Published : 16 Oct 2025, 12:56 PM
আব্বার অবসর গ্রহণের পর আমরা ফরিদপুর থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসি। সেটা ১৯৭৩ সালের কথা। তখনও বইয়ের নেশা পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। আমার আম্মা ছিলেন বইয়ের পোকা। মফস্বলে থাকতে, এমনকি ঢাকায় আসার পরও, মাকে প্রায়ই লাইব্রেরি থেকে বই এনে দিতাম। এভাবে আস্তে আস্তে বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে শুরু করে। ঢাকায় আসার পর সত্তরের মাঝামাঝি একটা সময় বড় ভাই আমাকে কুয়াশা সিরিজের দুটি বই, কুয়াশা ৩৫ ও ৩৬ কিনে দেন। বই দুটো পড়ার পর সিরিজের বাকি বইগুলোও সংগ্রহের ঝোঁক চাপে। নানা জায়গায় খোঁজ করেও তেমন সুবিধা করতে না পেরে এক বন্ধুকে নিয়ে হাজির হই সেবা প্রকাশনীতে। দেখা গেলো সেখানেও কুয়াশার বেশির ভাগ পুরোনো বইই লাপাত্তা, মানে শেষ হয়ে গেছে। শেষে পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মরতে শুরু করলাম। এভাবে বেশ কিছু বই হাতেও এলো। সেবার তখনকার ব্যবস্থাপক জনাব কুদ্দুসের কাছ থেকেও কয়েকটা কুয়াশা যোগাড় করেছি। সেই সময় ঢাকা স্টেডিয়ামের বইয়ের দোকান আইডিয়াস ও ম্যারিয়েটায় আনাগোনা ছিল আমার। সত্যজিৎ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের বইয়ের ভালো উৎস ছিল দোকানটি। মাঝে মাঝে ওখানে একজন তরুণকে দেখতাম, তাকে বিশেষ করে ইংরেজি বইয়ের প্রতি অগ্রহী মনে হতো। তখন অবশ্য তা নিয়ে মাথা ঘামাতে যাইনি। ধরে নিয়েছি, আমার মতো তিনিও আরেকজন অগ্রজ পাঠকই হবেন। সেবায় নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে তখন কুয়াশার লেখক হাকিম ভাইকে (শেখ আব্দুল হাকিম) দেখেছি, কথাও হয়েছে। তিনি মাসুদ রানার সিংহভাগ বইয়েরও লেখক। তার সাথে ঘনিষ্ঠতা আরও পরের কথা। এমনি একদিন স্টেডিয়ামে দেখা সেই তরুণকে দেখি সাইকেল চালিয়ে সেবায় হাজির। অবাক হলাম, আরে, এখানেও তিনি! আমি অবশ্য তার নামধাম বা উদ্দেশ্যের কথা কিছুই জানি না তখন।
এমনি একদিন সেবায় গেছি, দেখলাম আনকোরা বই পৌঁছেছে ছাপাখানা থেকে। ড্রাকুলা ১; অনুবাদকের নাম: রকিব হাসান। ভাবলাম, এ আবার কে? বাজারে আসার আগেই কিনে নিলাম এক কপি। বাসায় সে বই নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গেলো। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের প্রেত কাহিনী, আমাদের পরিচিত তথাকথিত ভৌতিক গল্প নয় মোটেই। জানলাম, এই রকিব হাসানই সেই তরুণ পাঠক। এরপর রকিব হাসানের বেশুমার বই বেরিয়েছে সেবা থেকে--স্বনামে, ছদ্মনামে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, ভিনগ্রহের মানুষ, শিকার, জঙ্গল, ড্রাগস, মৃত্যুচম্বন, বিদেশযাত্রা, তিমির প্রেম, বিস্মের বিস্ময়। তবে অনস্বীকার্যভাবেই তার সেরা কাজ কিশোরদের জন্যে লেখা তিন গোয়েন্দা সিরিজ। রকিব হাসান মাসুদ রানাও লিখেছেন।
সেবা থেকে আমার প্রথম বই রানওয়ে জিরো এইট বেরোয় ১৯৮৫ সালে। তার আগে ৮৪ সালে সেবা থেকে নতুন কলেবরে বের হতে শুরু করে রহস্য পত্রিকা। শেখ আব্দুল হাকিম ও নিয়াজ মোর্শেদের সাথে পত্রিকার অন্যতম সহকারী সম্পাদক ছিলেন রকিব হাসান। রানওয়ে জিরো এইট বের হওয়ার পর সেবায় যাওয়া-আসার প্রেক্ষাপট বদলে যায়। সেই সুবাদে সেবার অনেক লেখকের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। রকিব হাসান তাদের একজন। রকিব হাসানকে আমার কাছে একজন ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ও স্পষ্টভাষী মানুষ বলে মনে হতো। যা বলার তিনি পরিষ্কার ভাষায়, রাখঢাক না রেখেই বলে দিতেন। কে কি ভাবলো, তোয়াক্কা করতেন না। তার এই গুণ আমার পছন্দের ছিল।
