Published : 06 Jul 2026, 04:01 PM
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার শিক্ষক ছিলেন। এই পরিচয় নিঃসন্দেহে আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। তবে তাঁকে কেবল শিক্ষক বললে সেই পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। কারণ তাঁর শিক্ষার বড় অংশ শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর প্রকৃত শ্রেণিকক্ষ ছিল সমগ্র সমাজ, আর তাঁর পাঠের বিষয় ছিল দেশ, মানুষ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর কাছে পাঠ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যারা তাঁর শ্রেণিকক্ষে বসেছিলেন, তাঁর ছাত্রত্ব কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে, এমনকি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে আছেন তাঁর অগণিত মানস-ছাত্র। তাঁদের অনেকেই কখনো তাঁর আনুষ্ঠানিক ছাত্র ছিলেন না; কিন্তু তাঁর বই, প্রবন্ধ, বক্তৃতা এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে শিখেছেন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং সমাজকে নতুন চোখে দেখতে।
অধ্যাপক ফজলুল হক এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের স্থান থাকবে না, মানুষ ধর্ম, জাতি কিংবা শ্রেণিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। তিনি কল্পনা করতেন একটি অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের। এই স্বপ্ন তিনি কেবল তাঁর লেখায় ব্যক্ত করেননি; মানুষের মননেও তার বীজ বপন করার চেষ্টা করেছেন আজীবন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের করিডোরে দেখা হলে তিনি প্রায়ই সক্রেটিসের মতো প্রশ্ন করতেন, “দেশের খবর কী?” প্রশ্নটি ছিল না নিছক সৌজন্যের প্রকাশ। তিনি সত্যিই জানতে চাইতেন-মানুষ কী ভাবছে, কী নিয়ে উদ্বিগ্ন, সমাজ কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং কোথায় পিছিয়ে পড়ছে। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতেন, তারপর নিজের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতেন। সংলাপকে তিনি জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান মাধ্যম বলে মনে করতেন।
আমরা তখন অনেকেই ব্যস্ত ছিলাম-কেউ কর্মজীবনের চিন্তায়, কেউ গবেষণায়, কেউ ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতায়। তাঁর সহকর্মীরাও ব্যস্ত ছিলেন, ছাত্ররাও। কিন্তু তাঁর মধ্যে ব্যক্তিগত অর্জনের তাড়না খুব কমই দেখেছি। দেশ ও মানুষের চিন্তাই ছিল তাঁর প্রধান ব্যস্ততা। মনে হতো, নিজের জীবনকে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে এমনভাবে একসূত্রে বেঁধে নিয়েছেন যে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা যায় না।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার জগতে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক অনন্য মনীষী। তিনি ছিলেন চিন্তক, সমাজবিশ্লেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পথপ্রদর্শক। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের নিরলস চিন্তা ও লেখালেখি বাংলা মননচর্চাকে বিশেষ সমৃদ্ধি দিয়েছে। তাঁর রচনায় যুক্তির দৃঢ়তার পাশাপাশি ছিল মানবমুক্তির গভীর আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজ-রূপান্তরের প্রত্যয়।
তাঁর চিন্তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাধীনতা। তিনি কোনো মতবাদকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি, আবার কোনো প্রতিষ্ঠিত ধারণাকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সত্যের অনুসন্ধান একটি চলমান প্রক্রিয়া; এর কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নেই। তাই তিনি শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে, সন্দেহ করতে এবং প্রয়োজনে নিজের বিশ্বাসকেও পুনর্বিবেচনার সাহস অর্জন করতে।
বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর আলোচনা ছিল ইতিহাসসচেতন, সমাজসচেতন এবং ভবিষ্যতমুখী। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক নন্দনতাত্ত্বিক অনুশীলন হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল মানুষের আত্মমুক্তির শক্তি, সমাজকে বোঝার একটি উপায় এবং নৈতিক চেতনা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে তাঁর সাহিত্যসমালোচনা কেবল সাহিত্যবিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সমাজ, ইতিহাস ও জাতীয় জীবনের গভীর অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে।
