শতবর্ষে ওডিবিএল এবং বাংলাদেশের ভাষাবিজ্ঞানে এর প্রাসঙ্গিকতা
“এটি একটি শিক্ষাগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যার পরিণতি সুদূরপ্রসারী। যে বই উদ্ধৃত হয় কিন্তু পঠিত হয় না, সে বই একটা সময়ে তথ্যনির্দেশের গ্রন্থে পরিণত হয়। তথ্যনির্দেশ ডেকে আনে শুধুই উদ্ধৃতি, আর কেবল উদ্ধৃতি রুদ্ধ করে দেয় সমালোচনার পথ।”
মাশরুর ইমতিয়াজ
শুরুর কথার বদলে উঠে আসা প্রশ্ন
আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেন দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ বা ওডিবিএল [The Origin and Development of the Bengali Language (ODBL)]। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত এই বইটি ছিল দুই খণ্ডে বিভক্ত, মূল পাঠ্যাংশই প্রায় ১,১০০ পৃষ্ঠা। এর শুরুটা হয়েছিল একটি অভিসন্দর্ভ হিসেবে, যা ১৯২১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহীত হয়েছিল। এরপর পাঁচ বছরের পুনর্লিখন ও মুদ্রণের ভেতর দিয়ে সেটি পরিণত হয় আমাদের বাংলা ভাষা নিয়ে লেখা অন্যতম এক প্রভাববিস্তারী গ্রন্থে। একাডেমিক সংক্ষেপনের স্নেহমাখা নির্মমতায় আমরা প্রায়শই একে ডেকে থাকি ওডিবিএল নামে। যেহেতু প্রকাশকালীন শতবর্ষ, তাই এখন চেনা আনুষ্ঠানিকতাগুলোকে আমাদের আমন্ত্রণ জানাবে যা হয়তো অমূলক নয়। হতে পারে বেশ কিছু সেমিনার হবে, তর্ক-বিতর্ক-কুতর্ক ইত্যাদির সন্নিবেশ দেখা যাবে, আর হতেও পারে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হবে। তবে এই লেখাটির অবতারণা এমন এক শ্রদ্ধার্ঘ্যের জন্য যেটি প্রাসঙ্গিক হলেও কিছুটা অস্বস্তিকর। বেশ কিছুদিন ধরেই আমি এই বইয়ের দুই খণ্ডের সূচনা-পৃষ্ঠাগুলো আবার পড়ছিলাম। ভূমিকা, মুখবন্ধ, আর রূপতত্ত্ব খণ্ডের প্রথম অধ্যায় সেই মনোযোগের প্রতিদানও দিয়েছে উদারভাবে। একইসঙ্গে, উঠে আসতে থাকে সেইসব কঠিনতর প্রশ্নসমূহ যেগুলো আমরা প্রায়শই এড়িয়ে যাই। বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল একটি ভাষার রাজনৈতিক সত্যের ওপর, একথা খুব একটা অস্বীকার করার জো নেই। তাহলে সেই ভাষার এখন পর্যন্ত অন্যতম এবং বিশদতম বৈজ্ঞানিক বিবরণটি কেন আজও একশো বছরের পুরোনো একটি বই, যা লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে, ছাপা হয়েছিল কলকাতা আর লন্ডনের প্রেক্ষিতে, আর আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছিল গ্রিয়ারসনের ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক জরিপে — এ প্রশ্নের উত্তর কিছুটা খুঁজতেই এই লেখার প্রয়াস; এবং ওডিবিএল কেন আজও প্রাসঙ্গিক, এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে তিনটি। প্রশ্নোত্তরের এই সন্ধানী আলাপে আমরা সেই উত্তরগুলোকেই যাচাই করতে চাই।
সম্ভাব্য উত্তর এক: যে-বইয়ের কোনো উত্তরসূরি এখনও আসেনি
