Published : 29 Nov 2025, 01:10 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, “তফসিল হোপফুলি—আমরা যেটা আশা করছি দ্বিতীয় সপ্তাহে হবে ডিসেম্বরের।”
শনিবার শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ‘মক ভোটিং’ পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, “মক ভোটিংটা যেরকম হলো, সেইভাবে একটা ইলেকশন উপহার দিতে চাই, এমন স্বচ্ছভাবে ভোট করতে চাই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে উন্নতি হবে এবং পরিস্থিতি নির্বাচনের অনকূল থাকবে।”
তফসিলের পর প্রয়োজন হলে প্রশাসনে রদবদলের উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি।
যে কারণে ভোটের মহড়া
নাসির উদ্দিন বলেন, “একটা আদর্শ, একটা আইডিয়াল সিচুয়েশনে আমরা যে নির্বাচন দেওয়ার জন্য জাতির কাছে ওয়াদা দিয়েছি, একটা সুন্দর গ্রহণযোগ্য পার্টিসিপেটরি ইলেকশন উপহার দেওয়ার; সেটা আয়োজন করার জন্য একটা পোলিং সেন্টারে কী ধরনের আবহ থাকা দরকার, কী ধরনের পরিবেশ থাকা দরকার, ভোটাররা কী কী রকম হবে, পোলিং অফিসার কিরকম করে বসবে, প্রিজাইডিং অফিসাররা কিরকম করে বসবে, সাংবাদিকদের ভূমিকা- যাবতীয় বিষয়াদি আমরা আজকে প্র্যাক্টিক্যাল ডেমনেস্ট্রেশনের মাধ্যমে দেখতে চেয়েছি।”
শনিবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত শেরে বাংলা নগর বালিকা বিদ্যালয়ের চারটি বুথে ভোটগ্রহণ চলে।
সিইসি বলেন, “মক ভোটিং এক্সারসাইজের মাধ্যমে ভোটাররা এসে লাইনে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে পোলিং সেন্টারে প্রবেশে করেছে। তারপরে ভোটার স্লিপটা নিয়ে দেখাচ্ছে, পোলিং অফিসার ডাক দিচ্ছে, অ্যাসিস্টেন্ট প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালট পেপার দিচ্ছে। আবার মার্কিং সিল নিয়ে গোপন কক্ষে ভোট দিয়ে বাক্সে ফেলতছে।
“এই এক্সারসাইজটা অনেকেই জানে না। কিন্তু বিশেষ করে আমাদের যারা নতুন ভোটার, প্রথমবারের মত ভোট দেবেন; তারা জীবনে এই ভোট দেখেই নাই। গত ১৫ বছরের মধ্যে যারা ভোটার হয়েছে, তারা দেখেইনি, প্র্যাক্টিক্যাল অভিজ্ঞতা নাই। এটার মাধ্যমে একদিকে একটা অভিজ্ঞতা সঞ্চার হচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের একটা রিয়েল টাইম অ্যাসেসমেন্ট অফ দা সিচুয়েশন বোঝাপড়া হচ্ছে।”

নাসির বলেন, “এখন আমাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে একটা রেফারেন্ডম, গণভোট একটা এসছে। এই গণভোট একসাথে করতে হবে আমাদের। তো গণভোট যদি একসাথে করতে হয়, তাহলে আমাদের টাইম ম্যানেজমেন্টের একটা বিষয় আছে।
“এই আজকের এই এসেসমেন্টের ভিত্তিতে আমরা ঠিক করব। বিদ্যমান ৪২,৫০০ এর বেশি ভোটকেন্দ্র আমাদের জন্য পর্যাপ্ত কি না, নাকি ভোটকক্ষ বাড়াতে হবে? ভোটকক্ষ, লোকবল বাড়ানোসহ কী ধরনের অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হতে পারে, এই প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসেসমেন্টটা আজকে আমরা করতে যাচ্ছি।”
ভোটের মহড়ার অভিজ্ঞতা থেকে ইসি করণীয় ঠিক করবে বলে জানান তিনি।
সিইসি বলেন, “আমরা অনুমানের ভিত্তিতে আগাইতে চাই না। আমরা বাস্তবতার ভিত্তিতে আগাইতে চাই। বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগাতে চাই। প্র্যাক্টিক্যালি দেখে এবং আজকে রিয়েল টাইম অ্যাসেসমেন্ট করে তারপর আমরা নেক্সট প্ল্যানিংটা করব। তাইলে আমরা একটা হিসাব করতে পারব, কয়টা সেন্টার যদি বাড়াতে হয়, বাড়াব।
“যদি বুথ বাড়িয়ে চলে সেটা করব এবং যদি বর্তমানে যেসব ব্যালট বাক্স রয়েছে, যেগুলো প্রকিউর করেছি তাতে যদি সাফিশিয়েন্ট হয়, হবে। আর যদি না হয়, আর কী কী প্রকিউরমেন্ট করা লাগবে, সে প্রকিউরমেন্টগুলো আমরা সেরে ফেলব।”

