০৮-২০০৯ সালে আরপিওতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। বড় সংস্কার আসে ২০০১ সালেও।
এবার ছোট-বড় প্রায় ৪৪টি পরিবর্তনের প্রস্তাব রেখে আরপিও সংশোধনের খসড়া গত ২ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশন। এতে একক প্রার্থীর আসনে ‘না’ ভোট চালু ও জোট করলেও প্রার্থীকে স্বদলের প্রতীকে ভোট করার মতো প্রস্তাব রয়েছে।
এসব প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই হয়ে উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি আরপিওর অধ্যাদেশ জারি করবেন।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও ঐকমত্য কমিশনের মতামতের পর একগুচ্ছ প্রস্তাব ইসি পাঠালেও শেষ পর্যন্ত কী কী সংস্কার চূড়ান্ত হবে, তা সরকারের ওপরেই নির্ভর করছে।
আরপিও সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “এবার বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। আমরা আরপিও সংশোধন প্রস্তাব চূড়ান্ত করে পাঠিয়েছি। এখন আইন মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করছে। এরপর উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন হতে হবে; তারপর অর্ডিন্যান্স করে পাঠাবে।
“সবটাই যে পাঠাবে, এটাও আমরা বলতে পারি না। যোগ-বিয়োগ দুটোই হতে পারে। এটা এখন সরকারের বিবেচনার বিষয়।”
প্রবাসীদের জন্য এবার পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অনলাইন নিবন্ধনসহ ভোটিং পদ্ধতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে ইভিএম।
আরপিও সংস্কার হলে তার সঙ্গে সমন্বয় রেখে আচরণবিধি ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে সমন্বয় করবে ইসি।

কেমন সংস্কার, কেন সংস্কার
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর, যিনি অন্তবর্তী সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্যও।
চার দশক ধরে নির্বাচনী আইন-বিধি পর্যবেক্ষণ করা এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “কতগুলো সংস্কার হলো, সেটা বিষয় নয়। ব্যাপার হলে ব্যাসিক কী কী পরিবর্তন এসেছিল। ২০০১ সালে এসেছিল বড় পরিবর্তন, ২০০৮-২০০৯ এসেছিল বেশ কিছু। এবার আরপিওতে কী সংযোজন হলো, কী বিয়োজন হলো, তা অধ্যাদেশ হলে বুঝতে পারব।”
তিনি বলেন, আরপিওতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীতে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ যুক্ত করা হয় প্রথমবার ২০০১ সালে। এ সময় রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রথা শুরু হয়; কিন্তু অপশনাল ছিল। ২০০৯ সালে দল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলো। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা, এনআইডি কার্ড চালু, ‘না’ ভোট চালুসহ অনেক সংস্কার এলো।।
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের পর ২০২৫ সালে ভালো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বলে মনে করেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী।
“রাজনৈতিক দলের জন্য আচরণবিধি ছিল না; ১৯৯১ সালে একটা নীতিমালা করা হয়। ১৯৯৬ সালে আইনে ব্যাকআপ দেওয়া হল, বিধি করা হল। নির্বাচন করতে হলে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিতে হবে, এটা বড় বিষয়, যা ২০০৮ সালে বাধ্যতামূলক করা হয়।”
আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনী ২০০১ সালের আরপিও তে থাকলেও ২০০৯ সালে তা বাদ দেওয়া হয়। এবার ফের প্রতিরক্ষা বিভাগ যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো পাঁচটি আসনে একজনের প্রার্থী হওয়ার বিধান যুক্ত করা হয় জানিয়ে জেসমিন টুলী বলেন, “আরপিওতে আগে একজন কয়টি আসনে ভোট করবেন, তা উল্লেখ ছিল না; নতুন দফা যুক্ত করে ১৯৮৬ সালে পাঁচটি আসন সীমাবদ্ধ করা হয়। ২০০৮-২০০৯ এ এসে তা তিনটি আসনে সীমাবদ্ধ করা হয়।”