ওডিবিএল-এর প্রাসঙ্গিকতার প্রথম উত্তরটি সুস্পষ্ট। সত্যি বলতে, এই বইয়ে বাংলা ভাষার যে ভাষাতাত্ত্বিক বিবরণ-বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে তা অতিক্রম করার মতো কিছু আজও লেখা হয়নি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন ইন্দো-আর্য থেকে মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশ হয়ে আধুনিক উপভাষা পর্যন্ত বাংলার যাত্রাপথ অনুসরণ করেছিলেন নিখাদ বিদ্যায়তনিকভাবে। এই কাজ তিনি করেছিলেন এমন এক ভাষাতাত্ত্বিক পূর্ণতা নিয়ে, যে মাপে আর কোনো গবেষক পরে হাতই দেননি। মজার ব্যাপার হলো, নিজের পূর্বসূরিদের সম্পর্কেও তিনি এ কথা জানতেন। ভূমিকায় তিনি তাঁর আগের গবেষণাক্ষেত্রটি জরিপ করেছেন ভদ্র কিন্তু স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে। তিনি লক্ষ্য করেছেন নির্মোহভাবেই, প্রকৃত অর্থে বাংলার কোনো ঐতিহাসিক ব্যাকরণ বাংলা ভাষায় কখনোই ছিল না। তিনি আরও জানিয়েছেন, আর্নেস্ট ট্রাম্প যেমন সিন্ধির জন্য বা ড. এস. এইচ. কেলগ যেমন হিন্দির জন্য লিখেছিলেন, তেমন কোনো গ্রন্থ কোনো ইউরোপীয় গবেষকও বাংলার জন্য লেখেননি। তদুপরি তাঁর অভিযোগ ছিল, ক্ষেত্রটি পরিণত হয়েছিল সেইসব শৌখিন ভাষাতাত্ত্বিকদের বিচরণক্ষেত্রে, যাঁরা ঐতিহাসিক ব্যাকরণ সম্পর্কে অজ্ঞতা পুষিয়ে নিতেন সেটির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা দিয়ে। তাঁর সুতীব্র বাক্যটি বরাদ্দ ছিল পণ্ডিতি ঐতিহ্যের জন্য যেখানে তিনি লিখেছিলেন, সংস্কৃতের বিস্তৃত ব্যাকরণ ‘বাংলা ব্যাকরণের ছদ্মবেশ’ ধারণ করে আছে, যেখানে খাঁটি বাংলা রূপগুলোকে দেগে দেওয়া হয়েছে অসাধু বলে, আর পাশে বসানো হয়েছে সংস্কৃত থেকে ধার করা তথাকথিত সাধু রূপ। বাক্যটি লেখা হয়েছিল একশো বছর আগে, তবু ব্যবহারিকতায় বা বিদ্যায়তনের বিভিন্ন প্রসঙ্গে অতি বিশুদ্ধতাবাদীদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, এমন বাংলাদেশি ভাষাবিজ্ঞানীরাও এই বাহাসের সাথে নিজেকে একাত্ম করতে পারেন অনায়াসেই।
ওডিবিএলের ভূমিকাটি আরও একটি ব্যক্তিগত গল্পও বলেছে, আর ২০২৬ সালে বসে সেটি পড়তে গিয়ে আমার কাছে তা এক নিঃশব্দ অথচ বেশ জরুরি স্মৃতিকথা। আচার্য সুনীতিকুমার স্মরণ করছেন, মাতৃভাষার ইতিহাস অনুসন্ধানের ভাবনাটি তাঁর মাথায় প্রথম আসে কলকাতায় এমএ পড়ার সময়, অবশ্য তখন তিনি বাংলা পড়ছিলেন না। তিনি পড়ছিলেন ইংরেজিতে এমএ পরীক্ষার জন্য, আর তাঁর পাঠ্য বিষয় ছিল প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজি এবং ইংরেজি ভাষার ইতিহাস। ইংরেজির ওপর প্রযুক্ত আধুনিক পদ্ধতিগুলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, আর তাঁর আগ্রহ ‘আকুল হয়ে’ ঝুঁকে পড়েছিল নিজের ভাষার দিকে। অন্য কথায়, বাংলার বৈজ্ঞানিক চর্চার রাস্তাটি গিয়েছিল তৎকালীন উপনিবেশি ভাষার ভেতর দিয়ে। সুইট, স্কিট আর ইয়েসপার্সেনের হাত ধরে তিনি পৌঁছেছিলেন মাতৃভাষা বাংলায়। পরে ভারত সরকারের বৃত্তি তাঁকে নিয়ে যায় লন্ডন ও প্যারিসে। সেখানে তিনি ধ্বনিবিজ্ঞান শেখেন ড্যানিয়েল জোনসের কাছে, যাঁকে তিনি ডাকতেন নিজের শিক্ষাগুরু বলে। মেইয়ের কাছে দীক্ষা লাভ করেছেন, বার্নেটের সঙ্গে পড়েছিলেন প্রাকৃত, আর গোটা পরিকল্পনাটি সাজিয়েছিলেন জুল ব্লকের মারাঠি বিষয়ক গ্রন্থের আদলে। বিদেশে প্রশিক্ষিত হয়ে ভাষা বিষয়ে ইংরেজিতে বা ইংরেজি নিয়ে বাংলায় লেখেন এমন একজন বাংলাদেশি শিক্ষকের কাছে এই শিক্ষালাভের সামগ্রিক গুরু-শিষ্যের পরম্পরাটি ক্ষেত্রেবিশেষে অস্বস্তিকরও মনে হতে পারে। মূলত জ্ঞানের যে ঔপনিবেশিকতাকে আমরা আজ তত্ত্বায়িত করি, সুনীতিকুমারের কাছে এই পরিভ্রমণ ছিল এক শিকড়সন্ধানী গবেষণার নিরলস পূর্বপ্রস্তুতি। ভূমিকার আরও দুটি ছোট তথ্য উল্লেখ করা দরকার। প্রথমত, সুনীতিকুমার লিখেছেন, ভাষার সমস্যাগুলোকে বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে আক্রমণ করা প্রথম বাঙালি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর প্রমাণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন কবির ধ্বনিতত্ত্ব ও ধ্বন্যাত্মক শব্দ বিষয়ক প্রবন্ধগুলো। দ্বিতীয়ত, পরামর্শের জন্য যাঁদের তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
ভূমিকায় আরেকটি তরল পরিহাসও আছে বটে, যা অনেকটা বিস্মৃতই হয়েছে এখন — পুনর্পাঠে সেটি আবার আমার স্মরণে এলো। নিজের পদ্ধতি নিয়ে সুনীতিকুমার বিস্ময়কর বিনয়ী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর বইয়ে কোনো বড় দাবি তোলা হয়নি, কোনো চমকপ্রদ তত্ত্বও হাজির করা হয়নি। তাঁর দাবি কেবল এটুকু যে, তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের স্বীকৃত পদ্ধতিগুলো বাংলার ইতিহাসে প্রয়োগ করেছেন। এমনকি তিনি শেষ করেছেন একটি গ্রিক প্রবাদ দিয়ে, যার মর্ম হলো ‘বড় বই মানেই বড় উৎপাত’। ফলে এই বইটি যা কি না পরবর্তীতে একটি প্রবাদ-প্রতিম নমুনা কিংবা বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের প্রায় প্রামাণ্যগ্রন্থে পরিণত হলো, সেটির লেখক নিজেও কখনো প্রবাদ-প্রতিম নমুনা বা প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসেবে পরিচিতি চাননি। ওডিবিএল খুব সম্ভবত বাংলার ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ব্যাকরণের দিকে একটি প্রাথমিক নিবন্ধের প্রথম প্রয়াস হতেই চেয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে এই প্রথম প্রয়াস উত্তরসূরিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলা ভাষার ভবিষ্যতের ব্যাকরণকে আরও ঋদ্ধ করতে। আজ একশো বছর পরে ঢাকায় বসে, আমরা জুগিয়েছি কেবল বয়ান বা চর্বিত চর্বণের একঘেয়ে চর্চা। আমাদের বাংলা একাডেমি আছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আছে। ভাষার নামে উৎসর্গীকৃত একটি সরকারি ছুটির দিনও আছে। এত কিছুর পরও আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনা করেনি, যা ওডিবিএলকে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থের বদলে সমসাময়িক বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ক গবেষণার পূর্বসূরিতে পরিণত করতে পারে। সেই অর্থে, এই প্রকাশনার শতবর্ষকে উদযাপনের সময়রেখার হিসেবে না মেপে, আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত না রেখে, আমাদের আগামীর গবেষণাকর্মের অভিমুখ কেমন হবে সেই দিকনির্দেশনার একটি স্মরণসূচক হিসেবে ভেবে নেয়ার দায় থাকে।
সম্ভাব্য উত্তর দুই: যে-বই আমাদের ভাষাতাত্ত্বিক তর্কগুলো আগেই আঁচ করেছিল
