Published : 27 Feb 2026, 12:28 AM
কয়েক দফা তারিখ পরবর্তন আর প্রকাশকদের বিভক্তি মিটিয়ে অমর একুশে বইমেলার দুয়ার খুললেও স্টল নির্মাণের ঠুকঠুক শব্দ আর প্রকাশনা সংস্থার স্টল গোছানোর ব্যস্ততার মধ্যেই কাটলো প্রথম দিন।
তবে শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় দিনব্যাপী মেলা জমার প্রত্যাশায় আছেন প্রকাশকেরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সারেন।
এরপরই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় বইমেলা প্রাঙ্গণ। প্রথম দিনের জনসমাগম নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন প্রকাশনা সংস্থা সংশ্লিষ্টরা। তবে অনেক স্টলেই নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি।
প্রথম দিন মেলার মাঠে দেখা যায়, অনেক স্টলেই হাতুড়ির শব্দ, কোথাও বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ চলছিল, কোথাও রঙের গন্ধ। এর মধ্যেই কয়েকটি স্টলে বইয়ের কার্টন খোলা হচ্ছিল; কর্মীরা দ্রুত তাকে বই সাজিয়ে তুলছিলেন।
এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য-‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।
এবারও বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে বইমেলার আয়োজন হয়েছে। মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে।
এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকছে। মোট ইউনিট থাকছে ১,০১৮টি।
গত বছর মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১,০৮৪টি। সে হিসাবে এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে।
মেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায়। সেখানে ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শিশুচত্বরে মোট প্রতিষ্ঠান ৬৩টি এবং ইউনিট ১০৭টি।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা বলেন, “এবার বইমেলার বিন্যাস গতবারের মতো অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে। তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।”
“আর রোজার মাস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মেলায় আসা মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের ব্যবস্থা আছে।”
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পরিচালক ফিরোজ শেখ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার মেলা নিয়ে কিছু জটিলতার কারণে প্রকাশনা সংস্থাগুলো দেরিতে স্টল সাজাতে শুরু করেছে। তবে সবার প্রস্তুতি ভালো, শুক্রবার থেকেই পুরোদমে মেলা জমে উঠবে।”
শুক্রবার দিনব্যাপী মেলা
ছুটির দিন হওয়ায় শুক্রবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।
সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে আয়োজন হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ: ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করবেন লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজন।
শিশুতোষ প্রকাশনা সংস্থা দোলনের স্বত্ত্বাধিকারী কামাল মোস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বইমেলায় তো প্রথম দিন কাটে প্রস্তুতি নিয়েই। পরদিন থেকেই মূলত মেলা জমে উঠে। এবার মেলার দ্বিতীয় দিনই শুক্রবার। ফলে ছুটির দিনে মেলা জমবে বলে আশা করি।”
শুক্রবার শিশুপ্রহরে বইমেলার শিশুচত্বর জমজমাট হবে বলে প্রত্যাশা এই প্রকাশকের।
বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না।
আর ছুটির দিন বইমেলা বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বইমেলার মূল মঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজন।
প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকছে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রয় করবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে।
মেলার মাঠে খাবারের স্টলগুলো এবারও থাকছে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে।

বইমেলার উদ্বোধন
দুপুরে শিল্পী ফেরদৌস আরার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুর সপ্তক’ এর শিল্পীদের সম্মেলক কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং ঐতিহাসিক ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশনায় শুরু হয় মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা এখন জাতীয় মেধা-মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই মেলা নিছক উৎসবই নয়, এটি আমাদের মাতৃভাষা, ভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত।
“বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করে তোলার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই মেলাকে অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ আছে কি না, আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখতে পারি। এর ফলে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা শেখা ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমাদেরকে জ্ঞানে বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে ও মেধায় সমৃদ্ধ হতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য তিন লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন।

কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ/গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞান ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসান এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
কবিতায় মোহন রায়হানকে পুরস্কার দেওয়ার কথা থাকলেও মঞ্চে তার নাম ঘোষণা করা হয়নি, তাকে পুরস্কারও দেওয়া হয়নি।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মোহন রায়হানের ব্যাপারে কিছু অভিযোগ উথাপিত হওয়ায় সাময়িকভাবে পুরস্কারটি স্থগিত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে খতিয়ে দেখে এ ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
বইমেলা উদ্বোধন শেষে স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে মেলা ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলা একাডেমির স্টল পরিদর্শনের সময় একাডেমির পক্ষ থেকে তাদের বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই উপহার দেওয়া হয়।
রীতি হল বইমেলা শুরু হবে ভাষার মাসের প্রথম দিন, আর সেই মেলার উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। তবে তবে এ বছর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং রোজার কারণ দেখিয়ে ডিসেম্বরে এই মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে তা আরও দুই দফা পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
উদ্বোধন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব, কাজী রুমানা আহমেদ সোমা ও সহপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মাহবুবা রহমান।
আরও পড়ুন: