Published : 20 Jul 2026, 02:55 PM
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭)-এর মহাগ্রন্থ ‘দি অরিজিন এন্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ (ODBL)- এর ১০০ বছর পূর্ণ হলো এ-বছর। গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয় লেখকের বয়স তখন মাত্র ৩৬। আরো ৫ বছর আগে তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। মুখবন্ধে লেখক জানাচ্ছেন, ১৯২১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তার গবেষণা- সন্ধর্ভ গ্রহণ করে। প্রথমেই লেখকের বয়স নিয়ে আলাপ করার কারণ কতখানি প্রতিভা থাকলে এত অল্প বয়সে এতটা জটিল একটি বিষয় নিয়ে এমন বিশাল একটি গবেষণাগ্রন্থ লেখা যায় সেটা অনুভব করা।
গত ১০০ বছরে বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে, অনিবার্যভাবে এই গ্রন্থটির স্মরণ নিতে হয়েছে। শুধু উদ্ধৃতি হিসেবে নয়, অনেকে এ-গ্রন্থটি থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অনুবাদ করে নিজের নামেও চালিয়ে দিয়েছেন। হয়তো সরাসরি নয়, সারসংক্ষেপ ভাষান্তর করেছেন বা নিজের মতো করে ভাবান্তর করেছেন; কিন্তু, পড়লে বোঝা যায় তথ্যের উৎস- ওডিবিএল। আসলে এ-গ্রন্থটি এমনই শাশ্বত গ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে, পরবর্তী লেখকদের তথ্যের উৎস জানানোরও আর প্রয়োজন পড়েনি, হাজার বছরের বাংলা ভাষার ইতিহাস সামনে আসলেই আমরা বুঝতে পারি তথ্যের নিশ্চিত উৎস- ওডিবিএল।
বইটিতে মূল অধ্যায় আছে মাত্র তিনটা: ভূমিকা, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব। যদি সংযোজন ও সংশোধন এবং বইটিতে ব্যবহৃত বাংলা শব্দের সূচক ধরি তাহলে মোট অধ্যায় পাঁচটা। বইটির প্রস্তাবনা লিখেছেন জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়াসন। সুনীতিকুমার লিখেছেন মুখবন্ধ। মোটামুটি এটুকু হচ্ছে বইয়ের কাঠামো। বিশাল এই বইটি সম্পর্কে বিশদ আলাপে না গিয়ে আমরা আজকে শুধু বইটির ভূমিকা নিয়ে সামান্য আলাপ করব।
ভূমিকাতে আছে মোট ৭৫টা ক্রম, আর পাঁচটা পরিশিষ্ট; সব মিলিয়ে ভূমিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৩৫। মানে আস্ত একটা বই।
১ নং ক্রমেই সুনীতিকুমার জানাচ্ছেন, বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের একটি ভাষা। এটি আর্য শাখার অন্তর্গত এবং ইন্দো-ইরানীয় উপশাখার ইন্ডিক গোষ্ঠীর একটি সদস্য।
২ নং ক্রমে জানাচ্ছেন, ভারতে প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষাতেই সর্বাধিক লোক কথা বলে। তাদের সংখ্যা ৪ কোটি ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৫। ১৯১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এটা জানা যায়। বাংলা প্রদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে।

আমরা এখন জানি, বাংলা বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ভাষা। এটা শুধু যে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে তা না। এটা শত বছর আগেই সুনীতিকুমার জানিয়েছেন, বাংলা তার আশেপাশের ভাষাগুলোর সাথে মিশে যাচ্ছিল। ভারতের অন্য সব আর্য ভাষার মতো বাংলা- যেমন পশ্চিমে উড়িষ্যা, মৈথালী; উত্তর-পূর্বে আসামি, দক্ষিণ-পূর্বে তিব্বতি-বর্মীর অন্তত ৬টি ভাষার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে, তেমনি প্রাচীন ভাষাগুলোর সংমিশ্রণে এখনো তার বিস্তার হচ্ছে।
৩ নং ক্রমে সুনীতিকুমার ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারকে আটটি শাখায় ভাগ করেছেন। এর মধ্যে ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষা-পরিবার আবার তিনটি শাখায় বিভক্ত: ইরানিক, দারদিক ও ইন্ডিক। এই ইন্ডিক ভাষা বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধ্রুপদি আর্যভাষার উৎপত্তি। সেই আর্যভাষার বহু বহু বিবর্তনের ফল প্রাকৃত, সেই প্রাকৃতরও বহু বহু অপভ্রংশের পরে প্রাচীন বাংলা ভাষার উৎপত্তি আনুমানিক ১১০০ খ্রিস্টাব্দে। তার যে কত শাখা-প্রশাখা, পরিবর্তন-বিবর্তন তার কোনো লেখাজোখা নেই।
এখন এই প্রতিটি শাখার বিবরণ বা ক্রমানুযায়ী ক্রমের সারসংক্ষেপ প্রকাশ আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বইটির ভেতরে প্রবেশের জন্য একটু ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে আমরা বোঝাতে চাই বাংলা ভাষার স্বরূপ অনুসন্ধানের জন্য সুনীতিকুমার কতদূর গেছেন!
