Published : 27 Sep 2025, 10:26 PM
ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে উলুধ্বনি, শঙ্খনাদ আর কাসর ঘণ্টা বাজিয়ে ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে রোববার। তার আগে শনিবার সন্ধ্যায় হল বোধন, অর্থাৎ দেবীর ঘুম ভাঙানোর বন্দনা পূজা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের উপদেষ্টা পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বোধন হল ‘জাগরণ’, ঘুম থেকে জাগানো। উপলব্ধি করা যে দেবী এসেছেন। আর ষষ্ঠীর অধিবাস হল আমন্ত্রণ জানানো যে আমরা দেবীর পূজা করব। মূলত সপ্তমী থেকে পূজা শুরু।”
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে ‘কন্যারূপে’ মর্ত্যলোকে বাবার বাড়ি আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা; বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার এই ‘আগমন ও প্রস্থানের’ মাঝে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত পাঁচ দিন চলে দুর্গোৎসব।
গত ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মাধ্যমে এবারের দুর্গোৎসবের প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ষষ্ঠী তিথিতে রোববার বেলতলায় দেবীর অধিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব থেকে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হবে।
হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা- এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন হবে গজে অর্থাৎ হাতির পিঠে চড়ে। গজে আগমন বা গমন হলে বসুন্ধরা শস্য শ্যামলা হয়। দশমীতে দেবী মর্ত্যলোক ছাড়বেন দোলায় চড়ে। আর দোলায় দেবীর গমনকে মহামারী বা মড়কের ইঙ্গিত ধরা হয়।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুক্রবার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ‘বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ’ ও ‘মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি’ আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার ঢাকায় গতবারের তুলনায় সাতটি বেড়ে মোট ২৫৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। আর সারাদেশে মোট মণ্ডপের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৩৫৫টি, যা গতবারের তুলনায় প্রায় হাজারখানেক বেশি।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব বলেছেন, “আমরা এমন একটি সমাজের অপেক্ষায় আছি, যে সমাজে ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমাসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও সার্বজনীন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে, অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে, কোনো ধরণের ভয়ভীতি এবং পুলিশি পাহারা ব্যাতিরেকে অনুষ্ঠিত হবে।”

পূজার নিরাপত্তা
দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন জেলার সাত শতাধিক মণ্ডপকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট।
অন্যদিকে দুর্গাপূজা সামনে রেখে দেশের ২৯ জেলাকে ‘ঝুঁকিপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নাগরিক সমাজের নবগঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব বলেছে, ঝুঁকি ‘পর্যালোচনা করে’ দুর্গাপূজায় র্যাব কর্তৃক ‘বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোনো সহিংসতা ও নাশকতা প্রতিরোধ ও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকায় র্যাবের ৯৪টি টহলসহ সারাদেশে ২৮১টি টহল দল মোতায়ন রয়েছে।
অন্যদিকে সীমান্তবর্তী এলাকাসহ সারাদেশে ৪৩০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করার কথা শনিবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।
দেশের ২ হাজার ৮৫৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিজিবির সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সীমান্তবর্তী এলাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবির ২৪টি বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।”
বিজিবি বলছে, মোট ২ হাজার ৮৫৭টি মণ্ডপের মধ্যে সীমান্তের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৪১১টি মণ্ডপ। এর মধ্যে পার্বত্য এলাকায় রয়েছে ১৫টি পূজামণ্ডপ। আর সীমান্তবর্তী এলাকার বাইরে রয়েছে ১ হাজার ৪৪৬টি।
সীমান্ত এলাকার বাইরের পূজামণ্ডপ মধ্যে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৪৪১টি; চট্টগ্রাম মহানগরী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় মোট ৬৯৪টি এবং অন্যান্য স্থানে ৩১১টি পূজামণ্ডপ রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূজা উপলক্ষে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী করার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল পরিচালনা করছে বিজিবি।