ভোটের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি মোটাদাগে সম্পন্ন হওয়ার তথ্য তুলে ধরেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির।
তিনি বলেন, “আমরা জানাতে চাই, মোটামুটিভাবে প্রিপারেশন আমাদের আছে; কোনো অসুবিধা হবে না, ইনশআল্লাহ। আমরা সবাই মিলে ইনশআল্লাহ যে ওয়াদা জাতিকে দিয়েছি, সেটা আমরা ইনশাল্লাহ ডেলিভার করব।”
সাংবাদিকদের কোনো বাধা নয়
ভোটকক্ষে সংবাদকর্মীদের প্রবেশের বিষয়ে সিইসি নাসির বলেন, “কেন সাংবাদিকরা বলেন— আমাদেরকে ভেতরে থাকতে দিতে হবে। আপনারা দেখলেন—একটা রুমের মধ্যে এজেন্টরা আছে, পোলিং অফিসার আছে, প্রিজাইডিং অফিসার আছেন, ভোটাররা ঢুকছেন। এখন সাংবাদিক আবার অবজার্ভাররা আসবে। দেশি-বিদেশি অবজারভাররা আসবে।
“এখন সাংবাদিক ভাইয়েরা যদি ঢুকে এখন ধাক্কাধাক্কি করে—অনেকক্ষণ যদি দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হবে। পোলিং সেন্টারের ভেতরে এইটা অ্যাভয়েড করার জন্য আমরা বলছি যে, একটু আপনারা একটু নিজেদের বিবেক অ্যাপ্লাই করে নির্দিষ্ট সময়টার মধ্যে আপনারা কাজটা সেরে বেরিয়ে যাবেন।”
সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে দিতে গিয়ে ভোটারদের বেশি সময় লাগার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, “এ অ্যাসেসমেন্টটা আজকে হবে। আর আমাদের রিয়েল টাইম অ্যাসেসমেন্ট আজকে তো একটা দেখলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে- এটাও একটা এক্সপেরিয়েন্স; এটা আমরা অ্যাড্রেস করব।
“আমাদের পরিকল্পনায় যত ধরনের যে গ্যাপগুলো আছে, যে ঘাটতিগুলা আছে; এগুলা আমরা আজকে প্র্যাক্টিক্যাল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা এগুলা মিটআপ করে ফেলব।”
গণভোট প্রসঙ্গ
গণভোটের বিষয়ে বেশির মানুষের স্পষ্ট ধারণা না থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, “জানার কথাও না। আমরা এই যে গণভোট নিয়ে প্রচারণা এখনো ওভাবে শুরু করি নাই। সরকার এবং ইলেকশন কমিশন মিলে ব্যাপক প্রচারণা চালাবে গণভোট নিয়ে।”

তিনি বলতে থাকেন, “প্রচারণাটা যখন শুরু হবে, তখন দেখা যাবে মানুষ জানল কি জানল না। মাত্র অধ্যাদেশটা হল গত মঙ্গলবার দিন; এটার মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনকে অথরাইজ করা টু কন্ডাক্ট দি রেফারেন্ডাম।
“অথরাইজ হওয়ার পরেই তো আমরা কাজ শুরু করেছি সিরিয়াসলি। …সুতরাং আমরা এখন তথ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কালচারাল মিনিস্ট্রিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রচার-প্রচারণা চালানোর জন্য, আমরাও আছি সাথে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে।”