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যদিও আমাদের জানিয়েছেন, ভাষার ইতিহাস জাতির ইতিহাস নয়; কিন্তু, ওডিবিএল-এর সূত্র ধরে আমরা জানতে পারি জাতির ইতিহাস তার ভাষারও ইতিহাস। আর এ-ক্ষেত্রে সুনীতিকুমার ভারতের অন্যান্য ভাষাগুলোর উৎপত্তির ইতিহাসও সংক্ষেপে আমাদের জানিয়েছেন। সুনীতিকুমার দেখিয়েছেন যে, একটি ভাষার বিবর্তন কেবল ধ্বনি, শব্দ বা ব্যাকরণের পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; বরং তা সেই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং জাতিগত বিবর্তনেরও ইতিহাস। একটি জাতির চিন্তা, বিশ্বাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, অর্থনীতি, ধর্ম, রাষ্ট্রব্যবস্থা- সবকিছুর প্রতিফলন ভাষায় ঘটে। ফলে ভাষার ইতিহাস অনুসন্ধান করলে সেই জাতির অতীত জীবনের নানা তথ্যও জানা যায়। সুনীতিকুমার কথাটা সরাসরি বলেননি, কিন্তু তার আকর গ্রন্থটি পাঠ করে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ বুঝতে হলে কেবল ভাষাতত্ত্ব জানলেই হবে না; বাংলার মানুষের জাতিগত গঠন, আর্য ও অনার্য জনগোষ্ঠীর মেলবন্ধন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, ধর্মীয় আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশও জানতে হবে। বাংলার আদিম অধিবাসীরা ছিলেন অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, তিব্বত-বর্মী প্রভৃতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ। পরে আর্যদের আগমন ঘটে। এই আর্যায়ন প্রক্রিয়া কয়েক হাজার বছর ধরে ধাপে ধাপে হয়। পণ্ডিতদের মতে, সুনীতিকুমার যেমনটা জানিয়েছেন তার ভূমিকার ২৪ নং সূত্রে, ভারতে আর্যদের প্রথম আগমন ঘটে ১৫০০ খ্রিস্ট পূর্বে, যখন বেদগুলো রচিত হচ্ছিল। ঠিক কী কারণে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল তার সঠিক কারণ জানা যায় না, হয়তো ভূমি-অধিকার করতেই। ইন্দো-আর্যরা বৈদিক হিন্দু-সভ্যতার প্রতিষ্ঠা করলেও এ-অঞ্চলে তখনই একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ছিল। এই সংস্কৃতি থেকেও ইন্দো-আর্যরা অনেকে উপাদান গ্রহণ করেছে। যে-আর্যায়ন প্রক্রিয়া শত শত বছর ধরে সমগ্র্র ভারত জুড়ে ছড়িয়েছে, তার প্রভাব সমস্ত ভাষা-জাতির ওপরই পড়েছে। এটিকে বাদ দিয়ে যেমন ভাষার, তেমন জাতির ইতিহাসও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। একটি জাতির জীবনযাত্রা, জাতিগত মিশ্রণ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ধর্মীয় পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য- সবকিছু ভাষার মধ্যে সংরক্ষিত থাকে। এই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে যে বাঙালি জাতির সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব বাংলা ভাষায়ও পড়ে। সেই প্রাচীন বৈদিক ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে নব ভারতীয় আর্য ভাষা, চর্যাপদের সময়কাল (৯৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ) হয়ে ভারতে, বাংলায় মুসলমানদের আগমন, এবং ইরান-তুরান-আফগান-পাকিস্তানের মুসলমানদের প্রভাবে বাংলা