Published : 10 Nov 2025, 01:47 AM
পঞ্চাশের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন জেলরোডে একটি বাড়ি কিনেছিলেন সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ; তার ইচ্ছা ছিল এই বাড়িতে একটি সংগীত কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। ১৯৫৬ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠা পায় ‘দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’।
পাঁচ বছর আগে সেই সংগীতাঙ্গনের জমির মালিকানা দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হন চারজন। তাদের মধ্যে হাবিব খাঁ নামে একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তিনি আলাউদ্দিন খাঁর বড় মেয়ে সরোজা বেগমের নাতি। বাকি তিনজনও সরোজা বেগমের উত্তরসূরী হিসেবে বংশ পরম্পরায় এ জমির মালিক বলে তার দাবি।
হাবিব খাঁ বলছেন, বাড়িটি আলাউদ্দিন খাঁ তার বড় মেয়ে সরোজা বেগমকে ‘দিয়েছিলেন’। সরোজা বেগম পরে বাড়িটি নাতিদের দেন। তাদের কাছে ‘দলিল আছে’।
তারা জমির মালিকানা দাবি করে ২০২০ সালে মামলা করেন। সম্প্রতি সংগীতাঙ্গনের আট শতাংশ জায়গা বাদীদের নামে খতিয়ান করার জন্য আদালতের নির্দেশনা এসেছে।
কিন্তু আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলছেন, মামলায় জেলা প্রশাসককে বিবাদী করা হলেও আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে বিবাদী করা হয়নি। ফলে মামলার বিষয়টি তখন আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জানা ছিল না। তাতে মামলার রায় হয়েছে ‘একপাক্ষিক’।
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন পরে আদালতে আপিল করেছে; যা এখন বিচারের অপেক্ষায় আছে বলে মনজুরুল আলম জানিয়েছেন।
আপিলে বাদী হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক এবং আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক।
মনজুরুল আলমের দাবি, জমি সংগীতাঙ্গনেরই আছে। মামলায় ‘অনেক মিথ্যা তথ্য’ দেওয়া হয়েছে।
“আলাউদ্দিন খাঁর মেয়ে সরোজা বেগম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হালদারপাড়াতে থাকতেন। তিনি জীবিত থাকতে কখনো সংগীতাঙ্গনের জমির মালিকানা দাবি করেননি। কারণ তিনি জানতেন, আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব এটি সংগীতাঙ্গনকে দান করে গেছেন। সংগীতাঙ্গন একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়; যেখানে জেলা প্রশাসক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।”
অন্যদিকে হাবিব খাঁ বলছেন, বাড়ির দলিলে ৫২ শতকে থাকলেও খতিয়ানে আছে ৪৫ শতক। সেখান থেকে তারা ৮ শতকের রায় পেয়েছেন।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সরোজা বেগমই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকতেন। অন্য দুই মেয়ে এবং ছেলের বংশধরেরা ভারতের মাইহার, কলকাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিন প্রজন্মে অন্তত ৮০ জনের মত বংশধর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতি ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য নাসির মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইভ্যুনালে যে মামলাটি হয়েছে, তার বাদীদের দাবি, তারা এখানে আট শতক জায়গার মালিক। তারা এখানে বাড়ি করেছে এবং পুকুরে মাছ চাষ করে ভোগ তছরুপ করেছে।”
তিনি বলেন, “মামলাটি যারা করেছেন, তারা পক্ষ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসককে। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি হলেও আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের নির্বাহী পদে আছেন সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সাধারণ সম্পাদককে বিবাদী করা হয়নি।

“ফলে একতরফা একটা রায় হয়েছে এবং বাদীদের নামে আট শতক জায়গা বিএস খতিয়ান করে দেওয়ার আদেশ হয়েছে। এখন সরকার পক্ষ বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইভ্যুনালের আদেশটি বাতিল চেয়ে আপিল করেছে; যা জেলা জজ আদালতে চলমান আছে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমি নিয়ে আদালতে আপিল হয়েছে। এটি এখন বিচারাধীন আছে।
আলাউদ্দিন খাঁ কোনো জমি দান করেননি, দাবি ভাতিজার
আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা সুরকার ও সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান বলছেন, আলাউদ্দিন খাঁ কোনো জমি ‘দান করেননি’। আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে নিজেদের ‘পারিবারিক সম্পত্তি’ বলেও দাবি করেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বাড়িটি কিনেছিলেন আমার চাচা আলাউদ্দিন খাঁ। আমার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ‘আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠা করেন। আয়েত আলী খাঁ তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকতেন এবং নিয়মিত সংগীত শিক্ষা দিতেন। পরে তিনি কুমিল্লায় বসবাস শুরু করলেও প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে সংগীত শিক্ষা দিতেন।
“আয়েত আলী খাঁ মারা যাওয়ার পর থেকে আমার ভাগিনা হানিফ গাজী আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন দেখাশোনা করতেন। তখন তার সহকারী হিসেবে আব্দুল মান্নান সরকার এটি দেখভাল করেছেন। হানিফ গাজী মারা যাওয়ার পর জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে একটি কমিটি এটি পরিচালনা করে আসছে।”
এখন এটি ‘নিজেদের নিয়ন্ত্রণে’ নিতে চান জানিয়ে শেখ সাদী বলেন, “আলাউদ্দিন খাঁর নামে একটা প্রতিষ্ঠান, অথচ এখানে বিগত সময়ে রাজনৈতিক সভা-সেমিনারও হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে একজন বড় শিল্পী তৈরি হল না, এটা দুঃখজনক! অথচ আমাদের বংশের লোকেরা সারা পৃথিবীতে সংগীত শিক্ষা দিয়ে বেড়ান। এখন আমরাই এটি নিজেরা পরিচালনা করব।”
আলাউদ্দিন খাঁ কী চেয়েছিলেন?
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামে। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের পরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ভারতের মাইহারের রাজদরবারে সংগীত গুরুর আসন লাভ করেন। এরপর সেখানে বসবাসও শুরু করেন।
১৯৩৫ সালে নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। ইংল্যান্ডের রাণি তাকে সে সময় সুর সম্রাট খেতাব দেন।
তিনি প্রথম তালিম নেন বড় ভাই সংগীত সাধক ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁর কাছে। পরে বাংলার জনপদে ঘুরে ঘুরে তিনি খুঁজে পান লোক সুরের ভাণ্ডার।
আলাউদ্দিন খাঁ কলকাতার সংগীত সাধক গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুনো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। অমৃত লাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের কাছে তিনি বাঁশি, সেতার, মেন্ডোলিন, ব্যাঞ্জোর মত যন্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন।
১৯৫২ সালে সংগীত একাডেমি পুরস্কার, ১৯৫৮ সালে ভারতের পদ্মভূষণ পুরস্কার, ১৯৭১ সালে পদ্ম-বিভূষণ, ১৯৬১ সালে বিশ্ব ভারতী প্রবর্তিত দেশিকোত্তম খেতাব পান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। ১৯৭২ সালে ৬ নভেম্বর এই সংগীতসাধকের জীবনাবসান হয়।

আলাউদ্দিন খাঁ যে নিজের জমি ‘দেবোত্তর’ করতে চেয়েছিলেন; সেই ইচ্ছার কথা তার একটি চিঠিতে পাওয়া যায়।
১৯৫৪ সালে আলাউদ্দিন খাঁ এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সে সময় শিবপুরের বাড়িতে বাবা-মায়ের কবর পাকা করার পাশাপাশি একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ করেছিলেন।
মাইহারে আলাউদ্দিন খাঁর সহকারী এবং শিষ্য ছিলেন যতীন ভট্টাচার্য; যিনি সরোদ বাদক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবেও পরিচিত। ১৯৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর শিবপুর থেকে আলাউদ্দিন খাঁ যতীন ভট্টচার্যকে লেখেন, “শ্রীমান বাবা যতীন, তোমার পত্রে প্রোগ্রাম লিস্ট পাইলাম। দস্তখত করে এলাহাবাদ রেডিওতে পাঠিয়েছি। মসজিদের কার্য্য সারিতে আর ১ মাস লাগিবে, এই সঙ্গে পিতামাতার কবরস্থান পাকা করা আরম্ভ হয়ে গেছে।”
