Published : 08 Sep 2025, 02:57 PM
লেখক, গবেষক ও মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমরকে শেষ বিদায় জানানো হলো ফুলেল শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে।
সোমবার সকাল ১০টা থেকে বেলা পৌনে ১টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। এ সময় বুদ্ধিজীবী, সরকারের উপদেষ্টা, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ প্রয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা জানাতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “বদরুদ্দীন উমর অসাধারণ একজন মানুষ; তিনি কখনো আপস করেননি। জ্ঞানী ছিলেন, পণ্ডিত ছিলেন।
“তার গবেষণা আমাদের পথ দেখিয়েছে। তিনি কখনো হতাশাবাদীও ছিলেন না। সবসময় আশার পথ দেখিয়েছেন। তার কাজের জন্য আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
৯৪ বছর বয়সী বদরুদ্দীন উমর রোববার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান। পরদিন সকাল ১০টায় তার মরদেহ আনা হয় শহীদ মিনারে; এর আগে থেকেই অনেকে জড়ো হন শহীদ মিনার এলাকায়। পরে সোয়া ১০টা থেকে শুরু হয় শ্রদ্ধা নিবেদন।

শ্রদ্ধা জানাতে এসে কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের আগামী দিনের ইতিহাসের যে বিবর্তন ঘটবে, সেখানে বদরুদ্দীন উমর থাকবেন। আমাদের যে জাতিবাদী ধারা, সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তিনি। বদরুদ্দীন উমর স্রোতে গা ভাসাতেন না; যা বিশ্বাস করেছেন, তা বলেছেন। সেই বিশ্বাস মানুষের পক্ষে।
“এখন বিশ্বব্যাপি শ্রেণি-সংগ্রামের যে লড়াই, তাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে তত্ত্বগত গুরুত্ব অনেক। সেখানে তার ভূমিকা রয়েছেন। ৫ অগাস্টের পর যে নতুন ধারার রূপান্তর, সেখানেও তাকে মনে রাখতে হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাজনীতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সাংগঠনিক চর্চায় বদরুদ্দীন উমরকে পাঠ করতেই হবে।
“তিনি আজন্ম মানুষের পক্ষে গবেষণা করেছেন, রাজনীতির তত্বগত বিশ্লেষণ করেছেন। এই কাজটি তিনি আনন্দ চিত্ত্বেই করেছেন। তিনি বলেছেনও, এমন জীবনই তিনি যাপন করতে চেয়েছেন। ফলে তিনি নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টই ছিলেন।”

বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম।
পরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বদরুদ্দীন উমর আমাদের দেশের একজন খুবই গুরত্বপূর্ণ লেখক ও গবেষক। তার বইগুলো এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ।
“তার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ দিক হল, তার মতাদর্শিক সততা এবং বুদ্ধিজীবীসুলভ সাহস। এই জায়গাটিতে আমাদের গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবীর মধ্যে একজন হবেন। দেশ যখন সংকটে পড়ে তখন বুদ্ধিজীবীরা পথ দেখান। বদরুদ্দীন উমর আমাদের সেই আলোকবর্তিকা, যিনি বার বার এই দেশকে সংকটে পথ দেখিয়েছেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক শাহমান মৈশান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস যে অবিচ্ছেদ্য, এই সম্পর্কটা নির্মোহ এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বদরুদ্দীন উমর।
“তার এই বিশ্লেষণ ও চিন্তা পদ্ধতি তরুণদেরকে প্রভাবিত করে চলেছে কয়েক দশক ধরেই। বদরুদ্দীন উমর এই সময়ে যেমন প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক রূপান্তরেও তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন।”

সরকারের শ্রদ্ধা
অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন।
তাদের মধ্যে মহিলা শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের বলেন, “একজন আপসহীন মানুষ চলে গেলেন। তিনি কখনোই আপস করেননি। তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, বিতর্কও হয়েছে। তিনি নিজের আদর্শে ছিলেন অবিচল। আমাদের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।”
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বলেন, “চব্বিশের অভ্যুত্থানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন যে বুদ্ধিজীবী, তিনি বদরুদ্দীন উমর। তিনি ইতিহাসের সত্য লিখেছেন।

“বদরুদ্দীন উমর সকল পুরস্কারের উর্ধ্বে। আমরা তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কার দিতে চেয়েছি। তিনি আমাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি পুরস্কার নেবেন না।”
এছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে।
রাজনীতিকদের শ্রদ্ধা
জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
এ সময় তিনি বলেন, “বদরুদ্দীন উমর বুদ্ধিজীবী হিসেবে সবসময় ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, শোষকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শোসিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
“আমরা অনেক বুদ্ধিজীবীকে দেখেছি, বুদ্ধিকে বন্ধক রেখে কাজ করতে দেখেছি। তিনি বিবেক-বুদ্ধি বন্ধক রাখেননি। মানুষের মুক্তির পক্ষে থেকেছেন।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুটি কারণে তাকে আমাদের মনে রাখতে হবে। তিনি যে মতাদর্শিক জায়গা থেকে রাজনীতি করেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনি সেই আদর্শে অবিচল থেকেছেন।

“আর তিনি আজীবন মানুষের পক্ষে থেকেছেন, আপস করেননি। বাম ধারার সকল পক্ষের সঙ্গেই তার সুসম্পর্ক ছিল।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরফে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বদরুদ্দীন উমর হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে গেছেন। আমাদের জুলাইয়ে যখন আন্দোলন চলছিল, তখনই তিনি এটাকে অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
“বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর যে ভিত্তি, তা হলো বাহাত্তরের সংবিধান। সেটি বাতিল করে বাংলাদেশকে এমন জায়গায় দাঁড় করাতে হবে, যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া না দিতে পারে। বদরুদ্দীন উমরের কাজকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।”

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী সাংবাদিকদের বলেন, “বদরুদ্দীন উমরকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেই অপরিহার্যতা তিনি তৈরি করেছেন। তিনি শিক্ষকতা করেছেন, গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংগঠন করেছেন।
“তার পার্টি হয়তো নানান কারণে বড় পার্টি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আমরা তার সান্নিধ্য পেয়েছি, তার আদর্শ মানুষের প্রতি নিষ্ঠাবান, জনগণের স্বার্থের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব আছে। ভবিষ্যতেও মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে বদরুদ্দীন উমর প্রেরণা যোগাবেন।”

শ্রদ্ধা নিবেদনকারী দল ও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে- ছাত্র ইউনিয়ন, চিন্তা পাঠচক্র, ভাববৈঠকী, বাংলাদেশ জাসদ, জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন (নরসিংদী), প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ লেখক শিবির, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটি, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ), বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বাংলাদেশ কৃষক ও গ্রামীণ মজদুর ফেডারেশন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, বাম গণতান্ত্রিক জোট, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, মওলানা ভাসানী পরিষদ, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমগীত সাংস্কৃইক প্রাঙ্গণ, জাতীয় গণফ্রন্ট, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), সাম্যবাদী আন্দোলন, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা এবং ডাকসু নির্বাচনের ‘অপরাজেয় ৭১ অদম্য ২৪’ এবং ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল।
শহীদ মিনার থেকে বদরুদ্দীন উমরের মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজার পর জুরাইন কবরস্থানে তার দাফন হওয়ার কথা রয়েছে।