বাড়ছে প্রার্থীর ব্যয়
নির্বাচনি ব্যয়ের বিষয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, শুরুতে ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও মাঝখানে তা ছিল না। আরপিও’র বিধানটি বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ হয়। এরপর ১৯৮৭ সালে সীমা তুলে দেওয়া হয়। ফের নির্বাচনী ব্যয়ের বিধানযুক্ত করা হয় ১৯৮৫ সালে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিন লাখ টাকা, ২০০১ সালে পাঁচ লাখ টাকা, ২০০৮ সালে ১৫ লাখ টাকা ও ২০১৩ সালে ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় আরপিওতে।
বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় সর্বোচ্চ পঁচিশ লাখ টাকা। সব সংসদীয় আসনের জন্য ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা একই। কিন্তু দেশে ২ লাখ ভোটারের নির্বাচনি আসন যেমন রয়েছে, তেমনি সাত লাখেরও আছে। ভোটার সংখ্যার তারতম্যের মধ্যে একই ব্যয়সীমাকে অনেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রার্থীর ব্যয় ভোটার প্রতি ১০ টাকা করার কথা বলছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন।

১৪ বার সংশোধনে ছোট-বড় বিষয় ছিল ২৪১টি
১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৪ বার সংশোধন এসেছে আরপিওতে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে অন্তত ২৪১টি বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে—
>> ১৯৭৮ সালে ৫টি (অধ্যাদেশ)
>> ১৯৮১ সালে ১টি
>> ১৯৮৫ সালে ২টি (অধ্যাদেশ)
>> ১৯৮৬ সালে ১১টি
>> ১৯৯১ সালে ২০টি
>> ১৯৯৪ সালে ১২টি
>> ১৯৯৬ সালে ৪টি
>> ২০০১ সালে ৫৫টি
>> ২০০৮-২০০৯ সালে দুবার আরপিও সংশোধন হয়। তৎকালীন তত্বাবধায়ক সরকার সংসদ, স্থানীয় সরকার, আচরণবিধি থেকে সব ধরনের আইন-বিধিতে সংস্কার করে অধ্যাদেশ করে ২০০৮ সালে। ২০০৯ সালে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সিংহভাগই অনুমোদন পায়, যা কার্যকর হয় ২০০৮ সালের ১৯ অগাস্ট থেকে। ওই সময় ৫৫টি বিষয় সংশোধন হয় আরপিওতে।
>> ২০০৯ সালে ১৪টি (২০০৯ সালের ২৫ জুলাই থেকে কাযকর)
>> ২০১৩ সালে ৩২টি
>> ২০১৯ সালে ৭টি
একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যালটের পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনেও (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন হয়।
>> ২০২৩ সালে ২৩টি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার আরপিও সংস্কারে ইভিএমে বিধান যেমন বাদ দেওয়া হচ্ছে, তেমনি একক প্রার্থীর আসনে ‘না’ ভোট চালু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনী যুক্ত, অনিয়মে পুরনো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা পুনর্বহালসহ প্রায় ৪৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।
আরপিও এখন বাংলায়ও
১৯৭২ সালে দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার- আরপিও শীর্ষক নির্বাচনি আইনটি (১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং- ১৫৫) ইংরেজিতে প্রণয়ন করা হয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন ইসি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়।
২০১৭ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন ইসি একগুচ্ছ সংস্কার কাজে হাত দেয়। রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপও করে, এতে আরপিও বাংলায় রূপান্তরের বিষয়ে সুপারিশ আসে। এরপর ২০২১ সালে বাংলা আইনটি গেজেট করা হয়।
এই ধারাবাহিকতায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯৪ ক অনুচ্ছেদের দেওয়া ক্ষমতাবলে ২০২১ সালে ১ জুলাই বাংলা গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।
আরপিও সংস্কার কেমন হল? কী বলছেন অংশীজনরা