Published : 10 Oct 2025, 08:34 AM
এক দশকের বেশি সময় আগে ভারতের বিহার রাজ্যের একমাত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা কিষানগঞ্জের একটি সরকারি স্কুলে পড়তেন মুখতার আলম (ছদ্মনাম)।
স্কুলে তার বেশ কয়েকজন হিন্দু বন্ধু ছিল; এর মধ্যে একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি।
তারা দুজন একসঙ্গে বসে লেখাপড়া করতেন; স্কুলের প্রজেক্টের কাজও করতেন একসঙ্গে। বন্ধু যেহেতু নিরামিষভোজী, তাই একসঙ্গে খেতে বসলে মাংস এড়িয়ে চলতেন মুখতার।
কিন্তু বছর দুয়েক আগের একটি ঘটনায় তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে, যা আর ঠিক হয়নি।
দুই বন্ধুর দূরত্বের পেছনে রয়েছে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জিতেনরাম মাঝির এক বক্তব্য।
কিষানগঞ্জে এক সমাবেশে জিতেনরাম বলেন, শেরশাহবাদি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে।
শেরশাহবাদি শব্দটি এসেছে ঐতিহাসিক শেরশাহবাদ অঞ্চল থেকে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকাও পড়েছে।
অনেক ঐতিহাসিকের বিশ্বাস, শেরশাহবাদ শব্দটি এসেছে আফগান রাজা শাহ সুরি থেকে, যিনি ১৬ শতকে মুঘলদের পরাজিত করে স্বল্প সময়ের জন্য বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের (বাংলাদেশসহ) শাসক হয়েছিলেন।
বিহারের বেশির ভাগ মানুষ হিন্দি কিংবা উর্দুতে কথা বলেন। কিন্তু শেরশাহবাদিরা যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে বাংলার সঙ্গে হিন্দি ও উর্দুর একটা মিশেল রয়েছে।
তাদেরকে প্রায়ই ‘বাদিয়া’ (সম্ভবত শেরশাহবাদির সংক্ষিপ্ত রূপ) কিংবা ‘ভাটিয়া’ নামে ডাকা হয়। ভাটিয়া শব্দটি এসেছে ‘ভাটো’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ভাটি বা উজানের বিপরীত।
বলা হয়, শেরশাহবাদিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গার উজানে ভেসে এসে ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারের সীমাঞ্চল এলাকায় বসতি গড়েছিলেন।
মুখতার আলম আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা ভয় পাচ্ছি (জিতেরাম মাঝির বক্তব্যে)।”
ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্পন্ন করা এ শেরশাহবাদি চুপ থাকতে রাজি নন, তিনি মাঝির বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এক ফেইসবুক পোস্টে তুলে ধরেন।
আর পোস্ট দেওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই হিন্দিতে তাকে উদ্দেশ্য করে একজন লেখেন, “আপনারা তো বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী।”
এই মন্তব্যকারী ছিলেন তার সেই ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’।
মুখতার বলেন, “মন্তব্যটি পড়ার সময় আমার শরীরে এক ধরনের শিহরন তৈরি হয়।
“তার ওই বক্তব্য আমাদের সম্পর্কে ফাটল ধরায়। আমাদের পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্ব হারিয়ে গেছে।”
বিহারের প্রায় ১৩ লাখ শেরশাহবাদির মধ্যে মুখতার একজন। বেশির ভাগ শেরশাহবাদির বসবাস বিহারের কিষানগঞ্জ ও কাটিহার জেলায়।
ভারতের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য বিহার গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভার নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই ধাপে ভোট হবে সেখানে; ফল ঘোষণা হবে ১৪ নভেম্বর।
সেখানে কিষানগঞ্জ ও কাটিহার হয়ে উঠেছে ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপির প্রচার-প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর প্রচার-প্রচারণায় কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ ইস্যু বানিয়েছে তারা।

শেরশাহবাদিরাই নিশানা কেন
১৫ অগাস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের দিনে প্রধানমন্ত্রী মোদী দিল্লির লালকেল্লার প্রাচীর থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।
সেদিন তিনি বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করতে ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে।
মোদী বলেন, “কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না। বিশ্বের কোনো দেশই তা করে না। তাহলে ভারত কীভাবে সেটা করবে?”
কারা অনুপ্রবেশকারী, তা স্পষ্ট না করে মোদী বলেন, দেশের সামনে যে ভয়াবহ বিপদ ঘনিয়ে আসছে, তা উচ্চক্ষমতার এ মিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলতে সাধারণত বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।
এই তিন রাজ্যের মধ্যে আসামে ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে মোদীর বিজেপি। সেখানকার রাজ্য সরকার বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বহিরাগত’ তকমা লাগিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে।
আসামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলমান, যা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সবচেয়ে বেশি।
দেশটিতে আসামের চেয়ে বেশি মুসলমান আছে কেবল কেন্দ্রীয় সরকার শাসিত কাশ্মির ও আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপে।
ভারতের সবশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, বিহারে মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৭ লাখের মতো, যা রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার (১০ কোটি ৪ লাখ) প্রায় ১৭ শতাংশ।
এর মধ্যে প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ মুসলমান বসবাস করেন সীমাঞ্চল এলাকায়, যার মধ্যে কিষানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়া অঞ্চলও পড়েছে।
কাটিহার, কিষানগঞ্জ ও পূর্ণিয়ার সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গের সীমান্ত রয়েছে। অন্যদিকে সীমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার।
বিজেপি কখনো বিহারে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। গত ২০ বছরে ধরে সেখানে আঞ্চলিক শরিকদের সঙ্গে জোট হয়ে ক্ষমতায় থেকেছে তারা।
নির্বাচনের সামনে এসে সমালোচকরা বলছেন, বিজেপি এখন সীমাঞ্চলে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বিষয়টি সামনে আনার মাধ্যমে ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে ভোটারদের বিভক্ত করতে চাইছে।
মুখতার আলম বলছেন, গত দুই বছরে তার দুশ্চিন্তা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কারণ মোদী নিজেই এখন শাহবাদিদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচার অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
গত বছর সাধারণ নির্বাচনের আগে পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে মোদী বলেন, “ভোটব্যাংকের রাজনীতি যারা করেন, তারা পূর্ণিয়া ও সীমাঞ্চলকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘাঁটিতে পরিণত করছেন, যা এ অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।”
চলতি বছরেও তিনি বিহারের বিভিন্ন জেলায় বিজেপির সমাবেশে একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
গেল সপ্তাহে পূর্ণিয়ায় মোদী বলেন, “অনুপ্রবেশকারীদের কারণে সীমাঞ্চল ও পূর্ব ভারতজুড়ে আজ বিশাল এক জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হয়েছে।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারীকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।”

‘বাংলাদেশ থেকে দানব এসেছে’
বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে কর্তৃপক্ষ।
আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও দিল্লি থেকে এরই মধ্যে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে, যদিও তাদের অধিকাংশেরই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো বৈধ কাগজপত্র ছিল।
সমালোচকরা বলছেন, এসব অভিযান সরাসরি মুসলমানদের লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে বিজেপির আসাম শাখা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বানানো ভিডিওটির শিরোনাম দেওয়া হয় ‘বিজেপিহীন আসাম’।
৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়, শিগগিরই আসামের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দখলে চলে যাবে। তারা চা বাগান, বিমানবন্দর, খেলার মাঠসহ জনসমাগমের যত জায়গা আছে, সব জায়গা দখল করে নেবে।
ভিডিওতে বলা হয়, মুসলমানরা কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে ‘অবৈধ’ মুসলমান অভিবাসীদের ভারতে নিয়ে আসবে এবং গরুর মাংস খাওয়ার বৈধতা দেবে।
সীমাঞ্চলের মুসলমানরা বলছেন, তাদের কাছে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর’ ভূতটি নতুন কিছু নয়।
তাদের অভিযোগ, বিজেপি বহু বছর ধরে এ অঞ্চলকে ‘হিন্দুত্বের পরীক্ষাগার’ বানানোর চেষ্টা করছে।
‘হিন্দুত্বের পরীক্ষাগার’ শব্দ দুটি প্রথম শোনা যায় মোদীর নিজ রাজ্য গুজরাটে, যেখানে তিনি ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় ২ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল।
আল জাজিরাকে মুখতার আলম বলেন, “কোনো কট্টর হিন্দু নেতা সীমাঞ্চলে এলে আমরা আতঙ্কে থাকি। তিনি আমাদের নিয়ে কী মন্তব্য দেবেন এবং সেটার কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়।”
গত মাসে বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, “বাংলাদেশ থেকে অনেক ‘দানব’ এসেছে। আমরা জানি, এসব দানবকে কীভাবে হত্যা করতে হয়।”
বিহারে শেরশাহবাদি বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারে ভুল কিছু দেখছেন না দলটির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “এর সঙ্গে মেরুকরণ বা নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সত্য যে, সীমাঞ্চলে অনুপ্রবেশের কারণে মুসলমানদের জনসংখ্যা বাড়ছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি।
“অনুপ্রবেশ বন্ধ না হলে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে সীমাঞ্চল বাংলাদেশে পরিণত হবে।”
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক পুষ্পেন্দ্র বিশ্বাস করেন, “সীমাঞ্চলে বিজেপির মেরুকরণের এই রাজনীতি খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না।
“২০২৪ সালে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি একই কৌশল নিয়েছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ, তাদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না। বিহারের ক্ষেত্রেও তাই হবে, কারণ সীমাঞ্চলে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশ করেনি। আর অনুপ্রবেশ করবেই বা কীভাবে; সীমাঞ্চলের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সীমান্তই নেই।”

কয়েক দশকের পুরনো কৌশল
ভারতে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দেওয়া শুর হয় আসামে; গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে।
ওই সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপ ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়িত করার দাবিতে বিক্ষোভে নামে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাজার হাজার মুসলমানকে ভারত থেকে বিতাড়িত করা হয়, নয়ত ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ তকমা দেওয়া হয়।
এ আন্দোলন বিহারে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় নেয়নি। সেখানে বিষয়টি প্রথম সামনে আনে ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ’ (এবিভিপি)। এটি কট্টর-ডানপন্থি ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের’ (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন।
১৯২৫ সালে আত্মপ্রকাশ করা আরএসএসের মূল লক্ষ্যই হলো সংবিধানগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
ভারতে আরএসএসের হাজার হাজার শাখা রয়েছে এবং মোদীসহ বিজেপির অন্যান্য শীর্ষ নেতা এ সংগঠনের আজীবন সদস্য।
আশির দশকের শুরুতে এবিভিপি অভিযোগ তোলে, সীমাঞ্চলে ২০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছে, যাদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা হয়েছে।
আরএসএস নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগঠনটি ভোটার তালিকা পর্যালোচনার দাবি তোলে, যেটা আসামের ক্ষেত্রেও করা হয়েছিল।
ভারতের নির্বাচন কমিশন ১৯৮৩ সালে এবিভিপির দাবি মেনে নেয় এবং ছয় হাজার মুসলমানকে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নোটিস পাঠায়, যাদের সবাই ছিলেন শেরশাহবাদি।
ওই সময় এবিভিপির বিরুদ্ধে যারা লড়েছিলেন, তাদের একজন জাহাঙ্গীর আলম।
ঘটনার স্মৃতিচারণ করে সত্তরোর্ধ্ব এ ব্যক্তি আল জাজিরাকে বলেন, তাদের জমির মালিকানার কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল।
“আমরা একটি ক্যাম্প আয়োজন করলাম, দলিলপত্র সংগ্রহ করলাম এবং একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে রাজ্যের রাজধানী পাটনায় গেলাম।”
পুরো ঘটনাটি এবিভিপির সাজানো ছিল বলে অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর।
সীমাঞ্চলে একই দাবি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যেখানে কয়েকজন বিজেপি নেতা আসামের মতো সীমাঞ্চলেও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) কার্যক্রম চালুর দাবি তুলেছেন।
এনআরসি একটি ডেটাবেস, যেখানে সব ভারতীয় নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো, ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের শনাক্ত করে ভারত থেকে বিতাড়িত করা।
আসামে ২০১৯ সালে এনআরসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং নাগরিক পঞ্জিকা থেকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাদ পড়েন।
কাটিহারের জাংলা তাল গ্রামের বাসিন্দা আকবর ইমাম (ছদ্মনাম) আল জাজিরাকে বলেন, কোন মুসলমানের সম্পত্তি কে দখল করবে, হিন্দুরা সেই হিসাব কষতে শুরু করেছেন।
৪৬ বছর বয়সি এ কৃষক বলেন, “যখন আসামে এনআরসি হলো, তখনও হিন্দুদের মধ্যে ফিসফাস চলছিল, কে কার বাড়ি আর জমিজমা দখল করবে।”

‘সাম্প্রদায়িক বিভাজনের স্বাভাবিকীকরণ’
সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার একটি বিতর্কিত কার্যক্রম চালায় ভারতের নির্বাচন কমিশন।
এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মূলত সীমাঞ্চলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নামের ওই কার্যক্রমে বিহারের প্রায় আট কোটি ভোটারকে ভুগতে হয়। কারণ, ভোটার প্রমাণে তাদেরকে ‘জোরালো’ প্রমাণ হাজির করার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন।
অনেক সমালোচক মনে করেন, মুসলমান ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতেই এসআইআর কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী গত জুলাইয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “এসআইআর শুরুর সাত দিনের মধ্যে কিষানগঞ্জে আবাসিকতার সনদের আবেদন ১০ গুণ বেড়ে গেছে। এর মানে হলো, বাংলাদেশিরা সম্ভবত অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।”
ভারতের নির্বাচন কমিশন ৩০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে বাদ পড়েন প্রায় ৬ শতাংশ ভোটার।
বাদ পড়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হার ছিল মুসলমান অধ্যুষিত কিষানগঞ্জ জেলায়; ৯ মশমিক ৭ শতাংশ। পুরো সীমাঞ্চল থেকে বাদ পড়ার হার ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েন বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের এলাকা— গোপালগঞ্জ থেকে।
শিক্ষাবিদ পুষ্পেন্দ্র মনে করেন, শেরশাহবাদি মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে প্রমাণ করতে বিজেপির এ চেষ্টার পেছনে সীমাঞ্চলের বাইরের ভোটের স্বার্থও জড়িত।
“বিজেপি জানে, সীমাঞ্চলে খুব একটা সুবিধা তারা করতে পারবে না। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা বিহারের বাকি এলাকাগুলোতে হিন্দুদের মেরুকরণের মাধ্যমে ভোটে আসন সংখ্যা বাড়াতে চাইছে।”
‘উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা’
শেরশাহবাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণার সামাজিক প্রভাবও রয়েছে।
যেমন—কিষানগঞ্জে মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
প্রায় এক দশক ধরে কিশানগঞ্জে একটি স্কুল চালান তাফহিম রহমান।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আজকাল প্রায় কোনো হিন্দু পরিবারই তাদের সন্তানদের মুসলমানদের পরিচালিত স্কুলে পাঠায় না “
তিনি জানান, ১০ বছর আগে যখন তিনি এ স্কুল শুরু করেন, তখন প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী হিন্দু ছিল। এখন কমতে কমতে তা ২ শতাংশে নেমেছে। অনেক সচ্ছল মুসলমান পরিবারও এখন সরে যাচ্ছে।
যৌথ ধর্মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে নীরবে সরে যাওয়ার মধ্যে আরও বিপজ্জনক পরিবর্তনের বার্তা রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রতিদিনের জীবনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের স্বাভাবিকীকরণ ঘটছে, যেখানে ভোটের রাজনীতির প্রভাব রয়েছে।”
স্বাস্থ্যখাতেও একই প্রবণতা তৈরি হওয়ার কথা বলছেন বিহারের বাসিন্দারা।
কিষানগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক আজাদ আলম বলেন, “হিন্দু রোগীরা মুসলমানদের পরিচালিত হাসপাতাল, বিশেষ করে শেরশাহবাদিদের হাসপাতালে যেতে অস্বস্তিবোধ করেন।”
চিকিৎসকদের যেসব সমিতি রয়েছে, সেগুলোও প্রায় সময় মুসলমান চিকিৎসকদের পক্ষে দাঁড়ায় না বলে অভিযোগ করেন আজাদ আলম।