Published : 16 Apr 2026, 01:44 AM
সারাদেশে রেলপথে যতগুলো লেভেল ক্রসিং আছে, তার বেশিরভাগই অরক্ষিত। লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনাও ‘নাজুক’। আর এসব কারণেই লেভেল ক্রসিংগুলো হয়ে উঠেছে মরণফাঁদ।
অরক্ষিত থাকার অন্যতম কারণ, বেশিরভাগ লেভেল ক্রসিং অবৈধ। অর্থাৎ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই এসব লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে।
ফলে কোথাও-কোথাও গেইটম্যান থাকলেও অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটম্যান থাকে না, আবার থাকলেও কাজে অবহেলা রয়েছে। এছাড়া সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও তদারকির সমস্যাও আছে।

গবেষণা বলছে, লেভেল ক্রসিংয়ের তৈরিতে ‘ত্রুটি’, গেইটম্যান না থাকা এবং পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান লেভেল ক্রসিংগুলোর অবস্থাকে ‘ভয়ানক নাজুক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলছেন, লেভেল ক্রসিংগুলোতে সতর্কীকরণ সংকেত দিতে পারে না, সংকেত বাজে না, যা এক ‘ভয়াবহ দুর্যোগ’।
এ অবস্থায় রেলওয়ে কী করছে? রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা লেভেলক্রসিংয়ে সংকেত ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে গেইটম্যানদের তদারকি করা হচ্ছে।
কত লেভেলক্রসিং অরক্ষিত?
সারাদেশে অর্ধেকের বেশি রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং অবৈধ। রেলওয়ের ২০২৩ সালের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, সেসময় সারাদেশে লেভেল ক্রসিং ১ হাজার ৪৬৮টি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৮১১টি, আর পশ্চিমাঞ্চলে ৬৫৭টি লেভেল ক্রসিং।

পূর্বাঞ্চলে ৮১১টি ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৩২০টিতে গেইটম্যান রয়েছে। আর, পশ্চিমাঞ্চলে ৬৫৭টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ২৪৪টিতে গেইটম্যান রয়েছে।
বাকি ক্রসিংগুলো অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোতে কোনো স্থায়ী গেইটম্যান বা আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা নেই।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৪২৮ দশমিক ০৯ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে।
এর মধ্যে মিটারগেজ ১ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার, ব্রডগেজ ১ হাজার ৬৬ দশমিক ৬০ কিলোমিটার এবং ডুয়েলগেজ ৭৭০ দশমিক ০৬ কিলোমিটার।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবতার নিরিখে ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ নতুন রেললাইন স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজও চলছে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, মোট নেটওয়ার্কের মাত্র ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটম্যান আছে। বাকিগুলোতে হয় নিয়মিত গেইটম্যান নেই অথবা পুরোপুরি অরক্ষিত।
রেলের অনুমোদনের বাইরে সারাদেশে অন্তত ১ হাজার ৩২১টি রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং আছে। এগুলোর কোনো-কোনোটি তৈরি করেছে স্থানীয় পৌরসভা, এলজিইডি, সওজ এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
মূলত নতুন সড়ক তৈরি করার ফলে অনেক জায়গায় স্থানীয়দের চাহিদা মাফিক এসব লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে।
তথ্য বলছে, অবৈধ রেলক্রসিংগুলোর মধ্যে এলজিইডি ও ইউনিয়ন পরিষদ তৈরি করেছে অন্তত ৯৬০টি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ১৭০টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ১২টি লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছে। বাকিগুলো স্থানীয়ভাবে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি হয়েছে।
এসব লেভেল ক্রসিংয়ের কিছু-কিছু জায়গায় গেইটম্যান থাকলেও অধিকাংশগুলোতেই সংকেত ব্যবস্থা নেই, কোথাও আবার ‘ক্রসিং বার’ নেই।

কোন বছর কত দুর্ঘটনা
যেসব ক্রসিংয়ে গেইটম্যান আছে, সেখানেও নানা অনিয়ম চলে। এর সবশেষ উদাহরণ কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি; গেল ২১ মার্চ রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ওই দুর্ঘটনায় মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আটজন।