এই লেখার শতবর্ষী প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরটিও কৌতূহলোদ্দীপক। ওডিবিএল সমকালীন, কারণ বাংলাদেশের ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় আজ যে বিতর্কগুলো বেশ তর্কের রেশ টিকিয়ে রাখে, যেসব আলোচনায় মত-দ্বিমত-ভিন্নমতের সন্নিবেশন আমরা এখনও দেখি, সেগুলোর হদিস আমরা এই বইয়ের ভেতরে সংক্ষিপ্তাকারে বা কখনো একেবারে স্পষ্টাক্ষরে প্রত্যক্ষ করি। প্রথমে সেই প্রশ্নটি ধরা যাক, যেটির উত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের এতো বছর পরেও অনেকটাই অনির্ধারিত। সিলেটি, চাটগাঁইয়া আর রংপুরি কি বাংলার উপভাষা, নাকি ভাষাতাত্ত্বিক সত্তা নিয়ে এক-একটি পৃথক ভাষা? সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জাতীয়তাবাদী তর্কের কোনো পক্ষেই দাঁড়িয়ে নেই, তেমন নজির আমরা তাঁর দেয়া বিবরণেই পেয়ে থাকি। তাঁর ওডিবিএল-এর বিবরণে আঞ্চলিক ভাষারূপগুলো একটি অভিন্ন উৎস থেকে অনেকটাই স্বাধীনভাবে প্রবাহিত। তিনি স্পষ্টতই অস্বীকার করেছিলেন যে এসব আঞ্চলিক ভাষা সাধু ভাষার বংশধর, কারণ সাধু ভাষাকে তিনি দেখতেন সাহিত্যিক নির্মাণ হিসেবে, কারও মাতৃভাষা হিসেবে নয়। অসমিয়া নিয়ে তাঁর মন্তব্যগুলোও একই দিকে ইশারা করে। তাঁর নিজের প্রমাণেই, বাংলা আর অসমিয়ার সীমারেখা আসলে একটি নিরবচ্ছিন্ন ভাষাবলয়ের ওপর টেনে দেওয়া রাজনৈতিক দাগ। অসমিয়ার জায়গায় সিলেটি বসিয়ে দিলেও এ কথার ভিন্নতা কিন্তু হয় না, বরং তাঁর বিশ্লেষণ তখন কোনো সংশোধন ছাড়াই সমকালেরই বর্ণনা হয়ে ওঠে।
রূপতত্ত্ব অংশটি এই যুক্তিকে সাধারণীকরণ দিয়ে নয়, বরং ওডিবিএলের অধ্যায়সমূহ থেকেই পোক্ত করে। প্রথম অধ্যায় থেকে একটি ছোট দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। ‘কাঁদন’, ‘দেখন’ প্রভৃতি শব্দসমূহ গড়ে তোলে যে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের প্রত্যয়, সেটির আলোচনায় চট্টোপাধ্যায় একটু ধীরেই ভাষামানচিত্রজুড়ে তার অসম জীবনযাত্রা লক্ষ করেছেন। তিনি লিখছেন, প্রত্যয়টি কলকাতার চলিত বুলিতে খানিকটা সেকেলে হয়ে আসছে, অথচ ‘পূর্ববঙ্গীয় উপভাষাগুলোতে এটি অত্যন্ত জীবন্ত একটি রূপ’ [‘a very living form in the East Bengali dialects’]। প্রত্যয়ের দীর্ঘ তালিকার ভেতরে পর্যবেক্ষণটির দখলে কয়েকটি বাক্যমাত্র। অথচ সেটি আমাদের অঞ্চলের গোটা সমাজভাষাতাত্ত্বিক পরিস্থিতিকে সংক্ষিপ্তাকারে ধারণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষারূপ, সেই চিহ্নবদ্ধ মান ভাষা তখনই সেইসব ক্রিয়া-রূপ ঝরিয়ে ফেলছিল, যেগুলো পূর্ববঙ্গের মানুষ রোজই ব্যবহার করত। সেই সময়ের এক অঞ্চলের মান ভাষা যা ঝরিয়ে ফেলেছে, পুবের ভাষারূপ তা ধারণ করেছে — এবং দেখা গিয়েছে, এমন পূর্ববঙ্গের ভাষাকে অশুদ্ধ বা ভুল ভাষার নমুনা বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই ভাষিক বিচ্যুতিটুকু লিপিবদ্ধ করেছিলেন নিরপেক্ষভাবে, রূপতত্ত্বের একটি উপাত্ত হিসেবে। এমনকি, এক শতাব্দী পরে আমরা বাস করছি তারই রাজনীতির ভেতরে।