“এরপর সম্পত্তি যা আছে তাহা দেবোত্তর করিতে হবে। তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাটিতে আলাউদ্দিন সংগীত কলেজ স্থাপন করার বাসনা করি। তারপর শিবপুর গ্রামে মেয়েদের স্কুল খুলিবার বাসনা আছে।”
জমির কাগজপত্র নিয়ে কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামে ছুটে বেড়ানোর তথ্য পাওয়া যায় আরেকটি চিঠিতে।
১৯৫৫ সালের ৬ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যতীন ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠিতে আলাউদ্দিন খাঁ লেখেন, “এখানে থেকে আমার সাংসারিক বিষয়-আসয় যা কিছু সম্পত্তি আছে তাহার সুবন্দোবস্ত করিতেছি। একদিনে দুদিনে এসব কাজ হয় না। এক একটি দরখাস্ত দিলে তাহা মঞ্জুর হয়ে আসিতে ৩-৪ মাস লাগে। এজন্য কত যে বেগ পাইতেছি তাহা যদি তুমি করিতে, তবে বুঝতে পারতে।”
“মাসের মধ্যে দুইবার চারিবার কুমিল্লা, চিটাগাং দরখাস্তের তদারক করিতে ও হাকিমদের খোশামোদি করিতে হয়। ভাগ্য ভালো পাকিস্তানের অফিসার ও জনতা ভদ্রমণ্ডলি সকলে আমাকে বড় আদর-যত্ন করে, ওরা খেটে-খুটে আমার কার্য্য যত শীঘ্র হয় তাহা করে দিতেছেন, এদের কাজে আমি চিরকৃতজ্ঞ।”

‘ছেলেও কোনোদিন মালিকানা দাবি করেনি’
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন শুরু থেকেই সরকারের সম্পৃক্ততায় পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৫৬ সালে যখন প্রতিষ্ঠানটি শুরু করা হয়, তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন সভাপতির দায়িত্বে।
প্রথম দিকে এর নাম ছিল ‘আলাউদ্দিন খাঁ মিউজিক্যাল কলেজ’। স্বাধীনতার পর এটি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের রূপ পায়। খাঁ পরিবারের সদস্যদের অনেকেও বিভিন্ন সময় পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত ছিলেন।
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলেন, “আলাউদ্দিন খাঁর ভাই আয়েত আলী খাঁ প্রথম দিকে এখানে সংগীত শেখাতেন। পরে বিভিন্ন সময় মোবারক হোসেন খাঁ, শাহাদাত হোসেন খাঁ কমিটিতে যুক্ত ছিলেন। তারা তো কখনোই এই জমির মালিকানা দাবি করেননি। কারণ তারা জানতেন, এটি আলাউদ্দিন খাঁ নিজ থেকেই প্রতিষ্ঠানকে দান করে গেছেন।
“তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের সই আছে সেই ‘ওছিয়তনামায়’। সেখানে লেখা ছিল, এটা মহকুমা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। পরে তো এটি কলেজে রূপান্তর করা হয়নি।”
বর্তমানে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বেই এ প্রতিষ্ঠান চলছে জানিয়ে মনজুরুল আলম বলেন, “সরকারিভাবে এখানে ছয়তলা একটি কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা তো অনেক দূর এগিয়েছে। প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি করা হবে।”
স্বাধীনতার পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে এ প্রতিষ্ঠানের নবযাত্রার কথা তুলে ধরে মনজুরুল আলম বলেন, “তখন এসডিও (প্রশাসক) ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। জয়নুল আবেদিনকে আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে আলী আকবর খাঁ অনুরোধ করেছিলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার বাবার গড়া একটা প্রতিষ্ঠান আছে। তখন জয়নুল আবেদিন জেলা প্রশাসক তোফায়েল আহমেদকে অনুরোধ করেন। এরপর সীমানা প্রাচীরসহ কিছু সংস্কার কাজ করা হয়। একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন নামে নবযাত্রা শুরু হয়।”
জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৭ সালে আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে আলী আকবর খাঁ নিজেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছিলেন। সংগীতাঙ্গনের অনুষ্ঠানে তিনি বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেছিলেন। শহরের মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল।