এ ঘটনায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে ট্রেনের চালক, রেলের গেইটম্যান, স্টেশন মাস্টারসহ অনেকের অবহেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার ‘মূল কারণ’ হিসেবে ছয় গেইটম্যানের অবহেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পদুয়ার বাজার রেলগেইটে দুর্ঘটনার দিন মেহেদী হাসান ও হেলাল নামের দুই গেইটম্যানের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু তারা সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা এক হাজার টাকার বিনিময়ে কাউসার ও নাজমুল নামে দুজনকে গেইটম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য রাখেন। ভাড়া করা গেইটম্যানও সেখানে ছিলেন না। এ বিষয়ে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অবগত ছিলেন না।
এমন চিত্র শুধু কুমিল্লাতে নয়, সারাদেশেই অনেক লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটম্যান দায়িত্ব পালন করেন না। কোথাও-কোথাও ভাড়ায় চলে এই কাজ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলপথে হওয়া দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ ঘটে লেভেল ক্রসিংয়ে।
সংগঠন দুইটি বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে গেইটম্যান না থাকা এবং পথচারী বা চালকদের অসচেতনতার কারণে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ সালের জুন পর্যন্ত দেশে রেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫ জন, আহত হয়েছেন ৪১ জন, ২০১৯-২০ সালে ৩৮ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ১০৬ জন, ২০২০-২১ সালে ৩৭ জন নিহত ও ১৬ জন আহত, ২০২১-২২ সালে ১৭ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত, ২০২২-২৩ সালে ৯ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন।
২০১৮ থেকে ২০১৯ সালে সারাদেশে ৯১টি, ২০১৯-২০ সালে ৮০, ২০২০-২১ সালে ১১১, ২০২১-২২ সালে ৭৯ ও ২০২২-২৩ সালে রেলে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটার হিসাব রেলওয়ের তথ্যে উঠে এসেছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, শুধু ২০২৪ সালে ২৫৩টি দুর্ঘটনায় দেশে ২৩০ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২৩৮ জন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৮ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল মার্চ মাসে সারাদেশে ৪৮টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ২২৪ জন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এবারের ঈদযাত্রা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত, ২২৩ জন আহত হয়েছেন।
কী কারণে দুর্ঘটনা
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোর কোনোটিতেই সংকেত ব্যবস্থা বা গেইটম্যান থাকে না। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বৈধ গেইটগুলোতে সংকেত ব্যবস্থা আধুনিকায়ন না হওয়া এবং সাইরেন না বাজার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।
গবেষণা বলছে, দেশের প্রায় ৬৯ থেকে ৮২ শতাংশ লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত (যাতে গেইটম্যান বা আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা নেই)। অনেক ক্ষেত্রে রেললাইনের উচ্চতা সড়কের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে ভারী যানবাহন ক্রসিংয়ে আটকা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞানী ও গবেষণকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘রিসার্চগেইট’-এ প্রকাশিত ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় (অ্যাক্সিডেন্ট প্রেডিকশন মডেল ফর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংস ইন বাংলাদেশ) দেখা গেছে যে, লেভেল ক্রসিংয়ের জ্যামিতিক গঠন এবং ট্রেন আসার আগে পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সংকেত (কমপক্ষে ২৮ ফুট দূরত্বে) না থাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে কেবল গেইটম্যান নিয়োগ নয়, বরং স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলছেন, রেলের দুর্ঘটনার তদন্তগুলোতে যেসব সুপারিশ দেওয়া হয়, সেগুলোর অনেকটাই ‘একপেশে’। যেখানে অধিকাংশ সময়ই গেইটম্যান, সিগন্যালম্যানের মতো নিচুপর্যায়ের কর্মচারীদের দায়ী করা হয়।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অতীতেও এই ধরনের (কুমিল্লার মতো) অসংখ্য দুর্ঘটনা হয়েছে। যেটা হয় যে দুর্ঘটনার তদন্তগুলি, সুপারিশগুলি-এটা অনেকটা একপেশে হয়ে যাচ্ছে। নিচের কর্মচারী যারা আছে, তাদের উপর আমরা দোষটা চাপিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এভাবে গেইটম্যান বা সিগন্যালম্যানকে বরখাস্ত করে দুর্ঘটনা কমবে না।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমাদের লেভেল ক্রসিংগুলোতে আমি বলব ভয়ানক নাজুক অবস্থা। প্রত্যেকটা লেভেলক্রসিংযের পাশে যে ঘরগুলি থাকে গেটম্যানদের জন্য, সেগুলো তো কুঁড়েঘর। সেখানে ন্যূনতম কোনো সুযোগ সুবিধা নাই। সুপেয় পানির ব্যবস্থাপনা নাই, শৌচাগারের ব্যবস্থা নাই।