এবার আসা যাক স্তরভাষার (substrate) প্রশ্নে, যা সরাসরি আমার নিজের গবেষণার মাঠকর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এখনও প্রত্যক্ষ করা যায় রাজশাহী বা বরেন্দ্র অঞ্চলের মুন্ডা-ভাষী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। রূপতত্ত্বের সূচনা-অধ্যায়টি বাইরের দিক দিয়ে প্রত্যয়ের (suffix) এক অতি সরল তালিকা (inventory)। কিন্তু গভীরতর আলোচনায় সেটি বারবার আর্য ভাষাপরিবারের সীমানার বহিঃপরিসরে ইঙ্গিত করে। বাংলা ‘কামার’ শব্দটিকে চট্টোপাধ্যায় পালি ও বৈদিক হয়ে জুড়ে দিয়েছেন এক সম্ভাব্য দ্রাবিড় উৎসের সঙ্গে। প্রশিলুস্কিকে অনুসরণ করে তিনি আমাদের ‘পান’-সংক্রান্ত শব্দভান্ডারের পেছনের প্রাচীন শব্দটিকে গণ্য করেছেন অস্ট্রিক উৎসজাত বলে। তদুপরি ‘চমক’ জাতীয় শব্দের বহুল প্রত্যয়টি পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি জুল ব্লকের সেই প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়েছেন, যেখানে দ্রাবিড় কণ্ঠ্য-প্রত্যয়ের (velar suffix) প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। এমনকি তিনি অসম্ভব মনে করেননি যে উত্তর ভারতের দ্রাবিড় উপভাষাগুলোতে, যেগুলোকে পরে ইন্দো-আর্য বুলি সরিয়ে দেয়, এমন একটি প্রত্যয় একদা সুস্পষ্টভাবেই বিদ্যমান ছিল। এসব মন্তব্য সাবধানী এবং শর্তসাপেক্ষও বটে; তবুও এটি বলতেই হবে যে, একেকটি প্রত্যয়ের স্তরেও চট্টোপাধ্যায় এই ভূখণ্ডের অনার্য জনগোষ্ঠীগুলোকে বাংলার ইতিহাসে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের উপাত্তেই, এই বদ্বীপের ভাষিক ইতিহাস কোনো আর্য স্বগতোক্তি নয়। সাঁওতালি, কোল, খাড়িয়া আর মাল পাহাড়িয়া ইত্যাদি ভাষার প্রামাণ্যকরণের কাজ যাঁরা করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই এটি একশো বছর আগেই পাওয়া এমন এক বিদ্যায়তনিক ছাড়পত্র, যাকে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের নিরিখে আমরা এখনও পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে সক্ষম হইনি।
সম্ভাব্য উত্তর তিন: যে-বইকে এখন পড়তে হবে তার নিজেরই প্রতিপাঠ হিসেবে
এই তৃতীয় উত্তরটিই হয়তো অস্বস্তিকর আলোচনার জন্ম দেবে, অথচ ঠিক এখানেই বইটি সবচেয়ে বেশি সমকালীন। ওডিবিএল প্রাসঙ্গিক সমালোচনার বিষয়বস্তু হিসেবেও, আর সেই সমালোচনা শুরু করতে হবে মুখবন্ধ থেকে। বইয়ের সূচনায় ভারতের ভাষাতাত্ত্বিক জরিপের পরিচালক স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন প্রকাশ্যে এই কর্মের শুভকামনা জানিয়েছেন। ভাষাগতভাবে মুখবন্ধটি বেশ উদার, আবার একইসঙ্গে ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের একটি সুস্পষ্ট দলিল। গ্রিয়ারসন ক্ষেত্রটিকে বেঁধেছেন এক স্থাপত্যবিদ্যার রূপকে — যেখানে ইট ছাড়া তুলনামূলক ব্যাকরণের প্রাসাদ ওঠে না, আর সেই ইট তৈরি হয় প্রতিটি ভাষার নিজস্ব উপাত্তের মাধ্যমে। এই স্থাপত্যরূপী ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোয় চট্টোপাধ্যায় হলেন উৎকৃষ্ট ইটের জোগানদার। এরপর গ্রিয়ারসন তাঁর যে প্রশংসা করেছেন, তা কিছুটা ধীরে পড়ার দাবি রাখে। দেশি একজন পণ্ডিত হিসেবে মাতৃভাষা বাংলায় গভীর দখলের সুবাদে সুনীতিকুমার এমন ভাষাউপাত্ত জড়ো করতে পেরেছেন যা কোনো ইউরোপীয়ের পক্ষে সংগ্রহের আশা করাও অসম্ভব ছিল। বাড়তি সুবিধা হিসেবে তিনি তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ ইউরোপীয় তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে। একটু বাঁকা চোখে দেখলে, এই প্রশংসাটিও আসলে একটি শ্রমবিভাজন নির্ধারণ করে দেয়। দেশীয় মানুষটি জোগাবেন তথ্য আর ঘনিষ্ঠতা, আর পশ্চিম জোগাবে তত্ত্ব আর সনদ।
তবে সততার খাতিরে মুখবন্ধের বাকি অংশটুকুও লিপিবদ্ধ করা দরকার। গ্রিয়ারসন স্বীকার করছেন, দুই একটি বিষয়ে চট্টোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে স্বচ্ছ যুক্তিতে দ্বিমত করেছেন। তিনি স্বীকারও করছেন, নিজের ভুল বিষয়ে তরুণ লেখক তাঁকে এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি। তারপর তিনি যোগ করছেন, জ্ঞানান্বেষীরা মাঝে মাঝে দ্বিমত না করলে বিদ্যার অগ্রগতিই হতো না, আর পরবর্তী বিবেচনায় চট্টোপাধ্যায় সঠিক প্রমাণিত হলে তিনিই সবার আগে অভিনন্দন জানাবেন। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক জরিপকর্তা লিখে রাখছেন যে এক দেশি পণ্ডিত তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, ছাপার অক্ষরে, সেই পণ্ডিতেরই বইয়ের শুরুর পৃষ্ঠায়। ওডিবিএলের যেকোনো বি-ঔপনিবেশিক পাঠকে দুটি সত্যই একসঙ্গে ধরে রাখতে হবে। বইটি একদিকে বাংলা ভাষার বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপ্রতিষ্ঠার কাজ, কারণ এক বাঙালি লিখলেন বাংলার সংজ্ঞাদায়ী ভাষাবিজ্ঞান। অন্যদিকে সেটি জ্ঞানতাত্ত্বিক আত্তীকরণেরও কাজ, কারণ তিনি তা করলেন সম্পূর্ণত উপনিবেশকের প্রত্যয়কাঠামোয়, উপনিবেশকের ভাষায়, উপনিবেশকের সনদব্যবস্থার ভেতরে। সমকালীন বয়ানচর্চার তাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ আমাদের মনে করিয়ে দেন, এমন কর্তৃত্বসম্পন্ন একটি পাঠ কেবল একটি ভাষার বর্ণনা দেয় না; বরং সেটি নির্ধারণ করে দেয়, ভাষাটি নিয়ে আদৌ কোন পরিভাষায় কথা বলা যাবে। একশো বছর ধরে ওডিবিএল স্থির করে রেখেছে বাংলার ইতিহাস বলতে কী বোঝায়, এ ঋণ অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই ইতিহাসের কেন্দ্র কলকাতা-নির্ভর প্রমিত বা মান ভাষা। এই শতবর্ষ তাই সঠিক মুহূর্ত এমন প্রশ্নগুলো উত্থাপনের। এই বই কার বাংলাকে নির্মাণ করে? কার বাংলাকে অদৃশ্য করে? আর সিলেট থেকে, চট্টগ্রাম থেকে, কিংবা রাজশাহীর কোনো সাঁওতাল পাড়া থেকে লেখা হলে এই ভাষার ইতিহাস দেখতে কেমন হতো? এমন প্রশ্ন আসুক, অন্তত সুনীতিকুমার এতে অখুশি হতেন না বলেই প্রতীয়মান হয়।
বিদ্যায়তনে কেমন এই শতবর্ষ
একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নও রয়ে যায়। আমাদের শিক্ষার্থীরা আসলে কীভাবে ওডিবিএলের মুখোমুখি হয়? অধিকাংশের ক্ষেত্রে উত্তরটি হলো, হয়ই না। তারা পায় সারসংক্ষেপের সারসংক্ষেপ। পরীক্ষার জন্য মাগধী প্রাকৃত থেকে নেমে আসা বংশলতিকাটি মুখস্থ করে তারা এগিয়ে যায়। দুই খণ্ড পড়ে থাকে সেমিনার লাইব্রেরিতে, কালেভদ্রে কেউ উল্টে দেখে, আগাগোড়া পড়ে প্রায় কেউই না। এটি একটি শিক্ষাগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যার পরিণতি সুদূরপ্রসারী। যে বই উদ্ধৃত হয় কিন্তু পঠিত হয় না, সে বই একটা সময়ে তথ্যনির্দেশের গ্রন্থে পরিণত হয়। তথ্যনির্দেশ ডেকে আনে শুধুই উদ্ধৃতি, আর কেবল উদ্ধৃতি রুদ্ধ করে দেয় সমালোচনার পথ। এই বইটির পুনঃপাঠ আমাদের একটি সরল সত্যে পৌঁছে দিয়ে যায়। কেবল ভূমিকাটুকুও যদি নিবিড়ভাবে পড়ানো হয়, আমাদের বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের, ভাষার ও সমাজতত্ত্বের যে সামগ্রিক শিক্ষা পাবে, তা আমাদের বর্তমান পাঠ্যতালিকার পূর্ণরূপের চেয়েও গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে। উদযাপনের শতবর্ষ যদি মূল্যবান কিছুই উৎপাদন করে, তবে তা হওয়া উচিত নিবিড় পাঠ — ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের প্রতিটা বিদ্যায়তনে যেখানে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
উপসংহারের বদলে যা হবে প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য
শেষের কথাটি বরং সংক্ষেপেই টানা যাক। তাহলে ওডিবিএল কেন আজও সমকালীন? সমকালীন, কারণ এর কোনো উত্তরসূরি আসেনি। সমকালীন, কারণ এটি একইসাথে দূরদর্শী এবং তর্কের সুযোগ রাখে। সবশেষে সমকালীন, কারণ এটি অপরীক্ষিত, আর এই তিনটি শর্ত পরস্পরসংলগ্ন। বাংলা ভাষার এই অবিস্মরণযোগ্য বইয়ের স্থান আমরা এখনো প্রামাণ্যভাবেই দেখছি, কেননা আমরা এই বইকে কখনো সত্যিকারভাবে ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনা আর তত্ত্বের নিরীক্ষায় আনিনি, তাই আসেনি কোনো যোগ্য জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরসূরি। ফলে, ভাষাবিজ্ঞানের আধুনিকতম বিশ্লেষণে বাংলা ভাষার বিচার এখনও অনুপস্থিত। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য শ্রদ্ধার্ঘ্য তাই আরেকটি স্মরণ আলেখ্য বা স্মৃতিকাতরতা নয়। তাঁর প্রাপ্য, তাঁর কাজের প্রতি নিখাদ সম্মান হবে সেই কাজটি করা, যা তিনি সম্ভব করে দিয়েছিলেন একশো বছর আগেই, আর আমরা ফেলে রেখেছি ঠিক সেভাবেই। এখন এই স্থবিরতার বদলে এগিয়ে নেয়ার এই কাজটি হলো বাংলাদেশের ভাষাগুলোর একটি ঐতিহাসিক বিবরণ, আর এখানে ভাষার সাথে বহুবচনটিও একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। সেটি লেখা হতে পারে স্থানিক বাংলাদেশ থেকেই; লেখা হবে বাংলায়, ইংরেজিতেও। সেটি ভাষাবলয়কে দেখবে ভাষাবলয় হিসেবে, স্তরভাষাকে দেখবে ভিত্তি হিসেবে, দূষণ হিসেবে নয়। আর মান ভাষাকে দেখবে অন্য সব আঞ্চলিক ভাষার সমগোত্রীয় একটি ভাষা হিসেবে। হতে পারে ভাষার ব্যাকরণিক বিচারের বর্ণনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়িয়ে সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ঘরানা পর্যন্ত নতুন ধারার বিস্তার। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই বইয়ের এগারোশো পৃষ্ঠা নিবেদন করেছিলেন প্রথম প্রয়াস হিসেবে, শেষ কথা হিসেবে নয়। পূর্বসূরির কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য একশো বছর যথেষ্ট সম্মানজনক সময়। শতবর্ষী ওডিবিএলের প্রতি প্রগাঢ় সম্মান জানানো এবং বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের প্রতি দায় মেটানোর ভাষাতাত্ত্বিক যাত্রাটা একই সমান্তরালে আনার সুন্দরতম সময়টা হতে পারে এই এখন, এই শতবর্ষেই।
