Published : 25 Nov 2025, 02:10 AM
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে গ্রামের কৃষক—ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটেনি কে? হুড়োহুড়ির কারণে শারীরিক আঘাত পাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
বহু বছর ধরেই দেশে ভূমিকম্পের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার বিপরীতে সরকারিভাবে ‘নানা উদ্যোগের’ কথা বলা হচ্ছিল।
এর মধ্যে শুক্রবার যে ভূমিকম্প হয়েছে, তার তীব্র ঝাঁকুনিতে ভবন থেকে নামতে গিয়ে কিংবা লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ‘গুরুতর’ অবস্থায় এখনও চিকিৎসাধীন।
এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ‘না থাকার’ পাশাপাশি সামনে এসেছে প্রায় সবশ্রেণির মানুষের ‘সচেতনতার ঘাটতির’ বিষয়টি। পাশাপাশি শনিবারের তিন দফা ‘মৃদু ও হালকা’ ভূমিকম্পের উৎপস্থিল নিয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘ভুল বার্তা’র পর তাদের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় আগে থেকেই নানান সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বললেও এখন স্বীকার করছে তা ‘যথেষ্ট নয়’। আগামীর করণীয় ঠিক করতে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সোমবার সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছে।
এদিকে শনিবার তিন ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকে ‘অনিচ্ছাকৃত মানবীয় ভুল’ বলে বর্ণনা করেছে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র। তাদের ভাষ্য, এটি তাদের সক্ষমতার ‘ঘাটতি নয়’, বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ভূমিকম্পের তথ্য ‘রিভাইজ’ করার নজির রয়েছে।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে দুই যুগের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। তাতে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় ছয় শতাধিক মানুষ। ঢাকার বহু ভবনে ফাটল, কোথাও কোথাও হেলে পড়ার ঘটনা ঘটে।

রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে, কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
সেদিন ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে লাফিয়ে পড়ে এবং সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অন্তত ছয়জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ অনেকেই হাত-পা ভেঙে গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের সময় ফসলি জমি থেকে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে আসার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নরসিংদীর কাজীরচর নয়াপাড়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী নাসির উদ্দিন।
এমন অবস্থার পর দেশে কোনো পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম ‘পর্যাপ্ত না থাকার’ কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী।
তিনি বলেন, “সবারই কম বেশি নেগলেসেন্সি আছে। যে যতকিছুই বলুক, কাজের কাজ কিছুই করে নাই।”
তার মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে একটা বড় ভূমিকম্প ‘হবেই’। সেজন্য সবাইকে এখনই সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ‘মহড়ার’ কথাও বলেছেন তিনি।
কতটা সচেতন মানুষ?
দুই দিনে চার দফা ভূমিকম্পের পর দুদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে নামতে গিয়ে আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার হল ভবনের চার তলা থেকে, কেউবা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

এমন পরিস্থিতিতে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি দেখছেন খোদ শিক্ষার্থীরাই।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজিম বলেন, “ভূমিকম্প হলে কী করণীয় তা না জানার কারণে এমনটি হয়েছে। কয়েকটা প্রাইমারি বিষয়ে জানি। তবে প্র্যাক্টিক্যাল কোনো আইডিয়া নেই।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী প্রভা বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে অনেক হলের বিল্ডিংগুলো পুরনো, আবার কিছু বিল্ডিং দুর্বল।
“তো সবাই ভাবে যে, এই বিল্ডিংগুলো থেকে বের হয়ে ফাঁকা স্থানে চলে যেতে পারলেই হয়তো বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনা আছে। এই কারণে তাড়াহুড়ো করতে যেয়ে অনেকেই আহত হয়েছেন।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জেবা তাহসিন বলেন, “এই ভূমিকম্প হওয়ার আগে তেমন কিছুই জানতাম না। ভূমিকম্পের সময় করণীয় কী, তাই প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়েছিলাম।
“কিন্তু পরে কিছু বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনে বুঝতে পেরেছি, সিঁড়ি আসলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিন রহমান বলেন, “ভূমিকম্পের সময়কালীন মনের মধ্যে অতিরিক্ত ভীতির সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ নিজেদের আবাসস্থলকে ভূমিকম্পের জন্য যথেষ্ট টেকসই মনে করছে না।
“তাই ভূমিকম্পের সময় তারা তাদের আবাসস্থল দ্রুত ত্যাগ করতে চান। আর এর ফলেই ঘটে দুর্ঘটনা।”
টানা দুদিন ভূমিকম্প আতঙ্ক ও এ সময়ে বিভিন্ন হলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার রোববার থেকে ১৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেদিন বিকালে আবাসিক হল ছেড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ছুটিই সমাধান নাকি ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে––এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের গত কয়েকদিন আগে ফায়ার ড্রিল নিয়ে শিক্ষার্থীদের ট্রেইনিং দেওয়া হয়েছে, তবে ভূমিকম্প নিয়ে হয়নি।

