Published : 05 Feb 2026, 08:07 PM
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের সঙ্গে ‘ভালো কর্মসম্পর্ক’ করতে চাইলেও সফল হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে সমাপনী ব্রিফিংয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন সরকার এলে দুদেশের সম্পর্ক আবারও ‘মসৃণ হবে’।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অভিহিত করে এক প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, প্রতিবেশি দেশটির সঙ্গে ‘পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভালো কর্মসম্পর্ক’ রাখার কথা শুরুর দিন থেকে বলে আসছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে সরকারের সবাই এটা চেয়েছেন।
“সফল হয়েছি, এটা ঠিক বলতে পারি না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই এটা তো অনেকটাই থমকে আছে। আমি বলব না যে ক্রাইসিস সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কটা থমকে আছে। আমি দোষারোপ করতে চাই না কাউকে। ভারত নিশ্চয়ই তাদের স্বার্থ যেভাবে তারা চিন্তা করে, সেভাবেই করেছে। আমরা আমাদের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হয় বলে ভেবেছি, সেভাবে চেষ্টা করেছি।”
দুদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে মেলেনি বলে মন্তব্য করে তৌহিদ হোসেন বলেন, “এটা গ্রহণ করে নিতে হবে, আমাদের দুই পক্ষের নিজস্ব স্বার্থের যে একটা ধারণা, সেই দুটো স্বার্থের ধারণাটার মধ্যে একটা তফাত রয়ে গেছে, যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে আমরা এগোতে পারিনি।
“আমি আশা করব যে, আমার উত্তরাধিকারী যিনি আসবেন এবং আমাদের এই সরকারের উত্তরাধিকারী যে সরকার হবে, তাদের সময় আবার সম্পর্ক মসৃণ হবে।”
যেকোনো দেশের সঙ্গেই বিরোধপূর্ণ বিষয় থাকে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমি এটা সব দেশের ক্ষেত্রে বলি যে, ইস্যুজ থাকবেই, সেগুলো নিয়ে কিছু সংঘাতও থাকবে স্বার্থে।
“কিন্তু তারপরেও একটা মসৃণ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সেটা আমি আশা করব যে, আমাদের পরবর্তী সরকার সে ব্যাপারে অগ্রসর হতে পারবে। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ ছিল না, এটা আমি স্বীকার করেই নিলাম, কারণ অনেকগুলো সমস্যা হয়েছে।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করলে এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে ভালো কর্মসম্পর্ক গড়া সম্ভব হবে কিনা, এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, “ভারতের ব্যাপারে বিষয়টা হচ্ছে এরকম, আমার মনে হয়, এর চেয়ে বেশি ডিটেইলসে যাওয়া আমাদের প্রয়োজন নেই।
“আপনি তো নৈরাশ্যবাদী হতে পারেন না। আপনাকে আশাবাদী হতেই হবে। আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি এজন্য যে, কোনো একটা পথ নিশ্চয় বেরোবে, যাতে করে এই সমস্যাগুলোর এক ধরনের একটা সমাধানে পৌঁছতে পারে।”
হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে লিখিত প্রতিউত্তর না পেলেও অন্য কোনো মাধ্যমে এ বিষয়ে ভারতের মনোভাব জানা গেছে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “মনোভাব একটা অত্যন্ত বিমূর্ত জিনিস।
“মনোভাব নিয়ে কথা না বলা উচিত। অফিশিয়ালি যেটা করা হয়েছে, সেটাই শুধু অফিশিয়ালি বলা যাবে যে, ‘হ্যাঁ, আমরা রিটার্ন চেয়েছি এবং ভারত থেকে কোনো রেসপন্স পাইনি। আমার মনে হয়, এর বাইরে এটা নিয়ে ওই চিন্তায় যাওয়া ঠিক হবে না।”
‘বোঝা নয়, কাজ এগিয়ে রাখছি’
বিদেশিদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা রেখে যাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি বরং উল্টোটা মনে করি। এই কারণে যে, বার্ডেন রেখে যাওয়ার পরিবর্তে বরং আমার আমি মনে করি যেটা যে, আমরা অনেকগুলো ইস্যু এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছি, যেন সহজ হয় পরবর্তী সরকারের জন্য করা।”
দরকষাকষির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমাতে পারার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইউএসের সঙ্গে ট্রেড ডিল যেটা, আমরা তো তাদের সঙ্গে নেগোশিয়েট করেছি, সবসময় জড়িত ছিলাম, এগিয়ে গেছি বলেই কিন্তু ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
“আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে ভারতের ক্ষেত্রে কিন্তু এটা ১৮-তে নেমে এসেছে, পাকিস্তানের জন্য ১৮ হয়েছিল। তো আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের জন্য এটা অন্তত ওই পরিমাণ নামানো যায় কিনা। যদি আমরা এটা করে যেতে পারি, আমি তো মনে করি, পরবর্তী সরকারের জন্য একটা কাজ কমিয়ে দিয়ে গেলাম আমরা; তাদের জন্য সহজ করে দিয়ে গেলাম।”
জাপানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যে চুক্তি হচ্ছে, তা হঠাৎ করে হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, “কিছু কিছু আছে, যেসব ইনিশিয়েটিভ আরও আগে থেকে হচ্ছিল এবং সেগুলোকে আমরা ফলো-আপ করেছি গত এক-দেড় বছর ধরে, এখন উপসংহারের কাছাকাছি এসেছে; আদতে আরও হয়ত এক মাস আগে হতে পারত, কিন্তু তার মধ্যে আমরা দুই-একটা পয়েন্ট দেখি যে, আমাদের খুব পছন্দ হচ্ছে না, স্বার্থে যাচ্ছে না, সেগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে দরকষাকষি করতে হয়েছে।
“এবং এখন যদি একটা চুক্তি সই হয়, তাহলে আবার আমি বলি যে, এটা একটা কাজ এগিয়ে থাকল। এরপরেও দেখুন, একটা যদি চুক্তি সই হয়ও, সেটার অধীনে কিন্তু করার যে জিনিসগুলো থাকবে, সেগুলো কিন্তু এরপরে আসবে আস্তে আস্তে এবং একটা কাঠামো থেকে গেলেও পরবর্তী সরকার বরং সহজভাবে এটাকে ফলো-আপ করতে পারবে।”
বিভিন্ন কাজে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ‘উপেক্ষা’ করার কথা তুলে ধরে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি তো আপনাদেরকে প্রথমেই বলেছিলাম যে, দেশ তো স্বাধীনতা অর্জন করল, আমার স্বাধীনতা শেষ।
“কাজেই এটা আর ইলাবরেট না করি। সরকারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের টানাপোড়েন থাকেই, এটা পার্ট অব দ্য গেম। কাজে এটা নিয়ে আমার মনে হয় আর বেশি কথা না বলাই ভালো।”