Published : 01 Mar 2026, 11:28 PM
রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুন লেগে প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলার প্রতিবেদন এখনো আদালতে দাখিল করতে পারেনি পুলিশ।
গেল দুই বছরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১৭ বার পিছিয়েছে, আর কতবার পেছাবে? এখন এই প্রশ্ন ওঠেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ইন্সপেক্টর শাহজালাল মুন্সী বলছেন, সব তথ্য-উপাত্ত তারা এখনো হাতে পাননি। অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলো পাওয়ার আশা করছেন এবং পেয়ে গেলে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে গ্রিন কোজি কটেজ নামের সাততলা ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে।
এ ঘটনায় রমনা মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার সিআইডির হাতে যায়।
এখন পর্যন্ত ১৭ বার প্রতিবেদন দাখিলে সময় নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি।
এজন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ১৯ এপ্রিল রেখেছেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই জিন্নাত আলী এ তথ্য দিয়েছেন।
এ মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তারা এখন জামিনে আছেন।

তারা হলেন-কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর মালিক সোহেল সিরাজ, কর্মকর্তা জেইন উদ্দিন জিসান, ফুকো চেইন রেস্টুরেন্টের আব্দুল্লাহ আল মতিন ও মোহর আলী পলাশ, ভবনটির নিচতলার চা-কফির দোকান ‘চুমুক’ এর দুই মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান রিমন, স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, ভবনটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা মুন্সী হাসিবুল আলম বিপুল, নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন ও ফরহাদ।
প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর শাহজালাল মুন্সী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চেষ্টা করছি মামলাটা দ্রুত সময়ে শেষ করার জন্য। আমরা তথ্য-উপাত্ত কিছু পেয়েছি। আর অল্প কিছু বাকী আছে। হয়তো শর্ট টাইমে পেয়ে যাব।”
তদন্তে সময় লাগার কারণ কী? জবাবে তিনি বলেন, “যথা সময়ে বিভিন্ন ইউনিট থেকে আমরা তথ্য পাইনি। রাজউক ও আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের কাছে আমরা কিছু রিপোর্ট চেয়েছি। কিন্তু তারা সেগুলো এখনো আমাদের দেয়নি। এগুলো ডকুমেন্টের বিষয়। ডকুমেন্ট নিয়েই প্রতিবেদন দিতে হয়।
“হয়তো আমরা পেয়ে যাব। পেয়ে গেলে শর্ট টাইমে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করবো।”
২০১১ সালে একটি বেইজমেন্টসহ আট তলা আবাসিক কাম বাণিজ্যক ভবন হিসেবে গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন দেয় রাজউক। ওই ভবনের জমির মালিক হামিদা খাতুন। আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন সেখানে ভবনটি তৈরি করেছে।

আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ভবনটিতে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মাত্র একটি সিঁড়ি ও ভবনের একটি ছাড়া প্রায় প্রতিটি ফ্লোরে খাবারে দোকান থাকায় গ্যাস সিলিন্ডারগুলো রাখা ছিল অপরিকল্পিতভাবে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০ টার দিকে ওই ভবনের নিচ তলার ‘চুমুক’ রেস্তোরাঁয় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে ভবনটিতে আগুন লাগে এবং প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিক তথ্যের বরাতে মামলার বিবরণীতে বলা হয়, ভবনটির স্বত্ত্বধিকারী এবং ম্যানেজার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বেশ কিছু রেস্তোরাঁ এবং দোকান ভাড়া দেন। রেস্তোরাঁগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যতিরেকে রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার এবং চুলা ব্যবহার করে।
গ্রিন কোজি কটেজে আগুনের ঘটনায় যারা মারা গেছেন তারা হলেন-বুয়েট শিক্ষার্থী নাহিয়ান আমিন, সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রী ওরফে বৃষ্টি খাতুন, ফৌজিয়া আফরিন রিয়া, পপি রায়, আশরাফুল ইসলাম আসিফ, নাজিয়া আক্তার, আরহাম মোস্তফা আহামেদ, নুরুল ইসলাম, শম্পা সাহা, শান্ত হোসেন, মায়শা কবির মাহি, মেহেরা কবির দোলা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতি তাজরিন নিকিতা, তার মা ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা লুৎফুর নাহার করিম, মোহাম্মদ জিহাদ, কামরুল হাসান, দিদারুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান শামীম, মেহেদী হাসান, নুসরাত জাহান শিমু , ইতালি প্রবাসী সৈয়দ মোবারক কাউসার, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার, তাদের ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহ, মেয়ে সৈয়দা ফাতেমা তুজ জোহরা ও সৈয়দা আমেনা আক্তার নুর, জারিন তাসনিম প্রিয়তি, জুয়েল গাজী, রুবি রায়, তার মেয়ে প্রিয়াংকা রায়, তুষার হাওলাদার, কে এম মিনহাজ উদ্দিন, সাগর, তানজিলা নওরিন, শিপন, আলিসা, সংকল্প সান, লামিশা ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি নাসিরুল ইসলামের মেয়ে লামিশা ইসলাম, নাঈম।

কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ মালিক সোহেল সিরাজের আইনজীবী তাসলিমা মিনু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ঘটনায় আমাদের কোনো দায় নাই। আমাদের ওখান থেকে আগুন লাগেওনি। আগুন লেগেছে নিচতলা থেকে। আমাদের কোনো অবহেলা ছিল না। বরং অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর তিনজন স্টাফ মারা যায়।
“আর ঘটনার দিন রেস্তোরাঁর ক্যাশে টাকা ছিল। একটা টাকাও পোড়েনি। মামলায় ওই টাকা জব্দ করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে আমরা টাকা ফেরত পেয়েছি।” সঠিক তদন্ত দাবি করেন এ আইনজীবী।
আসামি মুন্সি হামিমুল ইসলাম বিপুলের আইনজীবী মো. আনিসুজ্জামান বলেন, “আমরা চাই এই মামলার সঠিক তদন্ত হোক। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সাথে জড়িত যারা, সত্যিকারের অপরাধী সঠিক তদন্ত করে তাদের বের করে আনা হোক। নিরাপরাধ সবাই যেন অব্যাহতি পায়।”