ভাষা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তারও একটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সূক্ষ্ণ ধারাবাহিক রূপ সুনীতিকুমার প্রদান করেছেন। আমরা এখন মোটাদাগে যেটাকে বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশ হিসেবে জানি- বৈদিক সংস্কৃত → ধ্রুপদি সংস্কৃত → মাগধী প্রাকৃত → মাগধী অপভ্রংশ → অবহট্ট → প্রাচীন বাংলা → মধ্য বাংলা → আধুনিক বাংলা- সুনীতিকুমার দেখিয়েছেন এর মধ্যে বহু বহু সূক্ষ্ণরূপ রয়েছে। এর একটি রূপ থেকে অরেকটি রূপের বিকাশ দুচারদিনের কথা নয়, হুট করেই এর পরিবর্তন হয়নি, অন্য ভাষা-সংস্কৃতির মিশ্রণে কালে কালে হয়েছে, পরিবর্তিত হবার পরও আগের রূপ রয়ে গেছে- ধ্বনিতে, অর্থে।
চর্যাপদের সূত্র ধরেই লেখক দেখিয়েছেন ভাষার মধ্যে কীভাবে ধর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। চর্যাপদের কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। তাদের বৌদ্ধ গান বা দোঁহা খুঁজে না পাওয়া গেলে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদের্শনও খুঁজে পাওয়া যেত না। ঠিক তদ্রুপ চন্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনও মধ্য বাংলা যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকেই নতুন বাংলা ভাষার একটা ব্যাকরণগত ধারণা পাই আমরা। তারপর এসেছে বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল, অন্যান্য মঙ্গলকাব্যগুলো। ১৮০০ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ, আধুনিক বাংলা ভাষা বিকাশের আগ পর্যন্ত, মুসলমানদের আগমনের ফলে ভাষা-সংস্কৃতি-রাজনীতির ওপর যে-প্রভাব পড়েছে তাও সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন সুনীতিকুমার।
এখানে আমার বলার কথা এটুকুই যে, এই ইতিহাসটুকু না জেনে বাংলার ভাষার ইতিবৃত্ত আমরা বুঝতে পারব না। বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানতে হলে, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হলে, এবং ভাষার হাত ধরে এই জাতিকে জানতে-বুঝতে ও ভালোবাসতে হলে এই ইতিহাসটুকু পাঠ থাকা জরুরি। আজকের বাংলাদেশে, বাংলা ভাষার এক প্রকার মুসলমানীকরণ-প্রক্রিয়া চলছে। অনেক বাংলা শব্দ বাদ দিয়ে আরবি শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। তা বাড়ুক, এটা হয় নানা কালে নানা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এটা বিগত কয়েক শতাব্দী ধরেই হয়েছে। আধুনিক বাংলা ভাষা বিকাশে মুসলমানদের অবদান অনেক। কিন্তু, পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, ওই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্যগুলো না বুঝলে আমরা বাংলা ভাষার বিকাশ বুঝব না। বাংলা ভাষার ইতিহাস না বুঝলে এই অঞ্চলের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার পরিবর্তনও বুঝব না। শত বছর আগে লেখা হলেও দি অরিজিন এন্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ (ওডিবিএল) আজও খুব প্রাসঙ্গিক। শুধু ভাষার ইতিহাস হিসেবে নয়, ধর্ম-সংস্কৃতি-রাজনৈতিক ইতিহাস হিসেবেও। ভাষার ইতিহাস বাদ দিয়ে কোনো ইতিহাসই আসলে আলোচনা করা যায় না।