“এমনকি ওই ঘরের মধ্যে যে সংকেত বাতি থাকে, এই সংকেত বাতিগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নষ্ট থাকে। এমনকি যে ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করবে, সেগুলোও নষ্ট থাকে প্রায়ই। ফলে, সেখানে রেড সিগন্যাল দিতে পারে না, সংকেত বাজে না, এক ভয়াবহ দুর্যোগ।”
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “এই যে পুরো সিস্টেম, এর মধ্যে আমি কোথাও আসলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দেখতে পাচ্ছি না। ওই জায়গায় যারা রেল পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের দায়িত্ব হল এই জিনিসগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা, নিয়মিত তদারকি করা, মেরামত করা। এসব, সেই জায়গায় যে দুর্বলতা সেটা নিয়ে কিন্তু তদন্ত যারা করছেন, তারা কথা বলছেন না।”
এই সমস্যার উত্তরণে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “রেল দেড় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে গত দেড় যুগে। আমার ধারণা এই টাকার দুই শতাংশ বিনিয়োগ যদি এই লেভেল ক্রসিংয়ের অটোমেশনে চলে যেত, তাহলে মানবঘটিত দুর্ঘটনা অনেক কমে যেত।
“আমি বলব যে রেলের উচিত হবে আগামী এক দশকে বিনিয়োগগুলি অবকাঠামো উন্নয়নে না করা। এখন বিনিয়োগ হবে রেল পরিচালনার জন্য, অর্থাৎ পরিচালনার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে বিনিয়োগগুলো হওয়া উচিত দক্ষ জনবল তৈরি করাতে।”
এই গবেষকের মতে, চৌকশ জনবল ছাড়া লেভেল ক্রসিংয়ে এই সংকট ও দুর্ঘটনা কমবে না। সেই সঙ্গে পুরো সংকেত ব্যবস্থাকে আধুনায়িকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিস্বার্থে হওয়া ক্রসিংগুলো বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রেলক্রসিংগুলোর মধ্যে কোনগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোনগুলো মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা আগে নির্ধারণ করতে হবে।”
জবাবদিহিতার ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “একটা দুর্ঘটনা ঘটলে, সেটির প্রতিবেদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলোর মুখ দেখে না।
“আবার এমনও দেখা যায়, যারা অপরাধী তাদেরই কমিটিতে রেখে তদন্ত করা হয়।”
তার মতে, ডিজিটাল লেভেল ক্রসিং কীভাবে তৈরি করা যায়, সেটি দেখতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে লেভেল ক্রসিংগুলোতে। পাশের দেশে কী প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করছে, সেটি দেখেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ ও কার্যকর করা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সম্প্রতি আমরা একটা উদ্যোগ নিচ্ছি গেইটগুলোতে যাতে সড়কযান দূর থেকেই একটা ঘণ্টার শব্দ শুনতে পায় বা সাইরেন বাজতে পারে—সেরকম একটা প্রক্রিয়া আমরা শুরু করছি।
“আরেকটা হল-প্রতি শিফটে দুইজন করে লোক আমাদের কন্ট্রোল রুমে বসায় দিছি, যারা প্রত্যেকটা গেইটে ফোন করে চেক করতেছে গেইটম্যান দায়িত্বে আছে কি না। রেজিস্টার খুলে এটা খুব যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়।”
তিনি বলেন, “আর একটা বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি—ইন্ডিয়ার কথা বলি। ইন্ডিয়ার রেলওয়ে ব্যবস্থা আমরা ভালো ধরি। অন্যান্য সব দেশে তো আছেই। যে বড় গেইটগুলো, আসলে হয় যানবাহন ওপর দিয়ে যায়, না হয় ট্রেন ওপর দিয়ে যায়। মানে দুইটা একসাথে থাকে না। একটা নিচে দিয়ে যাবে একটা ওপর দিয়ে যাবে। কারণ মানুষের ফেইলিওর হতে পারে।
“আমরা সেটাও উদ্যোগ নিচ্ছি, যেগুলো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ গেইট আছে, সেখানে কোনোটাতে ব্রিজ, কোনোটাতে ওভারপাস বা আন্ডারপাস যেটাই বলেন—সেটাতে আমরা যাব। আর একটা উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি নতুন প্রজেক্টগুলোতে। যেমন ধরেন দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেললাইন বা পদ্মাতে যে নতুন রেললাইন গেছে—এগুলোতে আমরা বেশিরভাগই কিন্তু আন্ডারপাস করছি। অর্থাৎ গেইটের সংখ্যা আমরা কমিয়ে নিয়ে আসছি। এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা, যদি একটু মানুষ সচেতন হয় কমবে।”