“আমরা গত দুইদিনের সিনারিও থেকে উদ্যোগ নিয়েছি যে—ছুটি শেষ হলেই শিক্ষার্থীদের ভূমিকম্প করণীয় কী তা নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হবে।”
ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতার কথা তুলতেই ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ বললেন, “টুকটাক কিছু করণীয়র বিষয় জানা আছে। কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার পর সেসব মাথায় থাকছে না কারো। আমার মনে হয় এটাও একটা জানার ঘাটতি।”
তার ভাষ্য, “করণীয়র বিষয়েও কারও মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই। ভূমিকম্পের সময় দেখেছি, সবাই দৌড়ঝাঁপ দিয়ে বাসা থেকে নেমে যায়।
“ঢাকার মত শহরে দৌড়ে নিচে গেলেই কি সবাই নিরাপদ? তার উপর নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হচ্ছেন।”
নরসিংদীর সদর এলাকার বাসিন্দা আরাফাত শাহ বললেন, ভূমিকম্পে তার বাসার চারতলা ভবনের বিভিন্ন দেয়ালের টাইলস ভেঙে পড়েছে। বাসার সবাই সুস্থ থাকলেও আতঙ্কে রয়েছেন।
সচেতনতা বাড়াতে কী করছে সরকার
সরকারিভাবে অনেক আগে থেকেই সচেতনতা কার্যক্রম চলমান থাকার কথা বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার।
তিনি বলেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সিটি এলাকায় স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে অ্যাওয়ারনেস রেইজিং প্রোগ্রাম করেছি। এর করণীয় বিষয়গুলা এবং এর ঝুঁকি কোথায় কী আছে—এগুলো আলোচনা হয়েছে।”
তথ্যচিত্রের মত বিভিন্ন ‘অ্যাওয়ারনেস রেইজিং ম্যাটেরিয়াল’ থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ভূমিকম্প হলে পার্সোনাল লেভেলে করণীয়টা কী হবে, নাটিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আর লিফলেট আকারে কিছু মেসেজ দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের লিফলেটগুলো আমাদের ওয়েবসাইটেও আছে।”

এর বাইরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালার মত কর্মসূচি থাকলেও সেসব যে ‘পর্যাপ্ত না’ তা মানছেন এই কর্মকর্তা।
ভবিষ্যতে এ সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো হবে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি সোমবার সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা বলেন।
“সরকার বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়েছেন। ওখান থেকে পরবর্তী করণীয়টা নির্ধারণ হবে।”
ভূমিকম্পের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করণীয় ঠিক করতে সোমবার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
নিজ কার্যালয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা উপস্থিত বিশেষজ্ঞর মতামত শুনেছেন।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য এদিন তিনি বৈঠকে উপস্থিত সবার কাছে লিখিত সুপারিশ চেয়েছেন, যেটার আলোকে সপ্তাহখানেকের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি বৈঠকে বলেছেন।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওখানে ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত দিয়েছেন। সরকার শুনেছেন, এরপরে আরও সাজেশন চেয়েছেন। তারপরেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। এটি দ্রুত করার কথা বলা হয়েছে, সে অনুযায়ী সরকারকে আরও সাজেশনও দেওয়া হবে।”
বৈঠকে উপস্থিত বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, “আজ (সোমবার) অনেক কিছু আলাপ হয়েছে। ফিডব্যাকটা ওনারা নিয়ে একটা সামারি হয়ত করবেন। হয়ত কিছু কোঅর্ডিনেশন ওয়ার্কিং কমিটি করে দেবেন। সামনের দিকে কী করবে না করবে, মানুষকে সতর্কবাণী দেবে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।”

