Published : 05 Dec 2025, 11:52 PM
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, ঢাকা, বেইজিং ও ইসলামাবাদের মধ্যকার সাম্প্রতিক ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশ এবং এর বাইরেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
বুধবার ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এক পক্ষই সব সুবিধা পাবে— আমরা এমন দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী। আমরা বরাবরই জোর দিয়ে বলেছি, মুখোমুখি দাঁড়ানোর চেয়ে পারস্পরিক সহযোগিতাটা জরুরি।”
আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ঘিরে পাকিস্তানের এ ধরনের প্রস্তাব মূলত বিকল্প একটি জোট গঠনের আকাঙ্ক্ষাই ফুটিয়ে তোলে।
পাকিস্তান এমন সময় এ ধরনের জোটের দিকে মনোযোগ দিয়েছে, যখন ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির বিরোধিতায় দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জোট— সার্ক প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
গত জুনে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করেন চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা। বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবনযাপনের মান উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
তিন দেশের কূটনীতিকরা ওই সময় বলেন, তাদের এ উদ্যোগ ‘তৃতীয় কোনো পক্ষকে’ লক্ষ্য করে নয়।
ইসহাক দারের এ ধরনের মন্তব্য এমন প্রেক্ষাপটে এলো, যখন ভারত-পাকিস্তানের কয়েক দশকের বৈরিতাসহ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে।
পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র গেল মে মাসে চার দিনের যুদ্ধে জড়ায়, যা তাদের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
এর মধ্যে বাংলাদেশে গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে।
শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং নয়াদিল্লি এখনও তাকে ঢাকায় ফেরত পাঠাতে রাজি হয়নি।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ কি এমন জোট গঠনে রাজি হবে, যেখানে ভারতকে বাদ দেওয়া হবে কিংবা তাদের কর্তৃত্ব সীমিত করে ফেলবে?
কী আছে পাকিস্তানের প্রস্তাবে?
বাংলাদেশ ও চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের উদ্দেশ্য হিসেবে ইসহাক দার বলেছেন, অভিন্ন স্বার্থ আছে, এমন পরিসরে তারা পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে চান।
অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলকে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“আমি আগেও বলেছি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রযুক্তি কিংবা যোগাযোগ স্থাপন— বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ থাকতে পারে।”
ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমাদের নিজেদের জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজন ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারগুলো নির্দিষ্ট কারো কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না এবং থাকা উচিতও নয়। এক্ষেত্রে আমি কোন দেশকে বোঝাতে চাইছি, তা আপনারা জানেন।”
ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির মধ্যকার উত্তেজনা তুলে ধরে দার বলেন, দুই দেশের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রক্রিয়াটি প্রায় ১১ বছর ধরে স্থবির হয়ে পড়ে আছে।
“আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সম্পর্কও নানা দোলাচলের মধ্যে দিয়ে গেছে।”

উপ-প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা দার বলেন, “ইসলামাবাদ এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বিভেদের পরিবর্তে সংযোগ ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা পাবে, অর্থনীতিগুলো পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠবে, যেখানে বিতর্কগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সুরাহা হবে এবং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা পাবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের এ ধরনের প্রস্তাব যতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তার চেয়ে বেশি ‘আকাঙ্ক্ষামূলক’।
ইউনিভার্সিটি অব লাহোরের সেন্টার ফর সিকিউরিটি, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের (সিএসএসপিআর) পরিচালক রাবিয়া আক্তার বলেন, “পাকিস্তান এমন সময় নতুন আঞ্চলিক ব্লক তৈরির কথা বলছে, যখন সার্ক প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে।”
দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশ— বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করে সার্ক। ২০০৭ সালে আফগানিস্তান যোগ দিলে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় আটে।
পাকিস্তানের প্রস্তাব কাজ করবে?
রাবিয়া আক্তার মনে করেন, প্রস্তাবটি কার্যকর হবে কিনা, তা মূলত নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের উপর।
“প্রথমত, সার্কের মতো জোট যেখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে, সেখানে এ অঞ্চলের দেশগুলো এমন ছোট গ্রুপ করে তোলাকে অর্থবহ মনে করবে কিনা। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের উদ্যোগে জড়ালে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মাশুল দিতে হবে কিনা।”
রাবিয়া আক্তার বলেন, পাকিস্তানের এমন আঞ্চলিক উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখাতে পারে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের প্রস্তাবে খুব একটা সাড়া হয়ত মিলবে না।
“আমার মনে হয় শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও সম্ভবত ভুটান যোগাযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখাতে পারে।”
তবে ভারতের আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা এবং পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দেশটির বিরোধের কারণে এমন জোটের সদস্যপদ নেওয়ার ক্ষেত্রে সব দেশই সতর্কতার সঙ্গে এগোবে বলে মনে করেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অল্প সময়ের মধ্যে এমন কোনো জোট গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের (এএসপিআই) সাউথ এশিয়া ইনিশিয়েটিভসের পরিচালক ফারওয়া আমেরও।
তবে আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বহুপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা এ বিশ্লেষকের।
কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এক বা দুটি দেশের সঙ্গে কাজ করা তুলনামূক সহজ। স্পষ্ট প্রণোদনা ও বাস্তব ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। ফলে পাকিস্তানের প্রস্তাবটি ‘কৌশলগতভাবে সুসংগত’ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “পাকিস্তান বর্তমানে কূটনৈতিক দিক থেকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। চীনের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রেখেও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে তুলেছে।
“এই দুই কূল রক্ষার বিষয়টি ইসলামাবাদকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে।”