Published : 01 Mar 2026, 01:54 AM
বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নজরুল মঞ্চের পেছনের দিকে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর স্টল। পোড়া হারমোনিয়াম, তবলা আর নথিপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে স্টলটি।
রাজধানীর তোপখানা রোডে গত ১৯ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসামন হাদির মারা যাওয়ার খবর আসার পর উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাদ্যযন্ত্র, নথিপত্রের প্রদর্শনীর পাশাপাশি স্টলটিতে আছে কিছু বইও।
উদীচীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উদীচী কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদ জানাতেই স্টলটিকে এভাবে সাজানো হয়েছে।
অন্যদিকে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের লেকের পাশে রয়েছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর স্টল। অর্ধেক সাঁটার নামানো স্টলটি সেজেছে ভাঙা চেয়ারে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের ছবির ফ্রেমও রয়েছে ভাঙা অবস্থায়। ধুলোয় ঢাকা রয়েছে শৈশবের ঠাকুরমার ঝুলির বই।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশের বইগুলোর মলাটেও ধুলোর আস্তর। স্টলটির দুই পাশে লেখা সাইনবোর্ড, "সাহিত্য মরে যাচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে প্রকাশনী। আপনি আমিই বইয়ের চুম্বক অংশ অনলাইনে শেয়ার করে দিচ্ছি দেদারসে। এতে লেখার প্রচার হলেও বইয়ের কদর কমে। দিনশেষে লেখকের পরিবর্তে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলো।"
আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা, "অনলাইনে প্রকাশিত সাহিত্যকর্মের ৮০% পাইরেসির শিকার হয়। আসুন আমরা এই পাইরেসি থেকে বিরত থাকি। ৩০% লেখক হারিয়ে গেছে ফেইসবুক টুইটার আমার পর, প্রাপ্য সম্মানী না পেলে লেখক বাঁচবে কিভাবে।"
বিদ্যানন্দের ইভেন্ট ব্যবস্থাপক মনজুর আলম রবি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা মূলত বই নিয়ে পাইরেসি রোধের সচেতনতার বার্তা দিচ্ছি।"
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, এটা মূলত সাহিত্য বাঁচানোর আকুতি। প্রিয় লেখকের লেখা মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রচার বাড়লেও বই বিক্রি কমছে। লেখক পাইরেসির শিকার হচ্ছেন, অথচ লাভবান হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোম্পানিগুলো।
"অনলাইনে লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিনামূল্যে পাওয়া গেলে পাঠক বই কেনার আগ্রহ হারান। ফলে লেখক সম্মানী থেকে বঞ্চিত হন এবং অনেকেই লেখালেখির উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।"
দিনভর মেলা
শনিবার ছিল বইমেলার তৃতীয় দিন। মেলা চলে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশুপ্রহর।
দুপুরের তীব্র রোদেও দেখা যায়, পুতুল নাটক ঘিরে ছোটদের সঙ্গে বড়দেরও উন্মাদনা। এর সঙ্গে বাড়তি আনন্দ যোগ করে বায়োস্কোপ।
এরপর বিকালের দিকে লোক সমাগম কিছুটা কম থাকলেও ইফতারের পর লোকজন বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গণে।

সন্ধ্যার পর বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে পাওয়া যায় লেখক মোহিত কামালকে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অনেকে ভেবেছিলেন, রোজার কারণে বইমেলা জমবে না। আমি তো দেখছি, অনেকে আসছেন। মেলা জমে উঠেছে।”
এবার প্যাভিলিয়ন না থাকার কারণে মেলাকে ‘সাম্যবাদী' হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এবার কিন্তু সব স্টলের মধ্যে এক ধরনের সাম্যবাদ আছে। আবার কোনো স্টল এই ছোট পরিসরকেই নান্দনিক করে সাজিয়েছে।
ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক স্মরণ
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: আহমদ রফিক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মনসুর মুসা।
ইসমাইল সাদী বলেন, "আহমদ রফিক জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে। প্রবন্ধ, কবিতা, গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা, নতুন লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা, সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা, উদ্যোক্তা, সংগঠক—সব মিলিয়ে সৃষ্টি আর কর্মের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল তাঁর যাপিত জীবনে।
"১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে আহমদ রফিক ছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। এ পর্বে প্রতিটি সভা-মিছিল, প্রতিবাদী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে যেমন আহমদ রফিক রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অনুভব করতেন শৈল্পিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেই কারণে, মননশীল সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলন–বিষয়ক গ্রন্থ রচনায় তিনি ক্রমশ অনালোকিত বিষয় নির্বাচন করে তাতে চিন্তা ও গবেষণার আলো ফেলে গেছেন।"
মোস্তফা তারিকুল বলেন, "ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ছিলেন একজন সৃজনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ। তিনি একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, উদার ও মননসমৃদ্ধ জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখতেন। সামাজিক অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে মেধা ও সাহসী প্রত্যয় নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন তিনি। তাঁর লেখকসত্তা তাকে সমাজের কাছে রাষ্ট্রের কাছে এবং সাহিত্যের কাছে দায়বদ্ধ করে তুলেছিল, আর সেই দায়বদ্ধতা ও প্রেরণা থেকেই তিনি বহুবিচিত্র বিষয়ে কলম ধরেছেন।"
অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, "আহমদ রফিক ভাষাসংগ্রামী এবং জীবনসংগ্রামী ছিলেন। মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।"

নতুন বই
বইমেলা পরিচালনা কমিটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, শনিবার মেলায় নতুন বই এসেছে ৩৮টি।
বেঙ্গল বুকসের স্টল ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম রাজু বলেন, এবার তাদের প্রকাশনী থেকে ৬টি নতুন বই এসেছে৷ মেলার তিন দিনে তাদের স্টলে এসে তরুণ পাঠকরা ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই খুঁজে যাচ্ছেন৷
ইউপিএল মেলায় এনেছে বীর প্রতীক ডা. সিতারা বেগমের স্মৃতিকথা 'ওয়েপিং হার্ট'৷ আগামী প্রকাশনী থেকে এসেছে হুমায়ুন আজাদের 'এক একর সবুজ জমি'৷ পাঠক সমাবেশ থেকে এসেছে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্প সংকলন ‘ভুলে থাকা গল্প’।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু–কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রথমিক বাছাই পর্ব। এতে ৩৪৭ জন (ক–শাখায় ৮২ জন, খ–শাখায় ১৮৫ জন এবং গ–শাখায় ৮১ জন) প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।
প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ মার্চ ২০২৬।
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আহমাদ মাযহার।
বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন কাজী বুশরা আহমেদ তিথি, ইশরাত শিউলি, জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা এবং নাসিম আহমেদ।
সংগীত পরিবেশন করেন সালাউদ্দিন আহমেদ, শহীদ কবীর পলাশ, ইয়াকুব আলী খান, নন্দিতা মন্ডল, অপর্ণা মজুমদার, নুসরাত জাহান জেরিন এবং মো. জাকির হোসেন আখের।
যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন, বিশ্বজিৎ সরকার (তবলা), রবিনস চৌধুরী (কী–বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), ফিরোজ খান (সেতার)।

রোববার যা থাকছে
রোববার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ: হামিদুজ্জামান খান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন নাসিমুল খবির। আলোচনায় অংশ নেবেন আইভি জামান। সভাপতিত্ব করবেন লালারুখ সেলিম। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।