এজন্য সরকারের তরফে সবার কাছ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে লিখিত পরামর্শ চাওয়া হয়েছে, যেটি ৫-৭ দিনের মধ্যে সমন্বয় করে করণীয় ঠিক করা হবে, বলেন তিনি।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়েই আলোচনা করেছি। একটা ন্যাশনাল লেভেলের ইনস্টিটিউট অলরেডি পাইপলাইনে আছে, ওটাই ফোকাল পয়েন্ট হবে হোপফুলি, ওভাবেই আলোচনা হয়েছে। ওটা হয়তো নেক্সট এক মাসের মধ্যে অনুমোদন হয়ে যাবে।
“ওইটার আন্ডারেই হয়তো অনেকগুলা কাজ হবে, কী কী কাজ হবে আমরা একটা লিস্ট বানাচ্ছি। আমরা সবাই সেগুলো দেব, এরপর ওনারা একটা সমন্বয় করবেন।”
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে। ওই ঝুঁকি বিপদজনক মাত্রায় পৌঁছেছে জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির অভাবে।
তার ভাষ্য, ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব না, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব—যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
“সব কথার শেষ কথা যেটা হচ্ছে, আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা…।”
এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দিয়ে হুমায়ুন আখতার বলেন, “এটার জন্যে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে। ভূমিকম্পের নিয়মিত মহড়া করতে হবে।
“এখানে সবারই দায়িত্ব আছে। সাধারণ মানুষ, সরকার, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাদার—সবার আসলে এখানে দায়িত্ব রয়েছে, তাদেরকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করে জনগণকে সচেতন করে যদি আমরা করতে পারি, তাহলে একটা সেইরকম যদি ভূমিকম্প হয়, তাহলে তার মানে ক্ষয়ক্ষতি, জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে আনা সম্ভব।”
ভূমিকম্পের বিপদের মধ্যে সোশাল মিডিয়ায় অপতথ্য ও ভুল ব্যাখ্যার মহোৎসব যে আতঙ্ক আর জটিলতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে, সে কথাও বলেন হুমায়ুন আখতার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালওয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এ অধ্যাপক বলেন, “আজকাল সবাই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন। যার ফলে যেটা হচ্ছে কী, ভূমিকম্পের বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এবং সরকারের নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ যাচ্ছে। তারা কনফিউজড এবং তারা মিসগাইডেড হচ্ছেন।”
‘ভুল বার্তার’ কারণ কী
দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরদিন শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে দেশে ভূমিকম্প হয়, তার মাত্রা ছিল মৃদু, রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৩।
প্রথমে সেটির উৎপত্তিস্থল বলা হয় সাভারের বাইপাল। পরে তা নরসিংদীর পলাশ বলে জানায় ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র।
শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঢাকার বাড্ডায় দুটি ভূমিকম্পের কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। কিছুক্ষণ পর বিষয়টি ‘সংশোধন’ করে বলা হয়, একটির উৎপত্তিস্থল বাড্ডা, আরেকটির নরসিংদীতে।
দুর্যোগ নিয়ে এমন ভুল বার্তা মানুষকে ‘আতঙ্কিত’ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একইসঙ্গে এটিকে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ‘সক্ষমতার ঘাটতি’ হিসেবে দেখছেন বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী।
তিনি বলেন, “তাদের ইক্যুইপমেন্ট নাই। যেগুলো আছে তার কয়েকটি নষ্ট, দুইটা ঠিক আছে। এজন্য তারা সিচ্যুয়েশন বলতে পারে; কিন্তু কোথায় বলতে পারে না।
“এটা তাদের স্বীকার করে ফেলা উচিত ছিল। একবার বাইপাইল-একবার নরসিংদী বলছে, এখন পর্যন্ত স্বীকার করে নাই। ওটা স্বীকার করে নিক যে, ইক্যুইপমেন্ট নষ্ট, কাজ করতেছে না। ভুল তথ্য কেন দেবে?”
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রুবাঈয়্যাৎ কবীর শনিবার সকাল ও সন্ধ্যার তিন ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভ্রান্তির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের অটো সিস্টেম আছে। আমাদের অটো সিস্টেমে যেটা প্রথম আসে, রিলিজ করে দিই; যার কারণে পরবর্তীতে আমরা এটাকে রিভাইজ করি।”

আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা ও ভূমিকম্পের বার্তায় স্থান ও মাত্রা ‘রিভাইজ করা হয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আগে আমরা সময় নিতাম, অপেক্ষা করতাম; তারপরে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করতাম। এখন আমরা যেটা চালু করেছি, একটা ভূমিকম্প হলে একটা অটো সিস্টেমে পাই এবং সেটা দ্রুত দিয়ে দিই।
“সকালে এই কারণে প্রথম যেটা হয়েছিল, প্রথম যেটা পেয়েছি— সেটা দিয়েছি। পরে এটাকে রিভাইজ করে লোকেশনটা ঠিক করে দিয়েছি।”
একই সময়ে দুটি স্থানে ভূমিকম্প হওয়ায় ঘোষণায় উৎপত্তিস্থল ভুল করাকে ‘টাইপিং মিসটেক’ আখ্যা দিয়ে আবহাওয়াবিদ রুবাঈয়্যাৎ কবীর বলেন, “আমাদের তো মেসেজটা টাইপ করতে হয়। যে টাইপ করছিল, দুইটা মেসেজকে গুলায়ে ফেলছে। লোকেশনের জায়গায় বাড্ডা লিখে রেখেছে।
“যেহেতু এটা পাস হয়ে গেছে ওয়েবসাইটে। ১০ মিনিটের মধ্যে কিন্তু আমি রিভাইজ করে দিয়েছি। বিষয়টা হিউম্যান মিসটেক।”
বিষয়টি যদি তার প্রতিষ্ঠান বুঝতে না পারত, তাহলে ‘প্রশ্ন তোলার’ জায়গা থাকত বলে মনে করেন তিনি।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সক্ষমতার প্রশ্নে রুবাঈয়্যাৎ কবীর বলেন, “আমাদের যে অ্যানালাইসিস সিস্টেমটা, সেটা সেমি অটোমেটিক। আমাদের এখন পর্যন্ত একটা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করতে হয়।
“আমরা রিসেন্টলি একটা অটো সিস্টেম চালু করেছি, এক্সপেরিমেন্টালভাবে চলতেছে। আশা করি, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এটা ফুলফিল হয়ে গেলে কনফিউশনটা আরও কমে আসবে।”
আলোচনা ভূমিকম্পের অগ্রিম সতর্কবার্তা নিয়ে
২০২২ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ভূমিকম্পের আগে সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
কেউ কেউ অন্তত ৩০ সেকেন্ড আগে এ সতর্কবার্তা পাওয়ার পর আলোচনায় এসেছে ভূমিকম্পের অগ্রিম বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে।
টেক জায়ান্ট গুগল যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এ প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
বলা হচ্ছে, এটি ভূমিকম্প হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম হবে। আর সেটুকু সময়ে অন্তত মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে সহায়তা করতে পারে।
গুগলের আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমের বাইরে বিশ্বজুড়ে অনেককে ভূমিকম্পের অগ্রিম বার্তা পেতে ‘মাই আর্থকোয়েক’, ‘মাইশেক’সহ নানা অ্যাপ ব্যবহার করতে শোনা যায়।

ভূমিকম্পের আগাম বার্তা পেতে দেশে দেশে ব্যবহৃত নানা অ্যাপের বিষয়ে রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক কোর কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “ভূমিকম্পের আগে আমাদের দেশে আগাম বার্তা দেওয়ার কোনো অ্যাপ নেই, তবে জেনেছি অন্য দেশে আছে। আমরা এই অ্যাপ ব্যবহার করতে পারি কি না, চেষ্টা করব। এ ব্যাপারে আবহাওয়া অফিসে যারা অভিজ্ঞ আছেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করা হবে।”
তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর ভাষ্য, পৃথিবীর কোথাও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না।
তিনি বলেন, “কোথাও প্রেডিকশন সম্ভব না, এটা হয়তো হতে পারে বা হবে না—এমন কোনো সম্ভাবনার কথা কখনো বলতে পারে।”
যে সতর্কবার্তা দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস
টানা দুইদিন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পরদিন রোববার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তরফে ‘ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয়’ বিষয়ে একগুচ্ছ নির্দেশনা প্রচার করা হয়েছে।

আটদফা নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো ওই বার্তায় আতঙ্কিত না হয়ে ভূমিকম্প চলাকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ভূমিকম্পে করণীয়র বিষয়ে সংস্থাটির নির্দেশনা হচ্ছে—
• ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত ও স্থির থাকুন। ভবনের নিচ তলায় থাকলে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিন।
• বহুতল ভবনে থাকলে ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড’ পদ্ধতি অনুসরণ করুন: নিচু হোন, শক্ত টেবিল/ডেস্কের নিচে ঢুকে খুঁটি শক্ত করে ধরুন। অথবা কলামের পাশে, বিমের নিচে আশ্রয় নিন। সম্ভব হলে বালিশ, কুশন বা এ জাতীয় বস্তু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন।
• ভূমিকম্প চলাকালীন লিফট ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। ভূমিকম্প থামার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দ্রুত বন্ধ করুন।
• বারান্দা, ব্যালকনি, জানালা, বুক শেলফ, আলমিরা, কাঠের আসবাবপত্র বা ঝুলন্ত ভারী বস্তু থেকে দূরে থাকুন। হাতের কাছে টর্চ, হেলমেট, জরুরি ওষুধ এবং বাঁশি সংরক্ষণ করুন, যাতে প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়।
• ঘরের বাইরে থাকলে গাছ, উঁচু ভবন, বিদ্যুতের খুঁটি ইত্যাদি থেকে দূরে খোলা স্থানে আশ্রয় নিন।
• গাড়িতে থাকলে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামান। ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকুন।
• একটি ভূমিকম্পের পর আবারও ভূকম্পন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ব্রিজ ও বিভিন্ন অবকাঠামো থেকে দূরে থাকুন। কারণ পরবর্তী ভূমিকম্পে সেগুলো পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রাণহানি ঘটাতে পারে।
• জরুরি সেবার প্রয়োজনে যোগাযোগ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তাদের হটলাইনে (১০২) যোগাযোগ করতে বলেছে।