Published : 08 Nov 2025, 09:20 PM
দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর ‘পুলিশের হামলায়’ আহত হয়ে অন্তত ১২৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এর মধ্যে ‘বেশ কয়েকজন’ ভর্তি অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন বলে শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন শিক্ষক নেতা মুহিব উল্লাহ।
তিনি বলেন, “আমাদের শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মুমূর্ষ অবস্থায় চিকিৎসাধীন। আমরা আহতদের তালিকা করছি।”
শনিবার সকাল থেকে শহীদ মিনারে এ তিন দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তারা ‘কলম বিরতি কর্মসূচি’ পালনে মিছিল নিয়ে শাহাবাগের দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করেন। ৪টার দিকে শাহবাগ থানার সামনে তাদের আটকে দেয় পুলিশ।
এসময় পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান, লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাসে কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায় শিক্ষকদের।
এ সময় অনেক শিক্ষক আহত হওয়ার পাশাাশি কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করে শিক্ষক নেতারা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. ফারুক রাত পৌনে ৮টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্তত ১২৫ জন আহত হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে কয়েকজন ভর্তি আছেন। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।”

পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফিরে গিয়ে ‘পুলিশের হামলার’ প্রতিবাদে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন)’ এর সভাপতি মো. আবুল কাশেম।
একই সঙ্গে তিন দাবিতে রাজধানী ঢাকায় তাদের আগের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিও চলতে থাকবে বলে জানান তিনি।
আবুল কাশেম দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষকদের ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচিতে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের দাবি আদায় ও যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত আগামীকাল (রোববার) থেকে সারাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লাগাতার কর্মবিরতি চলবে।
“সারাদেশের শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, প্রত্যেক প্রধান শিক্ষক-সহকারী শিক্ষক সবাই শিক্ষকের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে কর্মবিরতি পালন করবেন।”
দশম গ্রেডে বেতন ছাড়াও প্রাথমিকের শিক্ষকদের বাকি দুই দাবি হল- চাকরির ১০ ও ১৬ বছরে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া নিয়ে জটিলতার নিরসন এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা।
শিক্ষকরা তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করলেও পুলিশের দাবি, কাউকে আটক করা হয়নি।
ডিএমপির উপ কমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বিকাল ৫টায় দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “কিছু আন্দোলনকারী ‘কলম সমর্পণের’ নামে শাহবাগ থানার সামনে জড়ো হয়। আনুমানিক ৪টার সময় আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে একটা দল পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মোড় পার হয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ বাধা প্রদান করলে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
“এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। পুলিশের নির্দেশনা অমান্যকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পরবর্তীতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় সব প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হলেও আন্দোলনকারীরা তা উপেক্ষা করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন।

“পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।”
জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যেসব এলাকায় ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা মেনে চলার জন্য সবাইকে আবার অনুরোধ করা হয়েছে ডিএমপি ডিসির বিবৃতিতে।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে চারটি শিক্ষক সংগঠনের মোর্চার ব্যানারে শিক্ষকরা কর্মসূচি পালন করছেন। ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন)’ ছাড়াও এ এ মোর্চায় আছে,‘প্রাথমিক শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ’, ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি’ এবং ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন-লিপি)’।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এসব বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন।
গত ২৪ এপ্রিল ১১তম গ্রেডে বেতন পাওয়া প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে এবং ১৩তম গ্রেডে বেতন পাওয়া শিক্ষকদের বেতন ১২তম গ্রেডে উন্নিত করার উদ্যোগ নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এ উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন সহকারী শিক্ষকরা।
পরে শনিবার থেকে দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয় ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’।
এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আরেকাংশ ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে একাদশ গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা নিরসন ও শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করতে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছেন৷
এসব দাবি মানা না হলে তারা ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অর্ধদিবস, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২৭ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এ সময়ের মধ্যে দাবি আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা ঘোষণা না এলে পরীক্ষা বর্জন এবং ১১ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও দিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন:
'পুলিশের হামলার' প্রতিবাদে সরকারি প্রাথমিকে কর্মবিরতির ঘোষণা
প্রাথমিক শিক্ষকদের মিছিলে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান, কর্মসূচি পণ্ড