তাঁর জীবনও ছিল তাঁর দর্শনের মতোই স্বচ্ছ। সরলতা, সংযম, সততা এবং আত্মমর্যাদাবোধ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত্তি। ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠার মোহে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেননি। নীরবে লিখেছেন, পড়িয়েছেন, ভেবেছেন এবং নতুন প্রজন্মকে চিন্তার আলোয় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর জীবন ও চিন্তার মধ্যে কোনো দৃশ্যমান ফাঁক ছিল না; তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা-ই ধারণ করার চেষ্টা করেছেন কর্মে ও আচরণে। তাঁর চিন্তা যেমন স্বাধীন ছিল, তেমনি তাঁর জীবনও ছিল সেই চিন্তারই বাস্তব রূপ।
গত তিন মাসে স্যারের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি মুহূর্ত আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে। ১৭ মে বাংলা একাডেমিতে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন পর নিরিবিলি আলাপের সুযোগ হয়েছিল। সেদিন তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, ছিয়াশি বছর বয়সেও তিনি যেন আশির দশকে আমাদের ছাত্রজীবনের সেই মানুষটিই রয়ে গেছেন। বয়স ও সময়ের নির্মম প্রবাহ তাঁর শরীরকে স্পর্শ করেছে, কিন্তু তাঁর মন, চিন্তা ও কর্মস্পৃহাকে পরাস্ত করতে পারেনি। তিনি তখনও এক প্রাচীন দার্শনিকের মতো নির্মোহ নিষ্ঠায় জীবনকে ধারণ করে আছেন।
কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “একটি জাতীয় লেখক সম্মেলনের উদ্যোগ নিতে পারো।”
আমি বললাম, “আমি তো বেসরকারি মানুষ; আমার সামর্থ্য খুবই সীমিত, স্যার।”
তিনি শান্তভাবে বললেন, “ছোট করে শুরু করো।”
আমি বললাম, “যদি চরনিকেতন, পাবনায় করা যায়, তাহলে আমার জন্য সহজ হয়।”
তিনি বললেন, “হতে পারে। কিছু সেমিনার, প্রবন্ধপাঠ ও আলোচনা হোক; সেই সঙ্গে একটি প্রকাশনাও বের করো। তবু কিছু একটা তো হলো।”
কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, তিনি কেবল একটি অনুষ্ঠানের কথা বলছেন না; তিনি সূচনার কথাই বলছেন। বড় আয়োজনের অপেক্ষায় থেকে অনেক সময় কোনো কাজই শুরু হয় না, অথচ ছোট একটি উদ্যোগই একদিন বড় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে। তাঁর এই সহজ অথচ দূরদর্শী পরামর্শ আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তাঁর ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি নীরবে সেই উদ্যোগ নিয়ে ভাবছিলাম। আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায় আরও গভীর বলে মনে হচ্ছে।
জানি না, সেই সাহস ও উৎসাহ আগের মতো ধরে রাখতে পারব কি না। তবে তাঁর সঙ্গে সব বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ মতৈক্য না থাকলেও, তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
আশির দশকের পর, বিশেষ করে এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর, লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিভাজন ক্রমেই তীব্র হয়েছে। অধিকাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি যারা নির্দল থাকতে চান, তাঁদেরও প্রায়শই কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের খাঁচায় বন্দী করে দেখা হয়। এই বাস্তবতায় দলমতের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় লেখক সম্মেলনের স্বপ্ন দেখার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সাহিত্যিকের প্রথম পরিচয় তাঁর বিবেক, তাঁর মনন এবং তাঁর সৃজনশীলতা; দলীয় আনুগত্য নয়। সম্ভবত সে কারণেই তিনি এমন একটি সম্মেলনের কথা ভেবেছিলেন, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিভেদ থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; আর লেখকের পরিচয় হবে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তায়, কোনো রাজনৈতিক ছাপ দিয়ে নয়।

১৭ মে-র সেই সাক্ষাতের মাত্র তিন দিন আগে, ১৪ মে, ধানমণ্ডি ক্লাবে আমার কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক এক আড্ডায় তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাতটায় এসে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত, রাত প্রায় এগারটা পর্যন্ত, তিনি সেখানেই ছিলেন। ছিয়াশি বছর বয়সে টানা চার ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে একটি সাহিত্যসভায় উপস্থিত থাকা বিরল ঘটনা।
অনুষ্ঠান চলাকালে তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, একটু আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “এটি ঠিক হবে না। আমার মতো অন্যরাও তো ক্ষুধার্ত।”
কথাটি ছিল অতি সাধারণ; কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর সমগ্র জীবনদর্শন। নিজের প্রয়োজনের আগে অন্যের কথা ভাবা, সামান্য একটি সুযোগও কেবল নিজের জন্য গ্রহণ না করা-এ ছিল তাঁর স্বভাব। ছিয়াশি বছর বয়সেও তাঁর এই নৈতিক সংবেদনশীলতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
এর কিছুদিন পর, ২৭ মে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একটি সেমিনারে আমি বক্তব্য রাখি। স্যার সেই অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বারবার আমার আলোচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করছিলেন। তাঁর মুখে নিজের বক্তব্যের পুনরুল্লেখ শুনে আমি কিছুটা সংকোচ বোধ করছিলাম। পাশে বসা এক বক্তাকে আস্তে করে বলেছিলাম, “স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন বলেই হয়তো আমার কথাগুলো এত মনে রেখেছেন।”
এই ঘটনাটি আমাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছিল, তিনি কেবল ভালো বক্তাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন শ্রোতাও। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে অকুণ্ঠভাবে তার স্বীকৃতি দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবেরই অংশ।
আরও একটি স্মৃতি আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে। ২০০৯ সালে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন তিনি। তিনি তখন বিভাগের চেয়ারম্যান। প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে তিনি আমাকে সেখানে প্রবন্ধ পাঠের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। আমার কাছে সেই আমন্ত্রণই ছিল এক বিরাট সম্মান।
কয়েক দিন পরে আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, “তোমার কিছু সম্মানী আমার কাছে আছে।” আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কিসের সম্মানী?”
তিনি বললেন, “সেমিনারে প্রবন্ধ পাঠের।”
এরপর তিনি আমাকে পাঁচ হাজার টাকার সম্মানী দিলেন এবং একটি রসিদে স্বাক্ষর করতে বললেন। আমি বারবার অনুরোধ করেছিলাম, সম্মানীটি না দিলেও চলবে। কিন্তু তিনি অনড় ছিলেন। তাঁর কাছে এটি ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় ছিল না; এটি ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
ঘটনাটি আজও আমার কাছে শুধু একটি অর্থপ্রদানের স্মৃতি নয়। এটি একজন শিক্ষকের পেশাগত সততা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং একজন গবেষক ও লেখকের শ্রমের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৌদ্ধিক শ্রমেরও মূল্য আছে, এবং সেই মূল্য যথাযথভাবে দেওয়া প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁর এই আচরণে আমি শুধু একজন শিক্ষকের সততাই দেখিনি; দেখেছিলাম এমন এক মানুষের চরিত্র, যিনি নীতিকে কখনো সুবিধার কাছে বিসর্জন দেননি।
ক্যাম্পাসের বাইরেও স্যারের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়ে যেত আজিজ সুপার মার্কেটে, বিশেষ করে কথাপ্রকাশ ও জাগৃতি প্রকাশনীর স্টলে। বইয়ের নতুন প্রকাশনা, সাহিত্য, সমাজ কিংবা দেশের চলমান পরিস্থিতি-যে বিষয়ই উঠুক না কেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ কখনো নিছক সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকত না। প্রতিটি কথোপকথনই হয়ে উঠত নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ।
তখনও তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নেমে আসেনি। ২০১৫ সালে তাঁর পুত্র, প্রকাশক দীপন, উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল শুধু একজন প্রকাশকের হত্যাই নয়; এটি ছিল মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিবাদ ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিরুদ্ধে অন্ধকারের পরিকল্পিত আঘাত। সেই ঘটনার পর স্যারের জীবনকে যেন নতুন এক নীরবতা ঘিরে ফেলেছিল।