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি লেভেল ক্রসিং ব্যবহার করা মানুষ ও যানবাহন চালকদের আরও বেশি সতর্ক হওয়ার কথাও বলেন তিনি।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কুমিল্লার এই দুর্ঘটনার পরে বিষয়টি নিয়ে রেল ভবনে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। লেভেল ক্রসিং নিয়ে সিদ্ধান্ত এলে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আসতে হবে।
“কতগুলোকে অরক্ষিত গেইটকে আমরা অনুমোদন দেব এবং কীভাবে এগুলোকে আরও নিরাপদ করা যায়, এ বিষয় নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে সচিব স্যারের সভাপতিত্বে আলোচনা হয়েছে।”
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকার যে লেভেল ক্রসিংগুলো আছে, এখন আমাদের তো থার্ড লাইন, ফোর্থ লাইন হচ্ছে। আমাদের চিন্তা-ভাবনা আছে এই লেভেল ক্রসিংগুলি আমরা আন্ডারপাস করে দিব, যাতে ঢাকার জ্যামটাও কমে, সঙ্গে ট্রেনের গতিও বেড়ে যেতে পারে।”

লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের রেলওয়ে আইন অনুযায়ী আছে, যে পরে ক্রস করবে, তাকেই কিন্তু সেই দায়ভারটা নিতে হবে। ক্রসিংয়ের লোকবল থেকে শুরু করে গুমটি ঘর—এসবের। এখন এলজিইডি বা সড়ক ও জনপথের যে রাস্তাগুলো ক্রস করে, রেলওয়ে আইন অনুযায়ী তাদেরই দায়িত্ব হল যে এই লেভেল ক্রসিংয়ে লোকবল দেওয়া। যেগুলো আমাদের অনুমোদিত রেল গেইট, সেখানে যদি ক্রসিংয়ে লোক মারা যায়, সেটা অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব।”
রেলের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো নিয়ে তিনি বলেন, “এখন সরকারের পরিকল্পনা আছে কীভাবে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের পরিমাণ কমানো যায়। কারণ, লেভেল ক্রসিং থাকলে তো এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। সড়ক ও জনপথ বা এলজিইডি তাদেরও নির্দেশনা দেওয়া আছে, যাতে যেখানে সেখানে রেল লাইন পার করে রাস্তাটা না করে, অনুমতি নিয়ে যেন করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে এলজিইডি অনুমতি না নিয়ে অনেক জায়গায় ক্রসিং করে ফেলে।”
তিনি বলেন, “গেইটে আমাদের জনবল সংকট আছে, আমরা তো নতুন করে নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারছি না, তবে আমরা চেষ্টা করছি লেভেল ক্রসিংগুলোতে জনবল বাড়াতে।”
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনকে ফোন করে ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে এই মুহূর্তে নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই।”
তিনি এলজিইডির সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুস সবুরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

আব্দুস সবুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমাদের এলজিইডি থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বেশ কয়েকবার রেলওয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও হয়েছে। সুনির্দিষ্ট ওই ইস্যুগুলো ধরে একটা প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল, যে এগুলো কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়।
“পাশাপাশি ক্রসিংয়ের নিরাপত্তার যে অনুষঙ্গগুলো থাকে পাস করার জন্য, এই গেইটম্যান, ব্যারিয়ার বা সাইরেন এগুলো নিয়ে।
“এখন ওনাদের (রেলওয়ে) কথা হল, ‘আপনারা ডিপিপি করেন, এখানে গেইটম্যান রাখতে হবে।’ এখন গেইটম্যান তো রেলওয়ের ওপর আমরা রাখতে পারি না। কারণ আমাদের গেইটম্যান রাখা মানে হচ্ছে চাকরি। তাই না? এগুলো কিছু ইস্যু ছিল। এই ইস্যুগুলোর জন্য প্রকল্পটা আর আগায় নাই।”
নতুন করে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না, বলেন তিনি।
এলজিইডির সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “এখন নতুন করে হয়তো আবার শুরু হবে। কারণ সবগুলো প্রস্তাবিত প্রকল্প, যা আছে নতুন করে আলোচনায় আসবে, যাচাই-বাছাই হবে। তখন আবার হয়তো এগুলো শুরু করবে। যেটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটা হয়তো আবার নতুন করে শুরু করবে।”
পুরোনো খবর: