Published : 16 Jan 2026, 08:52 AM
জুলাই আন্দোলন চলাকালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ট্রাক চালক হোসেন হত্যা মামলায় সম্প্রতি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ।
বিচার প্রক্রিয়া চলার মধ্যে নিহতের মা, মামলার বাদী রীনা বেগম বলছেন, ছেলের মৃত্যুর পর স্থানীয় সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক কাউন্সিলর রাজীবসহ কয়েকজনের কাছে সাহায্য চেয়েও পাননি। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও পারেননি। নানক-রাজীবরা সহযোগিতার হাত বাড়ালে তিনি আর মামলা করতেন না।
জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন হোসেন। আহত হন সাজ্জাদ, শাহিন নামে দুই ব্যক্তিও। হোসেনের মৃত্যুর এক মাসেরও বেশি সময় পর ৩১ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন হোসেনের মা রীনা বেগম।
মামলাটি তদন্ত করে শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করে গত ২৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই আকরামুজ্জামান। গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াস অভিযোগপত্রটি ‘দেখেছেন’ বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।
অপর আসামিরা হলেন—আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক সাংসদ সাদেক খান, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ, তারেকুজ্জামান রাজীব, শেখ বজলুর রহমান; তাদের সহযোগী নুর মোহাম্মদ সেন্টু, তোফায়েল সিদ্দিক ওরফে তুহিন, রহমান মিয়া ওরফে এ কে এম অহিদুর রহমান, পলাশ, ওলিউর রহমান, খলিলুর রহমান, ইমন, এস এম রিয়াজুল হক তামিম, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ওরফে এম এ সাত্তার, পারভেজ ওরফে গোলডেন পারভেজ, সুমন মিয়া ওরফে কাইল্লা সুমন, মিলন হোসেন, সোহেল ওরফে ভূইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, সলিম উল্লাহ সলু, ইরফান, মুহাম্মদ বদিউল আলম ওরফে বদিউজ্জামান, ফুরকান হোসেন, শাহজাহান খান, সাজ্জাদ হোসেন, ফারুক হোসেন অভি, নাইমুল হাসান রাসেল।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তদন্তকালে আসামিদের পূর্বাপর আচরণের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, তারা আন্দোলন দমন করতে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে তারা নেতাকর্মীর কার্যক্রম দেখভাল করতেন। আন্দোলন দমনে তারা গণভবন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করেন, যাতে সর্বশক্তি দিয়ে বল প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত হয়।
মামলার তদন্তকালে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্কতা অভিযোগপত্রে বলেছেন, শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদ্দাম হোসেন, আসিফ ইনান, জুনাইদ আহমেদ পলকরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে জনসম্মুখে বিভিন্ন উস্কানিমূলক ও আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলেন। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে হোসেন মারা যান এবং শাহিন ও জিহাদ আহত হন।
আসামিদের মধ্যে সাদেক খান, পলক, শাহজাহান খান ও ফুরকান কারাগারে রয়েছেন। পারভেজ, সোহেল, সলু, ইরফান, বদিউল, রাসেল, সাজ্জাদ, সুমন, মিলন ও ফারুক হোসেন জামিনে রয়েছেন। শেখ হাসিনাসহ ২০ আসামি পলাতক রয়েছে।
পলকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম বলেন, “যেহেতু অভিযোগপত্র চলে এসেছে, অভিযোগ গঠনের সময় আমরা তার অব্যাহতির আবেদন করব। আদালত অব্যাহতি দিলে তো মামলার কার্যক্রম শেষ।
“আর যদি অভিযোগ গঠন হয়, তাহলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাকে নির্দোষ প্রমাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।”
মামলার বাদী রীনা বেগম বলছেন, তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে হোসেন ছিল মেঝ। মায়ের দেখভাল তিনিই করতেন। ছেলেকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
“খাওন, ওষুধ সব ও দিতো। ছেলেটা চলে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে আছি। ওর জন্য কত যে চোখের পানি ঝরে—আমি আর আল্লাহ জানি। বড় ছেলেটা দিনমজুর, ছোটোটা প্রতিবন্ধী। মেয়েটা পড়াশোনা করছে। সংসারটা অনেক কষ্টে চলে। ঘর ভাড়া দিতে পারি না। আগে আমি কাজ করতাম। অসুস্থ থাকায় কাজ করতে পারি না।”
বিচারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হোসেনের মা বলেন,“বিচার ছাড়া আর কি চামু? আবু সাঈদ যেদিন শহীদ হয়, এর দুই দিন পর আমার হোসেনও শহীদ হয়।
“হাসিনা তো আবু সাঈদের পরিবারের খোঁজ নিছে, টাকা দিছে; আমার তো খোঁজখবর নেয়নি। সাহায্য-সহযোগিতা করলে মামলার বিষয় পরে দেখতাম।”
রীনা বেগম বলেন, “আমার ছেলে ১৮ জুলাই শহীদ হয়। এরপর তাকে গ্রামে নিয়ে কবর দিয়ে আবার ঢাকায় আসি। এরপর নানক, বজলু কমিশনার, আসিফ, রাজীব, সেন্টুর কাছে গেছি। একবার না, সাতবার গেছি। তারা আমার কথা শোনেনি। সবার পিছে পিছে ঘুরছি। কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
“হাসিনার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। তারা যদি আমার একটা ব্যবস্থা করে দিতো, তাহলে আর মামলায় যেতাম না। মামলা করছি, এখন আদালত দেখবে। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হোক। যারা আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিছে, তাদের অবস্থাও যেন এমন হয়।”
হোসেনের সাত বছর ও পাঁচ বছরের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। তাদের নিয়ে তার স্ত্রী বাবা-মায়ের কাছে গাজীপুর অবস্থান করছে বলে জানান রীনা বেগম। হোসেনের মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন তারা। এর মধ্যে রীনা বেগম সাড়ে তিন লাখ টাকা পেয়েছেন বলে জানান। বাকি টাকা পেয়েছেন হোসেনের স্ত্রী।