Published : 08 Sep 2025, 11:58 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় আদেশ দেওয়ার পরও গুলি না চালানোয় পুলিশের এক উপকমিশনার অধীনস্তদের গালি দেওয়ার পাশাপাশি চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিলেন বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি এম মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর এক সদস্যের বেঞ্চে সাক্ষ্য দেন আন্দোলনের সময় মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের এসআই মো. আশরাফুল ইসলাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে আশরাফুল ইসলাম ছিলেন ৩৯ নম্বর সাক্ষী।
আশরাফুল ইসলাম সাক্ষ্যে বলেন, গত বছরের ৫ অগাস্ট ভোর ৪টায় এএসআই মুরাদ, নায়েক জসিম, কনস্টেবল মাহমুদুল, কনস্টেবল মেহেদী, কনস্টেবল নাসিরুল, কনস্টেবল মাহবুবসহ এক প্লাটুন (২০ জন) এবং এসআই হেলাল এক প্লাটুন ফোর্স নিয়ে মিরপুর পুলিশ লাইনস থেকে রওনা হন। তারা সকাল ৬টার পর শাহবাগ থানায় পৌঁছান।
তিনি বলেন, শাহবাগ থানায় গিয়ে জানতে পারেন, ভোর ৫টার দিকে তৎকালীন ডিএমপির কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং ৬টার দিকে যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী শাহবাগ থানায় গিয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আন্দোলন দমাতে গুলি করাসহ অন্যান্য নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
ওইদিন আন্দোলনকারীদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি থাকার কথা তুলে ধরে আশরাফুল বলেন, সকাল ৯টার দিকে ওই দুই প্লাটুনসহ ডিএমপি থেকে আসা এক প্লাটুন পুলিশ, ১৩-এপিবিএন থেকে আসা এক প্লাটুন পুলিশ এবং রাজারবাগ থেকে আসা এক প্লাটুন নারী পুলিশসহ পাঁচ প্লাটুন (১০০ জন) পুলিশকে তৎকালীন এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আক্তারুল ইসলাম ব্রিফ করেন।
ব্রিফিং শেষে নারী পুলিশ ও ডিএমপি পুলিশের দুই প্লাটুন ছাড়া ৬০ থেকে ৬৫ জন পুলিশ এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আক্তারুল ইসলাম, এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর মো. আরশাদ হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছান বলে আশরাফুল জানান।
তিনি বলেন, সেখানে এসি ইমরুলসহ কয়েকজন সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন এবং আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ওই সময় এডিসি আক্তারুল ইসলামের নির্দেশে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করে প্রিজন ভ্যানে শাহবাগ থানায় পাঠানো হয়। এডিসি আক্তারুলের নির্দেশে এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদ, আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন এপিবিএন সদস্য, ডিএমপির ১০ থেকে ১৫ জন সদস্যের সঙ্গে তিনি (আশরাফুল) এবং কনস্টেবল পিয়াস, আসিফ, আকাশ, নাসিরুল হেঁটে সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে চানখাঁরপুলে পৌঁছান।
“চানখারপুল সংলগ্ন বংশাল ও চকবাজার এলাকা থেকে আসা ছাত্র-জনতাকে কোনো প্রয়োজন ছাড়া সাউন্ড গ্রেনেডের পাশাপাশি গ্যাস গান ও শটগান দিয়ে গুলি করা হয়। এপিবিএন পুলিশকে দিয়ে শটগান ফায়ার করে ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়।”
তিনি বলেন, “ওই সময় এডিসি আক্তারুল স্যার বলেন, তোমাদের যাদের কাছে পিস্তল ও চায়না রাইফেল আছে, তারা আন্দোলনকারীদের গুলি করে মেরে ফেল। তখন আমিসহ আরও কয়েকজন এই অবৈধ আদেশ পালন না করলে স্যার আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। তিনি আমাদেরকে বলেন – তোরা সরকারের বেতন-রেশন খাস না? গুলি করবি না কেন? তোদের চাকরি খেয়ে নেব।”
এরপরও আশরাফুল ইসলাম পিস্তল থেকে গুলি চালাননি বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, কনস্টেবল মো. নাসিরুল ইসলাম এডিসি আক্তারুল ইসলামের সরবরাহ করা অতিরিক্ত গুলি ব্যবহার করেন এবং তার (আক্তারুল) নির্দেশে ও দেখানো মতে রাস্তায় বসে চায়না রাইফেলে গুলি লোড করেন এবং আন্দোলনকারীদের টার্গেট করে বার বার ফায়ার করতে থাকেন।
“এ সময় এডিসি আক্তারুল ইসলাম স্যার এপিবিএন পুলিশের একজন কনস্টেবলের হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল সুজন হোসেনের হাতে দেন। যার হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নেওয়া হয়, তিনি গুলি করা থেকে বিরত ছিলেন। পরে জেনেছি তার নাম অজয়। এরপর কনস্টেবল সুজন হোসেন চানখাঁরপুল মোড়ে কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও শুয়ে, কখনও হাঁটু গেড়ে বসে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করতে থাকে।”
আশরাফুল আরও বলেন, এপিবিএনের কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন তার নামে ইস্যুকৃত চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করে।
“আমি দেখতে পাই, কয়েকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে অন্য আন্দোলনকারীরা তাদের ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর এসি ইমরুল স্যার, ইন্সপেক্টর আরশাদ স্যার এপিবিএনের ৫ থেকে ৭ জন সদস্য নিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন গলিতে গুলি করতে করতে প্রবেশ করেন।”
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন শুনতে পেয়ে দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে চানখাঁরপুল এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে উল্লেখ করেন আশরাফুল ইসলাম।
“তখন এডিসি আক্তারুল স্যারের নির্দেশে টিএসটি মোড় হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে পিছন দিক দিয়ে শাহবাগ থানায় প্রবেশ করি। এডিসি আক্তারুল স্যারের নির্দেশে নিজ নিজ নামে ইস্যুকৃত অস্ত্রগুলো শাহবাগ থানার অস্ত্রাগারে জমা দেই। এ সময় আমার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম তার নামে ইস্যুকৃত চায়না রাইফেলের ৪০ রাউন্ড গুলি জমা করলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি – তুমি চানখাঁরপুলে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করার পরেও ৪০ রাউন্ড গুলি কীভাবে জমা করলে? উত্তরে সে বলে, ‘এডিসি আক্তারুল স্যার আমাকে অতিরিক্ত গুলি সরবরাহ করেছে’।”
আশরাফুল ইসলাম বলেন, এরপর সাদা পোশাকে তিনি এশার নামাজের পর শাহবাগ থানার পেছন দিয়ে বের হয়ে হেঁটে ছাত্র-জনতার সঙ্গে মিশে মিরপুর পুলিশ লাইনসে পৌঁছান।