‘আড়ালে থেকে যাওয়া’ গল্প নিয়ে প্রদর্শনী

২৬টি ছবির গল্পের মাধ্যমে ঢাকার নিম্ন আর্থ-সামাজিক এলাকায় বাস করা নারী এবং কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 01:22 PM
Updated : 30 Jan 2024, 01:22 PM

শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার ‘না বলা গল্প’ তুলে ধরা হয়েছে ‘ফটোভয়েস’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে। 

মঙ্গলবার ধানমন্ডির সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে এ প্রদর্শনীতে ২৬টি ছবির গল্পের মাধ্যমে ঢাকার নিম্ন আর্থ-সামাজিক এলাকায় বাস করা নারী এবং কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার উন্নয়নে কানাডা সরকারের অর্থায়নে ও হেলথব্রিজ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইপাস বাংলাদেশ এবং এর সহযোগী সংস্থাসমূহ কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘ইম্প্রুভিং এসআরএইচআর ইন ঢাকা’ প্রকল্পের পক্ষ থেকে ‘সাইলেন্ট ফ্রেমস লাউড ভয়েসেস: এক্সপ্লোরিং এসআরএইচআর থ্রু কমিউনিটি লেন্স’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ছবির গল্পগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, মাসিক নিয়মিতকরণ, গর্ভপাত পরবর্তী সেবা, প্রজননে জবরদস্তি, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং নারী ও কিশোরীদের অধিকার ভঙ্গসহ বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। 

প্রদর্শনীতে বাবর সাজ্জাদ আনোয়ার নামের সিরাক বাংলাদেশের এক স্বেচ্ছাসেবী তার বন্ধুর ধর্ষণ হওয়ার কথা বলেছেন।

২০২১ সালের এই ঘটনা তুলে ধরে আনোয়ার জানান, কোভিড মহামারীর সময়ে পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন তার বন্ধু।

“এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো আড়ালে থেকে যায়। আমরা শুধু মেয়েদের নির্যাতনের গল্পগুলো শুনি। কিন্তু ছেলেরাও নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। সে গল্পগুলো আমরা জানতে পারি না। সেসব গল্পই আমরা তুলে এনেছি, যেন অন্যরা সচেতন হয়।” 

আরেক ছবির গল্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবনিল সুলতানা এক কিশোরীর গণধর্ষণের ঘটনার বিষয় জানিয়েছেন। 

সাবনিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে গল্পটি তুলে ধরে বলেন, “প্রেমের পর বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরিনকে (ছদ্মনাম) বাসা থেকে অন্য এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের বিয়ে হবে বলে অনেক বন্ধুদেরও ডাকা হয়। কিন্তু সেখানে বিয়ের কোনো আয়োজনই ছিল না। রাব্বিসহ তার বন্ধুরা আমরিনকে গণধর্ষণ করে। পরে ওই বাড়ির লোকজন আমরিনকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং পরে সে থানায় গিয়ে মামলা করে।”

সাবনিল বলেন, “এগুলো শুধু গল্প না। এগুলো আমাদের আশপাশে অহরহ ঘটছে। আমরা যদি এই গল্পগুলো মানুষদের জানাতে পারি, তবে তারাও নিজ নিজ জায়গা থেকে সতর্ক থাকবে।” 

নিয়ম মেনে পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ না করায় গর্ভবতী হয়ে যাওয়া এক নারীর গল্প তুলে এনেছেন স্বেচ্ছাসেবী সাইদুল ইসলাম রাব্বী। 

রাব্বী বলেন, “পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সঠিকভাবে নেন না অনেকেই। আমি আমার গল্পে একজন গৃহকর্মীর কথা বলেছি, যিনি তিন মাস পর পর ইনজেকশন নিতেন, তারপরও তিনি গর্ভবতী হয়ে যান। এই ঘটনাটা খুবই কমন। কমিউনিটি পর্যায়ে এরকম কেইস আমরা অনেক পাই। 

