Published : 14 Dec 2025, 01:15 AM
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাম-পরিচয়সহ এক সন্দেহভাজনের ছবি ঘুরছিল।
শুক্রবার আনুষ্ঠানিক কিছু না জানালেও শনিবার ওই ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে তার তথ্য চেয়ে ‘হন্যে হয়ে খোঁজার’ কথা বলেছে পুলিশ।
দিন পেরিয়ে রাত গিয়ে পুলিশের ভাষ্য, তার খোঁজে ‘সম্ভাব্য সব জায়গায়’ অভিযান চলছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন শিকদার বলেন, “আমাদের টিমগুলো কাজ করছে।”
শুক্রবার দুপুরে ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়।
চলন্ত অটোরিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলিটি লাগে তার মাথায়।
হাদিকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে এক দফা অস্ত্রোপচারের পর তাকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, হাদির অবস্থা এখনো ‘আশঙ্কাজনক’।
শনিবার পুলিশের তরফে আনুষ্ঠানিক ছবি প্রকাশের ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই প্রধান সন্দেহভাজনকে ‘শিগগিরই’ আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
তিনি বলেন, “আমরা খুঁজতেছি, মূল সন্দেহভাজনকে খুঁজতেছি। এখনো ২৪ ঘণ্টা পার হয়নি। হোপফুলি আমরা হিট করতে পারব। আমরা জনগণের সহযোগিতা চাইছি।”
তার এমন বক্তব্যের পরপরই হাদির আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
রাতে ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, এখন পর্যন্ত প্রধান ওই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে অগ্রগতি বলতে তাদের তরফে পাঁচটির বেশি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।
“ওই ব্যক্তির এখনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, “নাম-পরিচয় পাওয়া গেলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাওয়া যাবে, এমন নয়। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
সন্দেহভাজন আততায়ীসহ জড়িতদের ধরতে র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘সমন্বয় করে’ অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

ছবি প্রকাশ, পরে পুরস্কার ঘোষণা
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় থাকা হামলাকারী ভোটের প্রচারে হাদির সঙ্গে ছিলেন বলে সতীর্থরা মনে করছেন। তাদের তোলা প্রচারের কিছু ছবিতে থাকা দুজনকে তারা ‘আততায়ী’ হিসেবে সন্দেহ করছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেইবুক পোস্টে লেখেন, সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তিকে কয়েক দিন আগে ইনকিলাব সেন্টারেও দেখা যায়।
“সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ইনকিলাব সেন্টারে হাদির পাশে বসে আলোচনায় অংশ নেন। সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান।”
শনিবার সন্দেহভাজন ওই হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করে তার বিষয়ে তথ্য চায় পুলিশ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপি বলেছে, পুলিশ তাকে ‘হন্যে হয়ে’ খুঁজছে। ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে।
ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে বা তার সন্ধান পেলে দ্রুত পুলিশকে অবহিত করতে বলা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসে হাদির আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি বলেন, “আশা করছি, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। এই হামলায় জড়িত কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে আমরা জনগণের সার্বিক সহযোগিতা পাব বলে দৃঢ় বিশ্বাস করি।”
কে এই ফয়সাল
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, দাউদ খান ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। গত বছর একটি স্কুলে চাঁদাবাজির মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
হাদিকে গুলির ঘটনায় নাম আসার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতার সঙ্গে ফয়সাল করিমের ছবি ফেইসবুকে ছড়িয়েছে।
হাদির সঙ্গে নির্বাচনি প্রচার এবং বাংলামোটরে হাদির ইনকিলাব সেন্টারে তোলা ফয়সালের কিছু ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করছেন, হাদিকে কিছুদিন ধরেই অনুসরণ করছিলেন ফয়সাল।
সন্দেহভাজন ফয়সালের বিষয়ে মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, গেল বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকার আদাবরের একটি স্কুলে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের মামলার আসামি ছিলেন ফয়সাল।
৭ নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, তখন তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মুঠোফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধারের তথ্য দিয়েছিল র্যাব।
ওই মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাই কোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সাল, এর মধ্যে হাদিকে গুলি করা প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে তার নাম এল।
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, “যে ছেলেটা গুলি করেছে, শুনতে পাচ্ছি সে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল, কোন প্রক্রিয়ায় সে জামিন পেয়েছে, সেটা তদন্ত করুন।“

মামলা হয়নি এখনো
হাদিকে গুলির ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান।
তিনি বলেন, “আমরা পরিবারের কাউকে আসার জন্য বলেছি, তারা এখনো আসেননি। সবকিছু প্রস্তুত, পরিবারের কেউ এলেই মামলা হবে।”
মামলা না হলেও এ বিষয়ে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দিয়ে পুলিশ কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
সীমান্তে নজরদারী
হাদিকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত ব্যক্তিরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও তল্লাশি ‘জোরদার’ করার কথা বলেছে বিজিবি।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানিয়েছে, সীমান্তজুড়ে ‘কড়া তল্লাশি’ চলমান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি ‘বাড়ানো হয়েছে’, রয়েছে অতিরিক্ত বিজিবি। সীমান্তের যে স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সে স্থান সিলগালা করা হয়েছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, “ওসমান হাদির উপর হামলার ঘটনায় জড়িত আসামিরা যেন কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালাতে না পারে, সেজন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।”
হাদি এখনো ‘আশঙ্কাজনক’
হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন থাকা হাদির অবস্থা এখনো ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড।
শনিবার বিকালে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ অ্যান্ড এইচডিইউর সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. জাফর ইকবালের পাঠানো বার্তায় বলা হয়, হাদির চিকিৎসায় বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
হাদির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে মেডিকেল বোর্ডের ভাষ্য, তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“যেহেতু অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেহেতু এখন কনজারভেটিভভাবে ম্যানেজ করতে হবে। ব্রেইন প্রটেকশন প্রটোকল অনুসরণ করে অন্যান্য সব সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে। যদি অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়, তাহলে মস্তিষ্কে আবার সিটি স্ক্যান করানো যেতে পারে।”
‘ব্রেইন স্টেমে’ আঘাতের কারণে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন ওঠানামা করছে জানিয়ে বার্তায় বলা হয়, “রক্তচাপের জন্য সাপোর্ট যেভাবে দেওয়া আছে, সেটা সেভাবেই চলবে। যদি হৃদস্পন্দন কমে যায়, তাহলে সাময়িকভাবে পেস মেকার লাগানোর একটি দল প্রস্তুত আছে, সেটা লাগানো হবে।”
হাদির ফুসফুসে আঘাত আছে ও ‘চেস্ট ড্রেইন টিউবে’ অল্প রক্ত আসছে বলেও মেডিকেল বোর্ডর বার্তায় বলা হয়।
‘ফুসফুসে সংক্রমণ’ ও ‘এআরডিএস’ যেন ডেভলপ না করে, সেদিকে খেয়াল রেখে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বার্তায় বলা হয়, “তার কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে, সেটাকে ধরে রাখার জন্য ‘ফ্লুইড ব্যালেন্স’ যেভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে, সেভাবেই চালিয়ে যেতে হবে।”
হাদির শরীরে রক্ত জমাট বাধা ও রক্তক্ষরণ হওয়ার মধ্যে যে ‘অসামঞ্জস্যতা’ দেখা দিয়েছিল, সেটা অনেকটাই ঠিক হয়ে আসছে জানিয়ে বোর্ড বলছে, “এটাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান ট্রানফিউস করতে হবে।”
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে হাদির পরিবারের সাক্ষাৎ
হাদির পরিবারের সদস্য ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা শনিবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।
হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দীক ও বোন মাসুমা বেগম, ইনকিলাব মঞ্চের তিন নেতা আব্দুল্লাহ আল জাবের, ফাতিমা তাসনিম জুমা ও মো. বোরহান উদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে তার দপ্তর জানিয়েছে।
হাদির ‘সর্বোত্তম চিকিৎসা’ নিশ্চিতে সরকারের তরফে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তুলে ধরে এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সারাদেশ তার জন্য দোয়া করছে। তার সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতে সবাই চেষ্টা করছে। তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় যদি দেশের বাইরে পাঠাতে হয়, যেখানে পাঠানোর প্রয়োজন হবে সরকার সেখানেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।”
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ওসমান হাদির বোন বলেন, “সে ছোটবেলা থেকেই দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। ছোটবেলা থেকেই সে বিপ্লবী। বিদ্রোহী কবিতা তার প্রিয়, সে বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করতে ভালোবাসত। তার একটি ১০ মাসের সন্তান আছে। হাদি আমাদের মেরুদণ্ড।
“ওর অনেক কাজ, ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনারা বিপ্লবী সরকার, যে করেই হোক জুলাই বিপ্লবীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে।”
হামলার ঘটনাটিকে নৃশংস বলে বর্ণনা করে প্রধান উপদেষ্টা জড়িত পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এ ঘটনার আদ্যপান্ত বিশ্লেষণ করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য ইতোমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত’ করতে হামলা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন সাম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর হামলার পেছনে সরকার সংশ্লিষ্টসহ অনেকে নির্বাচন ‘বাধাগ্রস্ত’ করার প্রয়াশ দেখছেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী শনিবার বলেন, “ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের ঘটনা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস বলে আমরা মনে করি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত বা বানচাল করার যেকোনো ধরনের অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হস্তে দমন করবে।”
হাদির ওপরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
শনিবার এক বিবৃতিতে এই ক্ষোভের কথা জানিয়ে সুজনের চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা মনে করি, এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বিপজ্জনক।
