Published : 08 Jun 2026, 10:46 PM
রাশিয়ায় গিয়ে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে অনুরোধ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
সোমবার মস্কোতে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে এ অনুরোধ করার কথা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়, “এ ব্যাপারে (প্রত্যাবাসন) তার সরকারের পূর্ণ বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ।”
কাজের কথা বলে বাংলাদেশি যুবকদের রাশিয়ায় পাঠিয়ে পরে ইউক্রেইন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করার তথ্য এসেছে। যুদ্ধের মধ্যে অনেকের নিহত হওয়ার খবরও এসেছে।
সোমবারই জাতীয় সংসদ এক প্রশ্নে এমন একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, “রাশিয়াতে ৩০ জন কর্মীকে কাজের কথা বলে তাদেরকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছে। তাদের পরিবার আমাদেরকে জানিয়েছে।
“আমরা তাৎক্ষণিক তিনটা রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
তবে কোন বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের অনুরোধ জানানো হয়েছে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়নি।

তিন দিনের সফরে রোববার মস্কো গেছেন খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে রাশিয়া যান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথমদিকের দেশগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যতম ছিল। উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) একাশিতম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার প্রার্থিতায় রাশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দুই নেতা শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা খাতে চলমান সহযোগিতা পর্যালোচনা করেন এবং এসব ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য রাশিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) সুবিধা প্রদানের অনুরোধ করেন এবং বাংলাদেশি পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কগুলোতে রাশিয়ার বিনিয়োগ কামনা করেন। বিশেষ করে হালকা ও ভারী প্রকৌশল শিল্প, খাদ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
খলিলুর রহমান ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের (ইইসি) সঙ্গে বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে রাশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন।
বর্তমানে রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান ইইসির সদস্য। একই সঙ্গে তিনি ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সমর্থন চান।
জবাবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ায় রাশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে রাশিয়ার পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আরও জনশক্তি নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। দুই দেশ নিরাপদ ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে। পাশাপাশি মানবসম্পদ পুননিয়োগ চুক্তিসহ বিভিন্ন ঝুলে থাকা সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয় বৈঠকে।
এছাড়া বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সমস্যার একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে রাশিয়া সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে তুলে ধরেন ল্যাভরভ।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ সফরের জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান খলিলুর রহমান। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে সফরের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেন সের্গেই ল্যাভরভ।