Published : 10 Feb 2026, 06:28 PM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ‘পরামর্শেই’ জুলাই আন্দোলন দমনে ‘কারফিউ জারি ও দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
মঙ্গলবার সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই দুই আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে।
ট্রাইব্যুনালেল অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানি শেষে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “বিগত সরকারের আমলে আসামি আনিসুল হক এবং সালমান এফ রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তারা পরস্পরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র করেছেন। বারুদাস্ত্র, হেলিকপ্টার এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহারের পরিকল্পনা তারাই করেছেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবিত করেছেন। এরই ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে পাখির মত গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে।”
কারফিউ ও গুলির নির্দেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা দেখিয়েছি যে কারফিউ জারির ব্যাপারে সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের শলাপরামর্শ ছিল। তাদের পরামর্শেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। আনিসুল হক বিশেষ করে টু স্কুল অব থটস-এর কথা বলেছিলেন, যার একটি ছিল আন্দোলনকারীদের একেবারে নির্মূল করে দেওয়া। এই দুজনের মাথা থেকেই এসব পরিকল্পনা এসেছে। তাদের গ্যাং অব ফোরের সদস্য বলা হয়।”
এই দুই আসামির বিরুদ্ধে ২৮ জন সাক্ষীর তালিকা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তাজুল বলেন, “ডিজিটাল, ডকুমেন্টারি ও লাইভ এভিডেন্সের মাধ্যমে তাদের অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হবে প্রসিকিউশন।”
প্রসিকিউশন জানায়, প্রধান কৌঁসুলির সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। প্রসিকিউশন এদিন কোনো সাক্ষী হাজির করেনি।
ট্রাইব্যুনাল আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেছে।
গত ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন আসামিরা।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়, জুলাই-অগাস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ফোনে কথা বলেন তারা। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় বহু ছাত্র-জনতার প্রাণহানি ঘটলেও নির্যাতন বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া ওই বছরের ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকাণ্ড, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০-এ মারণাস্ত্র ব্যবহার, ৪ অগাস্ট মিরপুর-১-এ ১২ জন এবং ৫ অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘিরে মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর এই দুজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। আওয়ামী লীগের এই দুই প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
‘আনিসুল ও সালমানের ভোট দেওয়ার খবর মিথ্যা’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কারাগারে থেকে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভোট দেওয়ার খবরকে ‘মিথ্যা ও গুঞ্জন’ বলে দাবি করেছেন তাদের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের মক্কেলদের নির্দেশনায় জানাচ্ছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়েছে যে তারা জেলখানা থেকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এই কথাটি আসলে মিথ্যা।
“জেলখানা থেকে ভোট দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। উনারা কোনো রেজিস্ট্রেশনই করেননি। যেহেতু রেজিস্ট্রেশন করেননি, তাই ভোট দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।”
ট্রাইব্যুনালে সালমান-আনিসুলের অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ১২ জানুয়ারি