জনগণের মতামত গ্রহণের জন্য গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রস্তাব থাকে। প্রশ্ন চারটি হলেও উত্তরের ঘর একটি থাকবে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিইসি নাসির বলেন, চারটি প্রশ্নের মধ্যে কোনোটি হ্যাঁ, আবার কোনোটিতে ‘না’ হলেও চার প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
“এখানে অপশন শুধু হ্যাঁ আর না। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। এখানে কোনো ইনডিভিজুয়ালি এক প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ, এক প্রশ্নের উত্তর না—এটার স্কোপ নাই। চারটা প্রশ্নের বান্ডেল এবং সেটাতে আইন অনুযায়ী যেটা আছে, সেটা।”
আইনশৃঙ্খলার উন্নতি দেখছেন সিইসি
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন সিইসি নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে রাতে তো ঘুমাতে পারেননি। এখন শান্তিতে ঘুমাতে পারছেন, আপনি শান্তিতে আসছেন। এ পর্যন্ত আপনার ক্যামেরা কি ছিনতাই করেছে? করেনি তো। অর্ডার সিচুয়েশন ইমপুভ করে গেছে, অনেক ইমপ্রুভ করেছে। আমরা তো কন্টিনিউয়াসলি আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে আর কোর্ডিনেটিং...সবাই ট্রেনিং করছে।
“ইনশাআল্লাহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন…বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ওয়াজ নেভার পারফেক্ট। বলে তো লাভ নেই; চুরি, ছিনতাই, মারামারি এগুলা কি আগে ছিল না? আগেও তো ছিল, সবসময় তো ছিল। বাট এগুলো হবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ওভারল এনভরনমেন্ট ফর পোলিং এটা আমরা এনশিউর করব, ইনশাল্লাহ।”
ধীরে ধীরে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পাঁচ শতাধিক ভোটারের ‘মক ভোটিং’ নিয়ে এদিন কেন্দ্রে ইসির গলদঘর্ম অবস্থা দেখা গেছে। সকালে প্রথম ঘণ্টায় ভালোভাবে ভোটগ্রহণ হলেও খুব ধীরে ধীরে ভোট হয়েছে। অনেকে ভোটার নম্বর খুঁজতে গিয়ে বিপাকে পড়েন, কেউবা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেক্ষণ। ঘণ্টা খানেক পরে একজন নির্বাচন কমিশনার পরিদর্শনে এসে ‘মক ভোটিং’ যথাযথভাবে নেওয়ার তাগিদ দেন। এর মধ্যে গণভোট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মক ভোটাররা।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিইসি নাসির বলেন, “এখন আমরা কষ্ট দিতে চাই না। এখন তো একটা এডিশনাল রেসপন্সিবিলিটি আসছে রেফারেন্ডাম। এই যে আজকে মক ভোটিং কেন করছি আমরা? টাইম ম্যানেজমেন্ট মেজর অবজেক্টিভ, ওয়ান অব মেজর অবজেক্টিভ। আমাদের ভোটকক্ষ সেন্টার যদি বাড়াইতে হয় আমরা বাড়াবো। আগে তো একটা আমরা করেছিলাম একটা, এক ধরনের হিসাব থেকে এটা করেছিলাম। একটা ভোট দিতে কতক্ষণ লাগে এগুলাতে হিসাব করেছিলাম।
“এখন আজকে আমরা রিয়েল টাইম অ্যাসেসমেন্টটা করব—একটা ভোটিংয়ে কত লাগে। দরকার হলে আমরা ভোট সেন্টার বাড়াব। এখন আমাদের টাইম যেটা লাগে, সেটার ভিত্তিতে যদি আমাদের বাড়াইতে হয়, বাড়াব। যদি দেখা যায় বুথ বাড়ানোর প্রয়োজন, সেটা করব। মানুষকে কষ্ট দেওয়া আমাদের কোনো পারপাস না।”

ভোট পড়ল ৭০ শতাংশ
মক ভোটিং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এ মক ভোটিংয়ে ৫০০ ভোটারের মধ্যে ৭০.৪% ভোট পড়েছে; অর্থাৎ ৩৫২ জন ভোট দিয়েছেন।”
চার ভোট কক্ষে মক ভোটিং নেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে প্রতিটি ভোট দিতে কত সময় লেগেছে তা নির্ধারণ করা যাবে না।”
ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত একটি কক্ষের ভোটগ্রহণের সময় পর্যবেক্ষণ করেন।
এ বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর বলেন, “নির্বাচন কমিশনার মহোদয় একটি বুথে নানা ধরনের ভোটারদের নিয়ে টাইম পর্যালোচনা করেছেন। এটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন আসবে। এর ভিত্তিতে সামগ্রিক বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন।”