Published : 23 Jun 2026, 03:45 PM
দেশের সরকার পরিবর্তন হলেও বাজেট প্রণয়নের নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক দর্শন ‘পরিবর্তন হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি এখনো আমলা, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো বিদেশি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই।”
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেন, “সরকার বদলালেও নীতিনির্ধারক পরিবর্তন হয় না। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, নারী, শিক্ষার্থী বা শিক্ষক—কারো কোনো অংশগ্রহণ নেই। তাহলে এই বাজেট কীভাবে গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়?”
উন্নয়ন দর্শনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিগত শেখ হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকারের দর্শনের কোনো তফাত নেই। প্রকৃত উন্নয়ন দর্শনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রেণিগত, লৈঙ্গিক, জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্য কমানো এবং এর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জনগণ।

নয়াউদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন দর্শনে মানুষের শিক্ষা-চিকাৎসার সুযোগ নেই, জাতীয় সক্ষমতা ও নিরাপত্তা অবহেলিত হয়। জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো পদক্ষেপ নাই, স্কুলগুলোতে ক্লাসরুম নাই, শিক্ষক নাই। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার নাই, চিকিৎসা সামগ্রী নাই। এই সংকটগুলো সমাধানে কোনো আগ্রহ নাই, অথচ সরকার কেনাকাটা আর প্রকল্পের নামে লুটপাটে খুব আগ্রহী।"
সভায় অন্য বক্তারাও প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যার সমালোচনা করেন।
মোশাহিদা সুলতানা বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে বলেন, "বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রয়োজনের থেকে ৬৭০০ মেগাওয়াট বাড়তি ক্যাপাসিটি রয়েছে। এই অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। গতবছর ৪২ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবলে সরকার নিশ্চয়ই ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার করে বিদ্যুতের দাম কমাতে পারত।
“তা না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত বোঝা বহন করেও মানুষকে সারাদেশে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এরমধ্যে ৮৪ শতাংশ লোডশেডিংই হয় গ্রামাঞ্চলে। অথচ সরকার বলছে এই বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক।"
অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, “সরকার এই বাজেটকে 'গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে যাত্রা' বলছে। অথচ আমরা দেখেছি এ বাজেট পুরোপুরি আমলানির্ভর। বাজেটে বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ জনগণের প্রায় অংশগ্রহণ নাই বললেই চলে। এছাড়া বাজেটকে গণতান্ত্রিক করতে হলে বাজেটকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। অথচ আমাদের বাজেটের ৯৩ ভাগই খরচ হয় সচিবালয় থেকে। স্থানীয় সরকার পায় মাত্র ৭ ভাগ। আয় করের তুলনায় পরোক্ষ কর বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এটা মূল্যস্ফীতি ঘটাবে, যা মধ্যবিত্ত মানুষের উপর চাপ তৈরি করবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিসহ জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বরাবরের মতোই অবহেলিত হয়েছে। এই পরিষেবা খরচও মধ্যবিত্ত-নিন্মবিত্ত মানুষকে বহন করতে হবে। একে 'গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট' বলার সুযোগ কোথায়?"
হারুন অর রশিদ বলেন করেন, ‘এ বছর হামে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সাতশত! অন্তবর্তীকালীন সরকারের টিকা কেনায় অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের চিকিৎসায় অবহেলারই পরিণাম এটা। এছাড়া সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বেহাল দশার কথা কারোরই অজানা নয়। শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল দেশেই চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাংলাদেশের থেকে বেশি। অথচ আমাদের সরকার চিকিৎসার দায়কে ধীরে ধীরে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে।'
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ সরকারি ওয়েবসাইটে বাজেট সংক্রান্ত তথ্যের অপ্রতুলতা এবং এর রাজনৈতিক ব্যবহারের সমালোচনা করেন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান সাংস্কৃতিক বাজেটে আমলাতান্ত্রিকতার আধিক্য এবং জেলা-উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমির অবহেলার চিত্র তুলে ধরে সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের দাবি তুলেছেন।
এছাড়া, সুরাইয়া ইয়াসমিন কলি জেন্ডার বাজেটের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রসবকালীন চিকিৎসা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।