সেবার একজন লেখক হিসাবে তিনি গৌরব বোধ করতেন, নিত্যনতুন আইডিয়া গিজগিজ করতো তার মাথায়। যতদূর জানি সেবার অনেক উদ্যোগেরই উদ্গাতা ছিলেন তিনি। যেমন, রহস্যপত্রিকার কথাই ধরা যাক। রকিব হাসানের চাপাচাপিতেই কাজীদা নতুন করে পত্রিকা বের করতে সায় দিয়েছিলেন। কাজীদার অন্ধভক্ত ছিলেন রকিব।
তখন শুনেছিলাম, সেবার অন্তত তিনজন লেখক, কাজীদা, হাকিম ভাই আর রকিব হাসান টাইপ রাইটারে লেখালেখি করতেন; সম্ভবত তিনিই সবার আগে কম্পিউটারে লিখতে শুরু করেছিলেন। রকিব হাসানের সাথে রহস্যপত্রিকার অফিসে বেশি দেখা হতো। তিনি আর হাকিম ভাই আড্ডায় ছিলেন ওস্তাদ। নানা অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করতেন তারা, কখনও আবার তর্কেও মেতে উঠতেন। চমৎকার ছিলো সেই আড্ডা পর্ব। মাঝে মাঝে স্বয়ং কাজীদা নিচে এসে কিছুক্ষণের জন্যে যোগ দিতেন। তার উপস্থিতি গল্পের আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতো।
রকিব হাসান দেখা হলে প্রায়ই বলতেন, কি, ওয়েস্টার্ন শওকত? এখন কি লিখছেন? বলতেন সিরিজ আকারে বই লিখতে, তাহলে পাঠকদের বেশি সাড়া মিলবে। তবে সিরিজ লেখার আগ্রহ আমার ছিল না।
আমি অন্যান্য প্রকাশনীতে লিখতে শুরু করলে কিছুদিন সেবার কারও সাথে সত্যিকার অর্থে যোগাযোগ রহিত হয়ে গিয়েছিলাম। এক সময় শুনলাম হাকিম ভাই সেবা ছেড়েছেন। কিছুদিন বাদে রকিব হাসানও সেবা ছেড়ে এসেছিলেন। তারপর আবার তার সাথে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বই মেলায় অনিবার্যভাবে তার সাথে দেখা হতো, মেলায় এলে ফোন করতেন তিনি, শওকত, আপনি কোথায়, চলে আসুন অমুক স্টলের সামনে। তারপর দেখা হলে শুরু হতো নতুন-পুরোনো নানা প্রসঙ্গে কথোপকথন।
তিনি বাসাবোয় থাকতে একদিন সপরিবারে তার বাসায় গিয়েছিলাম। ভীষণ খুশি হয়েছিলেন তিনি। আমার মেয়েকে অটোগ্রাফসহ নিজের লেখা বেশ কয়েকটি বই উপহার দিয়েছেন। আমার মেয়ের সাথে ভালোই বাহাস চলতো তার। তিনি বলতেন পাঠক হিসাবে তিনি নাকি ওকে নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন। ও তখন তিনগোয়েন্দায় নেশাগ্রস্ত। কিন্তু রকিব হাসান এক পর্যায়ে সিরিজে ভূতপ্রেতসহ নানারকম বিষয় জুড়ে দেওয়া শুরু করছিলেন, যা অনেক পুরোনো পাঠকেরই পছন্দ হয়নি। আমার মেয়ে তাদের একজন। রকিব হাসানের সাথে দেখা হলেই এপ্রসঙ্গে তর্ক জুড়ে দিতে দেরি করতো না ও। রকিব হাসানের সব যুক্তি অবলীলায় খণ্ডন করতো। ভয়ের কারণ ছিলো সেটাই।
অসুস্থ হওয়ার পর দেখা না হলেও মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো। কিন্তু তার শরীর যে এতটা খারাপ হয়ে গেছে, ভাবিনি। এক পর্যায়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেন, কিন্তু দেখতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। গতকাল (১৫- অক্টোবর, ২০২৫) বিকেলে তার মৃত্যুসংবাদ পেলাম। তার হয়তো কায়িক মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা হিসাবে রকিব হাসান অমর হয়েই থাকবেন কিশোর পাঠকদের জগতে। প্রার্থনা করি, পরম করুণাময় আল্লাহ তার বিদেহী আত্মাকে শান্তি দিন।