“স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সরকারের এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।” 

সাইবার বুলিংয়ের শিকার বিথির জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠার কথা ছবির গল্পে জানিয়েছেন মোতাহের আরাফাত। 

গল্পে আরাফাত জানান, ১৬ বছর বয়সী বিথী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। 

“সে না বুঝে তার ব্যক্তিগত ছবি তার প্রেমিকের সাথে শেয়ার করে। কিছুদিন পরে ব্রেকাপ হলে ছেলেটা তাকে নানাভাবে ভয় দেখায়। বাবা-মা, প্রতিবেশীদের ছবিগুলো দেখানোর হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে অনেকের কাছে সে ছবিগুলো পাঠিয়ে দেয়। মেয়েটি এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

“ছেলেটি বখাটে- এটি এলাকার মানুষজন জানত। তারা স্থানীয় পঞ্চায়েতের মাধ্যমে এর সমাধান করে। মেয়েটিকে ছেলেটি আর বিরক্ত করেনি। সে স্বাভাবিক পড়াশুনা শুরু করে।” 

আরাফাত বলেন, “এই একটি ঘটনা জেনে অনেক মেয়ে কিন্তু সাবধান হয়ে যাবে। আমরা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাসহ নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের সচেতন করতেই কাজ করে যাচ্ছি।” 

একটি ছবির গল্প তুলে ধরে স্বেচ্ছাসেবী আরিফ খান বলেন, “আমারই পরিচিত এক আত্মীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে গর্ভপাত করাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে যান। আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাগুলো বলতে ভুক্তভোগীরাও দ্বিধা করেন। তারা চান না তাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জানুক। 

“কিন্তু আমরা প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক ট্রেনিং দিয়ে থাকি কমিউনিটিতে। আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে তারা এ বিষয়গুলো বলার সাহস পেয়েছে। তারাও এখন চায় মানুষ এ বিষয়গুলো জানুক, অন্যকে জানাক।”

একটি গল্পে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জনি আক্তার তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা তুলে ধরেছেন। 

জনি বলেন, “আমার এক বান্ধবীর মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হই। এরপর থেকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু এ বিষয়গুলো আমি কাউকে বলতে পারি না। সবাই হাসাহাসি করে। আর আমার সেই বান্ধবীকেও কাউন্সিলিং করানো উচিত। তারও ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়গুলো যদি অজানাই থেকে যায়, তাহলে তো মানুষ জানবে না। মানুষ যেন আমার গল্প থেকে শিক্ষা নেয়, সেকারণেই আমি এই প্রদর্শনীতে গল্পটি তুলে ধরেছি।”

প্রদর্শনীটি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন নানা বয়সী ও পেশার দর্শনার্থী, যাদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই ছিল বেশি।

মিরপুরের রূপনগর পাইলট স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিভা আক্তার প্রদর্শনী সম্পর্কে বলেন, “এখানের ঘটনাগুলো থেকে অনেক বিষয় জানলাম। ব্যক্তিগত জীবনে এগুলো অনেক কাজে লাগবে। কোনো সমস্যা ঘটার আড়েই সতর্ক হতে পারব।” 

বঙ্গবন্ধু কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ ফাতেমা বলেন, “কত ঘটনা ঘটে যায় আমাদের সমাজের মানুষদের সাথে, সেগুলো এই প্রদর্শনী থেকে জানতে পারলাম। শিক্ষার্থীদের এগুলো জানা জরুরি। বিশেষ করে মেয়েদের।” 

প্রদর্শনীতে ইম্প্রুভিং এসআরএইচআর ইন ঢাকা (নিরাপদ প্রজনন স্বাস্থ্য) প্রকল্পের সহযোগী সংস্থা সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালকসহ কর্মকর্তা, বাপসা, আরএইচস্টেপ, ওজিএসবি ও আইপাস বাংলাদেশ ও প্রকল্পের কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবী ও কমিউনিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।