আলাউদ্দিন খাঁর মেয়ে সরোজা বেগমও যে জমির মালিকানা দাবি করেনি, সেটা তার উত্তরসূরীরা কীভাবে দাবি করছে–এমন প্রশ্ন রেখে মনজুরুল আলম বলেন, “এখানে ট্যাক্সের কাগজ, বিদ্যুৎ বিলের কাগজ, মিটিংয়ের রেজোলিউশন- সবই সংগীতাঙ্গনের নামে। অথচ তারা বলছে, এখানে তাদের বাড়িঘর আছে। এটা মিথ্যা। এরকম অনেক মিথ্যা দিয়ে মামলাটা করা হয়েছে।”
আলাউদ্দিন খাঁর দানপত্র আছে কিনা, জানতে চাইলে মনজুরুল আলম বলেন, “আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে তো দুই দফায় আগুন দেওয়া হয়েছে। সংগীতাঙ্গনে আলাউদ্দিন খাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথির সাথে ‘ওছিয়তনামা’ও আগুনে পুড়ে গেছে। তবে সেটি আমি দেখেছিলাম। সেখানে মিউজিক্যাল কলেজ করার জন্য জায়গাটি মহকুমা প্রশাসকের কাছে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে মহকুমা প্রশাসক এবং পরে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হচ্ছে।”
দুই দফায় আগুন
২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে অতর্কিত হামলা করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে ২০২১ সালের মার্চেও দ্বিতীয় দফায় অগ্নিসংযোগ করা হয় সেখানে।
তাতে সংগীতাঙ্গনে রক্ষিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত সরোদ, বেহালা, সন্তুর, এস্রাজ, সৌদি আরবের বাদশাহর দেওয়া জায়নামাজ, ভারতের মাইহার রাজ্যের রাজার দেওয়া গালিচাসহ বহু মূল্যবান সামগ্রী পুড়ে যায়।
এছাড়া বিভিন্ন সময় আত্মীয় ও শিষ্যদের কাছে সুরসম্রাটের নিজ হাতে লেখা বহু চিঠি, ছবি ও বড় পোর্ট্রেট পুড়ে যায় সেই নাশকতার আগুনে।
সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলেন, “আলাউদ্দিন খাঁর লেখা চিঠি সংরক্ষিত ছিল সংগীতাঙ্গনে; যা আগুনে পুড়ে যায়। পুড়ে যাওয়া কিছু বাদ্যযন্ত্র আমরা সংষ্কার করেছিলাম। দ্বিতীয় দফার আগুনে সেগুলো পুড়ে যায়।”

‘বিশেষ গোষ্ঠীর চোখ পড়েছে’
গত ৩১ অক্টোবর সকালে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের প্রবেশ গেইট দিয়ে ভেতরে যেতেই কানে আসে তবলার তাল আর নূপুরের নিক্কণ।
বাড়িটির একটি কক্ষে চলছে তবলা প্রশিক্ষণ, অন্য কক্ষ থেকে ভেসে আসছে হারমোনিয়ামের আওয়াজ। এটি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের প্রতি শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত চিত্র।
আরেকটি ছোট গেইট দিয়ে ভেতরে যেতেই মিলনায়তনে দেখা গেল নৃত্য শিক্ষক মোহাম্মদ আল সাইফুল আমীন জিয়া ওরফে জিয়া আমীন শিক্ষার্থীদের নাচ শেখাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি নাচের দল জাপানের ওসাকা এক্সপো ইন্টারন্যাশনালে নাচ পরিবেশন করে এসেছে।
মেয়েকে নাচের ক্লাসে নিয়ে এসেছিলেন হুসনে আরা নামে একজন অভিভাবক। আক্ষেপ করে তিনি বললেন, “আলাউদ্দিন খাঁর নামে এই প্রতিষ্ঠান। অথচ তার বংশধরদের কেউ এখানে এসে প্রশিক্ষণ দেন না। আমরা তো আশা করি বছরে অন্তত ৩/৪ বার তারা এখানে এসে আমাদের সংগীত, নাচ ও বাদ্যযন্ত্রের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবেন।”
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন প্রতিষ্ঠার পর থেকে কালক্রমে এই প্রতিষ্ঠানের জায়গায় তিনশ আসনের একটি অডিটোরিয়াম, ক্লাসরুম বৃদ্ধির জন্য ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মিত হয়েছে। সংগীত প্রশিক্ষণ (উচ্চাঙ্গ ও সাধারণ), নৃত্য প্রশিক্ষণ (উচ্চাঙ্গ ও সাধারণ), বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ ও চারুকলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে সংগীতাঙ্গনে রয়েছে চার শতাধিক শিক্ষার্থী।
এত বছর পর হুট করে আলাউদ্দিন খাঁর বংশধরদের জমির মালিকানা দাবি করার ঘটনাটি স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের ‘অস্তিত্ব’ বিলীন হওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।
সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন রক্ষা করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। আলাউদ্দিন খাঁর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর নির্মাণেরও পরামর্শ এসেছে।