হাদির ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে 'যথাযথ শাস্তি' নিশ্চিত করা এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সব প্রার্থী, দলীয় কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সুজন।
জেলায় জেলায় বিএনপির বিক্ষোভ
হাদিকে গুলির প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি।
এসব সমাবেশে নেতারা বলেন, হাদির উপর হামলা পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছে। এটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘গভীর ষড়যন্ত্রের’ অংশ।
শনিবার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, “এ আঘাত গণতন্ত্রের উপর আঘাত। যারা এই আঘাত করেছে, তাদের কালো হাত ভেঙে দিতে হবে; ওরা অপশক্তি।
“এই আঘাত হাদির উপরে নয়, এই আঘাত বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপরে, এই আঘাত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপরে, এই আঘাত বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপরে। এটাকে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। এই অপশক্তির কালো হাত ভেঙে দিতে হবে; এদেরকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে হবে।”
একই অনুষ্ঠানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে দায় চাপানোর একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ষড়যন্ত্র ‘থেমে নেই’, নির্বাচন ‘অতো সহজ হবে না’।
তিনি বলেন, “গত কয়েক দিনের ঘটনা, গতকালকের ঘটনা, চট্টগ্রামে আমাদের প্রার্থীর উপরে গুলিবর্ষণের ঘটনা, সবকিছু নিয়েই কিন্তু প্রমাণিত হচ্ছে যে, যা আমি বলছিলাম, তা কিন্তু সত্য হচ্ছে আস্তে আস্তে।
“কাজেই আমরা যদি নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে না আনি, আমরা যদি নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না হই, এই দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।”
হাদিকে গুলি করার ঘটনার পরপরই আলোচনায় এসেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর বলেন, “হাতিয়ার (অস্ত্র) ইস্যুর ক্ষেত্রে এতদিন শুধু সরকারি কর্মচারীদেরই হাতিয়ার দেওয়া হতো। এখন যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন, তারাও যদি হাতিয়ার চায়, তাদেরও লাইসেন্স আমরা দেব।
“এবং যারা নির্বাচন করবেন, তাদের যদি হাতিয়ার আমাদের কাছে জমা থাকে, সেগুলো আমরা তাদের ফেরত দেব।”

তিন দলের সঙ্গে ইউনূসের বৈঠক
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শনিবার তিন রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বৈঠকে বসেন মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈঠকে তিনি বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলা ‘পূর্ব-পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের’ অংশ; এর পেছনে ‘বিরাট শক্তি’ কাজ করছে।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচন হতে না দেওয়া। এ আক্রমণ খুবই ‘সিম্বলিক’। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, নির্বাচনের সব আয়োজন ভেস্তে দিতে চায়। এগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরস্পরের দোষারোপ থেকে বিরত থাকতে হবে।”
জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের নানা বক্তব্য একে অন্যকে দোষারোপ করার প্রবণতা বাড়িয়েছে, যার ফলে আমাদের বিরোধীরা সুযোগ পেয়েছে। আমাদের আগের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই কিছু লোক এই অভ্যুত্থানকে ‘খাটো’ করার জন্য নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, “সুসংগঠিতভাবে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চলছে। মিডিয়া ও প্রশাসনের নানা স্তরে এই কাজ হচ্ছে। নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় আসবে, তারাও এর ভুক্তভোগী হবে। কেউই একা সরকার চালাতে পারবে না।”
সরকারের ‘ব্যর্থতা’ বনাম উদ্যোগ
জুলাই অভ্যত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদিকে নিরাপত্তা দিতে না পারাকে ‘সরকারের ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছে বিভিন্ন সংগঠন।
শনিবার বিকালে ঢাকায় মিছিল শেষে জুলাই ঐক্যের সংগঠক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, “ওসমান হাদি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, তাকে ভারতপন্থিরা হত্যা করতে চায়। ইন্টারিম সরকারকে অনেকবার সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু এই সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
তার অভিযোগ, এবি জুবায়ের, সাদিক কায়েম, হাসনাত আব্দুল্লাহসহ জুলাইয়ের সম্মুখ সারির নেতাদের ‘হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে’, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ‘ব্যবস্থা নিচ্ছে না’।
ডাকসু নেত্রী ও জুলাই আন্দোলনে হাদির সহযোগী ফাতিমা তাসনিম জুমা করেছেন, জুলাই যোদ্ধাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শনিবার বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমার একটা ছোট্ট একটা কমিটি করে দিয়েছি। ওই কমিটি অ্যাসেস করে তারা ব্যবস্থা নেবে।”
তার ভাষ্য, “বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারি যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
আরও পড়ুন
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক, অভ্যুত্থান ‘নস্যাৎচেষ্টার’ বিরুদ্ধে ঐক্যের বার্তা ৩ দলের
হাদিকে গুলি করা সন্দেহভাজনের ছবি দিয়ে তথ্য চাইল পুলিশ
আততায়ী 'পেশাদার শ্যুটার', হাদির সঙ্গেই ছিলেন?
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ রোকেয়া পদকজয়ীদের
হাদিকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের সমাবেশ