Published : 18 May 2026, 04:04 PM
পুঁজিবাজারে কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার তদন্তে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ ১৫ আসামির সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকে জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম সোমবার এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, “ওই মামলার তদন্ত চলছে। পুঁজিবাজারে আলোচিত কারসাজির ঘটনায় সম্প্রতি বিএসইসি থেকে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে।”
দুদকের নথি অনুযায়ী, আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে পুঁজিবাজার আইন লঙ্ঘন করে বিনিয়োগের অভিযোগে বিএসইসি এ পর্যন্ত যেসব তদন্ত বা এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদন করেছে, সেগুলোর সত্যায়িত অনুলিপি চেয়ে গত বছরের ১৪ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন।
চিঠিতে বলা হয়, আবুল খায়ের, উপনিবন্ধক, সমবায় অধিদপ্তর, ঢাকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে সরকারি বিধিবিধান ও শেয়ার বাজার আইন লঙ্ঘন করে শত শত কোটি টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।
সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বিএসইসির করা সব তদন্ত বা এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনের সত্যায়িত ছায়ালিপি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে চিঠিতে বলা হয়।
দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে গত বছরের ১৭ জুন পুঁজিবাজার কারসাজির মাধ্যমে অর্থলোপাটের অভিযোগে সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্রুত আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেন।
তারা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিও হিসাবে অসাধু, অনৈতিক ও অবৈধ উপায়ে সিরিজ ট্রানজেকশন, প্রতারণাপূর্ণ অ্যাকটিভ ট্রেডিং, গ্যাম্বলিং ও স্পেকুলেশনের মাধ্যমে ‘মার্কেট ম্যানিপুলেশন’ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, নির্দিষ্ট কিছু শেয়ার সংঘবদ্ধভাবে ক্রমাগত কেনাবেচা করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওই শেয়ারে বিনিয়োগে প্রতারণার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করা হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিসাধন করে ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৩০৪ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
দুদকের ভাষ্য, অস্বাভাবিক রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইনের নামে অর্জিত অর্থ পুঁজিবাজার থেকে সংঘবদ্ধভাবে উত্তোলন করা হয়।
মামলায় আরও বলা হয়, আসামি আবুল খায়ের হিরু তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সহায়তায় ক্যাপিটাল গেইনের নামে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থের ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ১৮৫ টাকার উৎস গোপনের উদ্দেশ্যে লেয়ারিং করে বিভিন্ন খাতে স্থানান্তর করেন।
আবুল খায়ের হিরুর ১৭টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ টাকার অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও মামলার নথিতে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ১২০বি ও ১০৯ ধারায় মামলা করা হয়।
সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী
দুদকের মামলায় বলা হয়েছে, আবুল খায়ের হিরুর মাধ্যমে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এবং সোনালী পেপারস লিমিটেডের শেয়ারে বিনিয়োগ করেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান।
হিরুর কারসাজিকৃত এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করে সাকিব মার্কেট ম্যানিপুলেশনে যোগসাজশ করেন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওই শেয়ারে বিনিয়োগে প্রতারণার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদক বলছে, সাকিব এভাবে ২ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯১৫ টাকা রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইনের নামে পুঁজিবাজার থেকে তুলে আত্মসাৎ করেন।
আসামি যারা
মামলার প্রধান আসামি সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক মো. আবুল খায়ের, যিনি হিরু নামে পরিচিত।
বাকি আসামিরা হলেন—সাকিব আল হাসান, আবুল খায়ের হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, আবুল কালাম মাদবর, কনিকা আফরোজ, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর, আলেয়া বেগম, কাজী ফুয়াদ হাসান, কাজী ফরিদ হাসান, শিরিন আক্তার, জাভেদ এ মতিন, মো. জাহেদ কামাল, মো. হুমায়ুন কবির ও তানভির নিজাম।
গত বছরের এপ্রিলে সাকিবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে তখন দুদকের উপপরিচালক মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।
পরে মাহবুবুল আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর সাকিবের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেনকে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাগুরা ১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাকিব। অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় তিনি কানাডায় ছিলেন। এরপর আর দেশে ফেরেননি তিনি।
এক সময় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং দুদকের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন সাকিব। ২০১৮ সালে দুদকের হটলাইন ১০৬ উদ্বোধন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রচারে তিনি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত হন। তবে নানা বিতর্কের কারণে ২০২২ সালে তার সঙ্গে করা চুক্তি আর নবায়ন করেনি দুদক।
শেয়ার কারসাজির অভিযোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সাকিবকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল বিএসইসি। এরপর ৮ নভেম্বর তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করার কথা জানায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বিদেশে থাকা সাবেক এই সংসদ সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আসে গত ১৬ জুন।