এ প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলেন, “আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করে সরকার যেন এখানে বড় পরিসরে কিছু করার পরিকল্পনা করে, তার জন্য কয়েক বছর আগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবটি এখন অনেকটা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই এখানে সরকারি উদ্যোগে আলাউদ্দিন খাঁর নামে সংগ্রহশালা, মিলনায়তন, প্রশিক্ষণ কক্ষসহ একটি বড় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হবে।”
গত ৩১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে ‘সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গণের’ ভূমি সুরক্ষা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবিতে মানবন্ধন করে উদীচী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সংসদ।
সংগঠনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার সভাপতি জহিরুল ইসলাম স্বপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলাউদ্দিন খাঁ এই জমিটি সংগীতাঙ্গনকে দান করে গেছেন বলেই আমরা জানি। বহু বছর ধরেই তো আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন পরিচালিত হচ্ছে। এত বছর পর এসে জমির মালিকানা দাবি করা হচ্ছে! কারা এই মালিকানা দাবি করছেন, তাদের উদ্দেশ্য কী? আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার জন্য সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার দাবি জানাই।”
শহরের প্রাণকেন্দ্রে ওই জমিতে ‘বিশেষ গোষ্ঠীর চোখ পড়েছে’ মন্তব্য করে স্বপন বলেন, “এই জায়গার বাজার মূল্য অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের কাছে তার চেয়েও বেশি মূল্যবান হল এটি আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিচিহ্ন। এটা রক্ষা করতে হবে।”
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘হেম-বেহাগের মহারাজা’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছেন আলোকচিত্রী ও গবেষক নাসির আলী মামুন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তিনি ছড়িয়ে আছেন সারা পৃথিবীতে। তাকে নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। তাকে নিয়ে কাজ করতে হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভারতের মাইহার, কলকাতা এবং আমেরিকায় যেতে হবে। এটা অনেক টাকার ব্যাপার। ফলে তাকে নিয়ে বড় কোনো গবেষণার কাজ হয়নি। তার ভাতিজা মোবাররক হোসেন খান কিছু কাজ করেছেন।”

এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মামুন বলেন, “এখনো দেশে-বিদেশে আলাউদ্দিন খাঁর অনেক মূল্যবান স্মারক, তার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলো সংগ্রহ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা বড় পরিসরে জাদুঘর করা ভীষণ জরুরি।”
আলাউদ্দিন খাঁর নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় করারও দাবি জানান নাসির আলী মামুন।
তিনি বলেন, “আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তাতে আলাউদ্দিন খাঁকে যেন অসম্মান করা না হয়। আলাউদ্দিন খাঁ শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা বাংলাদেশের নয়। তিনি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান করা জরুরি। এই দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার তো ঢাকার লালবাগ কেল্লায় বেশ আয়োজন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়েছে। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জমির মালিকানার দ্বন্দ্বে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন। এটা কাম্য নয়।
“শুনেছি, বাড়িটির সাংস্কৃতিক মূল্য বিবেচনা করে সরকার থেকে এখানে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেটা কী পর্যায়ে আছে, জানি না। আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিস্মারক হিসেবে আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন রক্ষা করা উচিত।”