Published : 03 Aug 2025, 11:22 AM
জুলাই অভ্যুত্থানের দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
রোববার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এদিন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ রাষ্ট্রপক্ষের তরফে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। এ বিচারকাজ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
এ মামলায় গত ১০ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচ অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আসামিদের মধ্যে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছেন। তিন আসামির মধ্যে একমাত্র তিনিই কারাগারে আটক আছেন, বাকি দুজনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার কার্যক্রম চলছে। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর মামুনের পক্ষে লড়বেন আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ।
গত ১০ জুলাইয়ের আদেশে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের প্রারম্ভিক বিবৃতির (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) জন্য ৩ অগাস্ট এবং মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর জন্য ৪ অগাস্ট দিন রাখে। মামলায় সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিকের এক সম্পাদকসহ ৮১ জন।
যেভাবে রাজসাক্ষী মামুন
অভিযোগ গঠনের দিন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক আইজিপির রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন।
অপর দিকে ‘পলাতক’ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের অব্যাহতির আবেদন করেছিলেন তাদের পক্ষে অভিযোগ গঠনের শুনানি করা রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
তবে সাবেক মামুন মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে কোনো আবেদন করেননি। তার বদলে তিনি দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন।
অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় হাজির করে মামুনকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনায় ট্রাইব্যুনাল।
এ সময় তার কাছে বিচারক জানতে চান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দায় তিনি স্বীকার করেন কি না?
জবাবে মামুন বলেন, তিনি দোষ স্বীকার করছেন। আর অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে তথ্য দিয়ে তিনি ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করবেন।
মামুন যেহেতু দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন, সেজন্য নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে আলাদা রাখার আবেদন করেন তার আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ। আদালত সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক আছেন। তৃতীয় আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সাহেব আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় অভিযোগ বিষয়ে তার বক্তব্য কী। তিনি তার দোষ স্বীকার করেছেন।
“তিনি বলেছেন, তিনি একজন সাক্ষী হিসেবে এই যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে হয়ে ছিল সেই অপরাধের সবকিছু যেহেতু তার জানবার কথা সেইহেতু সমস্ত তথ্য তিনি আদালতকে উদঘাটনের ব্যাপারে সহ্যায়তার মাধ্যমে তিনি অ্যাপ্রুভার হতে চেয়েছেন। তার প্রার্থনা আদালত মঞ্জুর করেছেন।
“তিনি সাক্ষী হিসেব গণ্য হবেন। বাংলায় এটাকে বললে রাজসাক্ষী। কিন্তু আইনে যেটাকে বলা হয়েছে–অ্যাপ্রুভার।”
রাজসাক্ষী হলে মামুনকে ক্ষমা করা হবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান কৌঁসুলি বলেছিলেন, “তার বক্তব্যের মাধ্যমে পুরোপুরি সত্য প্রকাশিত হলে আদালত তাকে ক্ষমা করতে পারেন অথবা অন্য কোনো আদেশও দিতে পারেন।”
একটি অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বা সে সম্পর্কে গোপন তথ্য জানা কোনো ব্যক্তি ক্ষমা পাওয়ার শর্তে অপরাধের পুরো ঘটনা, মূল অপরাধী ও সহায়তাকারী হিসেবে জড়িত সকল অপরাধী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য প্রকাশ করে আদালতে যিনি সাক্ষ্য দেন তিনিই রাজসাক্ষী, এখন যাকে রাষ্ট্রের সাক্ষীও বলা হয়।
কোনো মহানগর হাকিম বা কোনো প্রথম শ্রেণির হাকিম অপরাধটির তদন্ত, অনুসন্ধান বা বিচারের কোনো পর্যায়ে অপরাধটির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বা সে সম্পর্কে গোপন তথ্যের জানেন বলে অনুমিত কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাকে এই শর্তে ক্ষমা করার প্রস্তাব দিতে পারেন। সে শর্ত হল-তার জানা মতে অপরাধ সম্পর্কিত সামগ্রিক অবস্থা এবং তা সংঘটনের ব্যাপারে মূল অপরাধী বা সহায়তাকারী হিসেবে জড়িত প্রত্যেকটি লোক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বা সত্য ঘটনা প্রকাশ করবে।
আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছে তিন আসামির বিরুদ্ধে। এর পক্ষে আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া সংক্রান্ত শেখ হাসিনার অডিও টেপ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার বিচার শুরু হয়। আর তা শুরু হয় সেই আদালতে, যে আদালত তার সরকার গঠন করেছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য।
আরও পড়ুন:
যেভাবে রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুন, তার সাক্ষ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ হাসিনার বিচার শুরু, রাজসাক্ষী হচ্ছেন সাবেক আইজিপি মামুন