Published : 10 Sep 2025, 01:22 PM
হত্যা, রায় জালিয়াতি মামলার পর এবার প্লট দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আদালত।
দুদকের আবেদনের শুনানি নিয়ে বুধবার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ইব্রাহিম মিয়া এ আদেশ দেন।
এর আগে দুদকের পক্ষ থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। আদালত তার উপস্থিতিতে শুনানির জন্য এদিন ঠিক দেয়। মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে শুনানির জন্য সকালে আদালতে তোলা হয়।
এরপর খায়রুল হকের পক্ষে তার আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন জামিন চেয়ে শুনানি করেন। দুদকের পক্ষে প্রসিকিউটর হাফিজুর রহমান জামিনের বিরোধিতা করেন।
উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজউকের ১০ কাঠার প্লট নেওয়ার মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন বিচারক।
গত ২৪ জুলাই সকালে ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ওইদিন রাতে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
এরপর ২৯ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে বেআইনি রায় দেওয়া ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৩০ জুলাই বিচারক হিসেবে দুর্নীতি ও বিদ্বেষমূলকভাবে বেআইনি রায় দেওয়াসহ জাল রায় তৈরির অভিযোগে শাহবাগ থানার মামলায় তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়, আর রিমান্ড শেষে গেল ৭ অগাস্ট খায়রুল হকবে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে ৬ অগাস্ট বিধিবহির্ভূতভাবে রাজউকের প্লট গ্রহণের অভিযোগে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক।
দুদকের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের করা মামলায় খায়রুল হকসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে মামলায়। অন্য আসামি হলেন- রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল হুদা, সাবেক সদস্য (অর্থ) ও সদস্য (এস্টেট) আ ই ম গোলাম কিবরিয়া, সাবেক সদস্য (অর্থ) মো. আবু বক্কার সিকদার, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার, সাবেক সদস্য (এস্টেট) আখতার হোসেন ভুইয়া, সাবেক যুগ্মসচিব ও সদস্য (উন্নয়ন) এম মাহবুবুল আলম এবং সদস্য (প্রশাসন ও ভূমি) নাজমুল হাই।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর নায়েম রোডে প্রায় ১৮ কাঠা জমির ওপর ছয়তলা বাড়ি থাকার পরও তিনি প্রধান বিচারপতি থাকাবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যা হলফনামা দাখিলের মাধ্যমে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্প থেকে ১০ কাঠা জমির একটি প্লট বরাদ্দ নেন।
দুদকের অভিযোগ, প্রধান বিচারপতি থাকাবস্থায় মিথ্যা তথ্য ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ‘দ্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস’, ১৯৬৯ এর বিধি ১৩ লঙ্ঘন করে প্লট বরাদ্দ পান খায়রুল হক। নিয়ম অনুযায়ী যাদের প্লট বরাদ্দ বাতিল হবে, তাদের আবেদন আর পুনর্বিবেচনা করা যাবে না। কিন্তু বরাদ্দ বাতিলের পরও তার নামে প্লট পুনর্বহাল করা হয়।
“নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিস্তি ও সুদসহ অর্থ পরিশোধ না করে, পাঁচ বছর পরে সুদমুক্তভাবে টাকা জমা দিয়ে তিনি রাজউকের বিধি লঙ্ঘন করেন। এতে সুদের ৪ লাখ ৭৪ হাজার ২৪০ টাকা সরকারের ক্ষতি হয় এবং এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।”
খায়রুল হেকের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি ও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, মূল্য এককালীন বা তিনটি কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। প্রথম কিস্তি বাবদ ৪০ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশ হারে সুদসহ দুইটি বাৎসরিক কিস্তিতে বাকি ৬০ শতাংশ পরিশোধের কথা থাকলেও খায়রুল হক অবসরের পর বিশেষ সুবিধা নিয়ে সুদমুক্তভাবে পরিশোধ করেন। অথচ বিধি অনুযায়ী, তৃতীয় কিস্তি শুধু দখল হস্তান্তরের আগেই সুদমুক্তভাবে দেওয়া যেত।
“গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের এক স্মারকে রাজউকের নিজস্ব বিধি অনুসরণে সুদ আদায়ের নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়। খায়রুল হককে অবসরের পরে এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, যা অন্য কোনো আবেদনকারী পাননি।”
দুদক বলছে, ২০০৪ সালের ২১ জানুয়ারিতে রাজউক একটি সাময়িক বরাদ্দপত্র জারি করে। সেখানে বলা হয়, প্রথম কিস্তি হিসেবে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ওই বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে, নাহলে বরাদ্দ বাতিল হবে। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করায় বরাদ্দ বাতিল হয়, কিন্তু পরবর্তীতে তা পুনরায় কার্যকর করা হয় বিধি লঙ্ঘন করে। তিনি নিজের ও অন্যদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিতে রাজউকের কর্মকর্তাদের সহায়তায় অনিয়মে যুক্ত হন। ফলে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে আইনভঙ্গের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছে দুদক। এসব অভিযোগে ৮ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৩/৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপপরিচালক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।
খায়রুল হক ২০১০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়। তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়।
খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই মেয়াদ শেষে কয়েক দফা পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৩ অগাস্ট আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন খায়রুল হক।
আরও পড়ুন
‘প্লট দুর্নীতি’: সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আরেক মামলা
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল: খায়রুল হকের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে মামলা