এই শোকাবহ ঘটনার পর বহুবার ভেবেছি, পরিবাগের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসব। কতবার যে বাসার সামনে গিয়ে আবার ফিরে এসেছি, তার হিসাব নেই। মনে হতো, এমন অসীম শোক বহন করে চলা একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে কী বলব? ভাষা যেন বারবার আমাকে ছেড়ে চলে যেত।
কয়েক বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তখন আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর; তাঁর হাতে ছিল আমার একটি বই। স্যার বইটি দেখতে চাইলেন। সৌমিত্র শেখর কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বইটির এবং লেখকের প্রশংসা করলেন। স্যার তখন এক ধরনের অভিমান মিশ্রিত স্নেহে বললেন, “যাও, তোমরা মজিদকে শিক্ষক হিসেবে নিলে না।”
সৌমিত্রও মৃদু রাগ দেখিয়ে জবাব দিলেন, “স্যার, আপনার কথা আগে প্রত্যাহার করেন। আমরা নিলাম না, নাকি আপনারা নিতে পারলেন না? আমরা তো ভাবছিলাম, মজিদ বিভাগে যোগদান করলে ভালোই হতো।”
কথাগুলো শুনে ২০০৪ সালের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। সে বছর বাংলা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুজাফর। তিনি এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক-দুজনেই আমাকে বিভাগে দেখতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কী এক অদৃশ্য কারণে শেষ পর্যন্ত কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি; এমনকি সাক্ষাৎকারের জন্যও কাউকে ডাকা হয়নি। পরে বুঝেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কাসেম স্যার সেই সংকীর্ণতার অংশ ছিলেন না; বরং সারাজীবন তিনি এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ ও উঞ্ছবৃত্তির ঊর্ধ্বে থেকে চলেছেন।
গত মে মাসের শুরুতে বাংলা একাডেমিতে তাঁর সঙ্গে যখন আবার দেখা হলো, তখনও তিনি সেই প্রসঙ্গটি স্মরণ করেছিলেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের উপস্থিতিতেই তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন। মহাপরিচালক হাসতে হাসতে বললেন, “আপনি জানেন না, স্যার-বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি না হয়ে মজিদ ভাইয়ের যে উপকার হয়েছে, তা হয়তো আপনি জানতে পারেননি।”
কথাটি শুনে আমি কিছুটা লজ্জা পেয়েছিলাম। কিন্তু স্যারের দিকে তাকিয়ে আবারও মনে হয়েছিল, একজন মানুষ নিজের জীবনের গভীর দুঃখ, বেদনা ও অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যেও অন্যের সম্ভাবনা, অন্যের মঙ্গল এবং অন্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত সহজে ভাবতে পারেন! এই উদারতাই তাঁকে আমার কাছে আরও বড় করে তুলেছে।
আজ স্যার আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর প্রশ্ন, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা আমাদের মধ্যেই বেঁচে থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং দেশের ভবিষ্যৎকে ব্যক্তিগত জীবনের বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে নয়, নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে।
তাঁর বাবা-মা তাঁর নাম রেখেছিলেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের নামে। তখন ১৯৪০-এর দশক; শেরে বাংলা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। এ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া গরীব দুখীর নেতা। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, তাঁদের সন্তান যেন মানুষের কল্যাণে, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় এবং সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আজীবন সেই আদর্শ বাস্তবায়নেরই চেষ্টা করে গেছেন।
মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে, কিন্তু আদর্শের নয়। তাই তাঁর মৃত্যুুকেও আমি একেবারে শেষ বলে মনে করতে পারি না। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গ্রন্থে, চিন্তায়, ছাত্রদের স্মৃতিতে, অসংখ্য মানস-শিষ্যের মননে এবং সেই সব মানুষের কর্মে, যাঁদের তিনি স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। মৃত্যুর পরেও তিনি আমাদের শেখাতে থাকবেন- কীভাবে চিন্তা, নৈতিকতা ও কর্মকে একসূত্রে গেঁথে একটি অর্থবহ জীবন নির্মাণ করা যায়।