Published : 15 Apr 2026, 08:15 AM
কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারকে বিলের অর্থ দিয়ে দেওয়ার ‘অনিয়মের’ অভিযোগের তদন্ত চলার মধ্যে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে আরেকটি প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে প্রাথমিকভাবে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘কর্তব্যে অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার পর ‘গুরুদণ্ড আরোপযোগ্য অপরাধের’ অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। ওই মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তাকে অন্য একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করায় সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) অন্য কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি।
পিডির দায়িত্ব পাওয়া এই কর্মকর্তা হলেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শওকত আলী। ময়মনসিংহ সড়ক জোনের এ প্রকৌশলীকে ২ মার্চ ‘সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক পৃথক এসএমভিটি লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক করা হয়।
এর আগে কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালে (২০২০ থেকে ২০২২ সাল) তার বিরুদ্ধে ‘নবীনগর-শিবপুর-রাধিকা, আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন’ (আর-২০৩) প্রকল্পে ‘কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে পুরো টাকা ও জামানত ফেরত’ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তখন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয় এবং পরে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
এ মামলা চলার মধ্যেই তাকে নতুন একটি প্রকল্পের পিডি করার অফিস আদেশ দেওয়া হয় ২ মার্চ, যাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সই করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সংস্থাপন-১ শাখার উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলি।
বিভাগীয় মামলা থাকা একজন কর্মকর্তাকে পিডি করার বিষয়ে উপসচিব পলি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভাগীয় মামলা চলমান থাকা অবস্থায় পদায়ন করতে কোনো সমস্যা নেই। উনিতো বরখাস্ত না, মানে এটা হল চলমান। তার বিরুদ্ধে ডিপি চলছে, নিষ্পত্তি হলেও সে শাস্তি পায় নাই।
“এখন কোনো কর্মকর্তার শাস্তি যতক্ষণ পর্যন্ত না হয় তখন পর্যন্ত তাকে পদায়ন করতে কোনো সমস্যা নেই। যদি তার মধ্যে শাস্তি হয়ে যায়, সে তখন ওই পদ ছেড়ে যাবে।”
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারও বলছেন, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা থাকার বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে এর সঙ্গে ‘নীতি-নৈতিকতার’ বিষয়টি যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “সেটা যদি ঠিক না থাকে তাহলেতো কিছু বলার নাই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক এই রেক্টর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশে অনেক কিছুই সম্ভব। এখানে কারও বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ আনা হয়েছে, এখন নতুন সরকার তাকে কীভাবে নতুন দায়িত্ব দিয়েছে, এটার কোনো নীতি নৈতিকতা নিয়ে কথা বলা খুবই কঠিন বিষয়। তাই মনে করি এ বিষয়ে কিছু বলা সমীচীন হবে না।”
এ বিষয়ে প্রকৌশলী শওকত আলী কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।
তবে কারণ দর্শানো নোটিস এবং বিভাগীয় মামলার অভিযোগপত্রের সাতটি বিষয় খণ্ডন করে তিনি জবাব দিয়েছেন। এগুলোতে তিনি কোনো আইন বা বিধি ভঙ্গ করেননি বলে দাবি করেছেন।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে প্রকল্পের অর্থ অনুমোদনসহ সব বিষয়ে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি সঠিক নয় দাবি করে বলেন, এ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সওজের অতিরিক্তি প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সওজের নির্বাহ পরিচালক। তিনি ছিলেন শুধু ‘ক্রয়কারী কর্মকর্তা’ হিসেবে দায়িত্বরত।
এ বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনূল হাসানের তেজগাঁও কার্যালয়ে গিয়ে এবং মোবাইল ফোনে কল ও এসএমএস করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একইভাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে ফোন করার পর এসএমএস দিলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

কী অভিযোগ
কুমিল্লা সড়ক জোনে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত দায়িত্বপালন করেন শওকত আলী। অতিরিক্তি প্রধান প্রকৌশলী হওয়ায় তিনি ওই প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল অনুমোদনকারী ছিলেন বলে বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামায় বলা হয়।
ঠিকাদারকে বিলের টাকা দিয়ে দেওয়ার অনুমোদনের ওই সময়ে প্রকল্পটির পাঁচটি সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কের কিছু কাজসহ আরও কিছু কাজ বাকি ছিল। ২০২১ সালের ৭ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার তথ্য দিয়ে ওই মাসেই ৩০ জুন চূড়ান্ত বিল তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর জামানতের ৫০ শতাংশ অর্থও তুলে নেন ঠিকাদার।
এ বিষয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটির কথা তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২০২৪ সালের ১২ মার্চ কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় প্রকৌশলী শওকত আলীকে।
এতে বলা হয়, “তদন্তে প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কাজের চূড়ান্ত বিল ও জামানতের টাকা ফেরত প্রদানের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এহেন কার্যক্রম সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযাযী গুরুদণ্ড আরোপযোগ্য অপরাধ।”
নোটিসের জবাব পাওয়ার পর ওই বছর ১ অগাস্ট তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়, যেটি এখনও নিষ্পত্তি না হওয়ার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
মামলার অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, তদন্তে প্রকল্পের কাজ ‘অসমাপ্ত থাকা অবস্থায় বিল অনুমোদনের’ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
“অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চূড়ান্ত বিলের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত হওয়া সত্ত্বেও কাজের পরিমাপ ও পরিমাণ যাচাই করার জন্য যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি; আপনার এ ধরনের কার্যকলাপ কর্তব্যে অবহেলার পরিচায়ক হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ২(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ এর শামিল এবং গুরুদণ্ড আরোপযোগ্য অপরাধ।”

প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সঙ্গে নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলাকে সড়ক পথে যুক্ত করতে ৩৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৭ সালে।
প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক এ মহাসড়ক নির্মাণের কাজ ওই বছর ১ অগাস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পটির কাজ পায় রানা বিল্ডার্স লিমিটেড ও আব্দুল মোনেম লিমিটেডের জেভি (জয়েন্ট ভেঞ্চার)।
এটির কাজ ২০২১ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়সীমা দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন করা হয়; মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের পাঁচটির মধ্যে শেষ দুটি প্যাকেজের (প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-৫) কাজ ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। অথচ পুরো প্রকল্পের ‘কাজ শেষ হয়েছে’ তুলে ধরে ২০২১ সালের ২৯ জুন অর্থ পরিশোধ ও জামানত ফেরত দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের সবশেষ প্রকল্প পরিচালক মীর নিজাম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্পটি কিছুটা অসম্পূর্ণ অবস্থায় দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৩০ জুন কাজ সমাপ্ত করে প্রকল্প ক্লোজ করে অন্য দায়িত্বে চলে এসেছি।”
প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার সময় বা এর আগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।