Published : 19 May 2026, 01:56 PM
জ্ঞাত আয়ের বাইরে ‘সম্পদ অর্জন’ এবং ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের’ মাধ্যমে পূর্বাচলে ‘প্লট আত্মসাতের’ অভিযোগে দুদকের পৃথক দুই মামলায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছে আদালত।
ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে জামিনের আবেদন নামঞ্জুরের আদেশ দেন।
দুদক প্রসিকিউটর তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুদকের দুই মামলায় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের জামিন আবেদন করা হয়।
তিনি বলেন, “দুদকের পক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করি। পরে আদালত জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দিয়েছে।”
অবৈধ সম্পদের মামলায় বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮২০ টাকা থাকার অভিযোগে গেল বছরের ১১ সেপ্টেম্বর কমিশনের উপ-সহকারী পরিচালক পাপন কুমার শাহ দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, “বিচারপতি হিসেবে কর্মরত থাকাকালে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮২০ টাকার সম্পদ অর্জন করেন।”
মামলায় এসব সম্পদের মালিকানা অর্জন করে তা দখলে রাখা এবং হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্লট আত্মসাতের অভিযোগে একই দিনের আরেক মামলা করেন সংস্থার উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। বিচারপতি মানিক ছাড়াও সাতজনকে আসামি করা হয়েছে ওই মামলায়।
তাদের মধ্যে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশমিরি কামাল, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদা, এম জয়নাল আবেদীন ভুইয়াও রয়েছেন। এ ছাড়া রাজউক কর্মকর্তা মো. আবু বক্কার সিকদার, এম মাহবুবুল আলম ও আব্দুল হাইও রয়েছেন আসামি তালিকায়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, “আসামিরা যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও মিথ্যা হলফনামার মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নেন। পরবর্তীতে লিজ দলিলের শর্ত ভঙ্গ করে বেআইনিভাবে প্লট হস্তান্তর ও আত্মসাৎ করেন।”
দুদক বলছে, নিয়ম অনুযায়ী রাজউকের অধিক্ষেত্রে কারও পূর্বে বাড়ি থাকলে নতুন প্লট বরাদ্দ দেওয়া যায় না। আবেদনকারীকেও প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট স্বাক্ষরিত হলফনামা দিতে হয়, যাতে বলা থাকবে তিনি বা তার নির্ভরশীলরা এ এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক নন।
কিন্তু শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাড্ডা থানার ভাটারা মৌজায় পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত জমি এবং নির্মাণাধীন বাড়ি থাকা সত্ত্বেও হলফনামায় ‘অসত্য তথ্য দেন’।
“পরবর্তীতে রাজউক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে পূর্বাচল প্রকল্পের প্লট নিজের নামে রেজিস্ট্রিভুক্ত করেন। তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদা, সদস্য (অর্থ) মো. আবু বকর সিকদার, সদস্য (পরিকল্পনা) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার এবং সদস্য (উন্নয়ন) এম মাহবুবুল আলম লিজ দলিলের শর্ত ভঙ্গ করে কাশমিরি কামালকে আমমোক্তার হিসেবে অনুমোদন দেন। পরে ৫০ লাখ টাকায় জমিটি বিক্রি করে তার নামে নামজারির অনুমোদন দেন তৎকালীন সদস্য আব্দুল হাই ও সাবেক চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া।
“তারা সক্রিয়ভাবে বিচারপতি মানিককে প্লট আত্মসাতে সহায়তা করেন। কাশমিরি কামালও প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা অঙ্গীকারনামা দিয়ে লিজ দলিলের শর্ত ভঙ্গ করেন। তিনি প্রথমে আমমোক্তার হন এবং পরে জমিটি ক্রয় করে নিজের নামে নেন।”
আসামিরা যোগসাজশে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারি প্লট আত্মসাৎ করেছেন, যা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে বলছে দুদক।
১৯৭৮ সালে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক হাই কোর্টের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হন।
২০০১ সালে সরকার তাকে হাই কোর্টের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিলেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে অপসারণ করে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর হাই কোর্টের এক রায়ে তিনি বিচারকের পদে পুনর্বহাল হন। ২০১৩ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে আপিল বিভাগের বিচারক হন।
২০২৪ সালের ২৩ অগাস্ট সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে স্থানীয় জনতার সহায়তায় আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরদিন সকালে তাকে কানাইঘাট থানায় হস্তান্তর করা হয়। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে সিলেটের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর সিলেট অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম তার জামিন মঞ্জুর করেন।
তবে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় কারামুক্ত হতে পারেননি। পরে সিলেট থেকে সাবেক বিচারপতি মানিককে ঢাকায় আনা হয়। জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নেওয়া হয় রিমান্ডেও। পরে তাকে দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।