প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু ধর্মমতে জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে আসেন এবং ভক্তদের কল্যাণ সাধন করে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে লালন করেন।
“অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের এই আরাধনা শারদীয় দুর্গোৎসবের তাৎপর্যকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের অপূর্ব মেলবন্ধনের অনন্য নিদর্শন বাংলাদেশ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সকলের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই ধারাকে সমুন্নত রেখে এবারের দুর্গাপূজাও সারাদেশে নির্বিঘ্নে এবং যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হবে বলে আমি আশা করি।”
শান্তি, মৈত্রী ও সাম্য সকল ধর্মের মূল উপজীব্য মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “মানুষের কল্যাণ সাধনই সব ধর্মের মূল শিক্ষা। তাই নিজ নিজ ধর্মের যথাযথ অনুশীলনের পাশাপাশি মানুষে মানুষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহমর্মিতা বজায় রেখে সমাজে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার যে অগ্রযাত্রা শুরু করেছি, তার সফল বাস্তবায়নে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
“সকল অশুভ, অন্যায় আর অন্ধকারকে পরাজিত করে শুভ চেতনার জয় হবে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথে-দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি।”

উৎসবের ৫ দিন
এবারও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপি কেন্দ্রীয়ভাবে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে। এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশনে এবারও হবে ‘কুমারী র্পূজা’সহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা।
রোববার সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটের মধ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাদেবীর ষষ্ঠ্যাদি, কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজার আয়োজন হবে। এছাড়া দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসও অনুষ্ঠিত হবে।
সোমবার সপ্তমীর সকালে হবে দুর্গাদেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ ও মহাসপ্তমীর বিহিত পূজা।
‘নবপত্রিকা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নয়টি গাছের পাতা। কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মান ও ধান এই নয়টি উদ্ভিদকে পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করা হয়।
পরে একজোড়া বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম ‘কলাবউ’।
নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে বিবেচনা করা হয়। এই নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে ‘নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমোঃ’ মন্ত্রে পূজিত হন।
নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি দর্পণ বা আয়না রেখে সেই দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন উপচারে দেবীকে স্নান করানো হয়।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হবে মহাষ্টম্যাদি কল্পরাম্ভ ও মহাষ্টমী বিহিত পূজা। দুপুর ১টা ৫০ মিনিট থেকে ২টা ৩৮ মিনেটের মধ্যে হবে সন্ধিপূজা এবং মধ্যাহ্নে মহাপ্রসাদ বিতরণ।

ঢাকায় সবচেয়ে বড় পরিসরে মহাঅষ্টমীর কুমারী পূজা হবে রামকৃষ্ণ মিশনে। এদিন ফুল, জল, বেলপাতা, ধূপ-দীপসহ ষোড়শ উপচারে কুমারীরূপে দেবী দুর্গারই আরাধনা করা হয়। রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল ১১টায় কুমারী পূজা হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার সকালে হবে ঢাকেশ্বর মন্দিরে হবে দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমী বিহিত পূজা। সন্ধ্যায় হবে আরতি প্রতিযোগিতা। এদিন সকালে তর্পণে দুর্গার মহাস্নান হবে, ষোড়শ উপচারে পূজা করা হবে। পুষ্প, অর্ঘ্য নিবেদন শেষে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন ভক্তরা। কোনো কোনো মণ্ডপে নবমীতে যজ্ঞের আয়োজন হয়। মহানবমীতে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে ভক্তদের হৃদয়।
বৃহস্পতিবার বিজয়া দশমীর দিন সকালে হবে দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা ও পূজান্তে দর্পণ বিসর্জন। দুপুর ১২টায় থাকবে স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং বিকেল ৩টায় বের হবে বিজয়া শোভাযাত্রা।
বিজয়া দশমীতে একদিকে ‘আনন্দময়ী মাকে’ বিদায় জানানোর পালা, আবার আসন্ন বছর ‘মা’ আবার আসবেন সেই অপেক্ষার শুরু। সেদিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।