১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলা সংস্কৃতি: কৃষ্টি-আত্ম-অপর আখ‍্যান

যে তসলিমা একসময় বলেছিলেন লড়াইটা যুক্তিবাদ বনাম অন্ধবিশ্বাস; যিনি ভারতে হিন্দু মৌলবাদের উত্থানও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন; যিনি বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীর সমান অধিকারের কথা বলেছেন—সেই লেখকই যখন আজ বলেন, “হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি”, তখন অন্তত একটি গভীর বৌদ্ধিক সরে যাওয়া চোখে পড়ে।

অনামিকা বসুধা অনামিকা বসুধা

Published : 11 Oct 2026, 11:08 PM

Updated : 11 Oct 2026, 11:08 PM

“হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি”- তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় তাঁর নাস্তিকতা, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ লড়াই এবং নারীব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থানের মধ্য দিয়ে। যে মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার জন‍্য তিনি স্বদেশ থেকে বিতাড়িত- যিনি একজন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানের ছাত্র- তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থান ও কিছু বক্তব্য আজ আমাদের বারবার ভাবাচ্ছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি লিখেছিলেন:

“হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি।”

সঙ্গে তাঁর যুক্তি ছিল—বাঙালি ইতিহাসে যে ধর্ম বা দর্শনই গ্রহণ করুক না কেন, তার সাংস্কৃতিক শিকড় বাংলায়; বাঙালি মুসলমানও আরব সংস্কৃতির মানুষ নয়।

কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ২০২৬ সালেই তসলিমা আবার স্পষ্টভাবে বলেছেন—বাঙালি পরিচয় কোনো একটি ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, এমনকি ধর্মহীন মানুষও বাঙালি।

আমি দ্বিতীয় কথাটির সঙ্গে একমত।

আর ঠিক সেই কারণেই প্রথম কথাটি নিয়ে আমার আপত্তি ও তাঁর বর্তমান অবস্থান নিয়ে সংশয়।

কারণ বহুত্ব স্বীকার করা আর বহুত্বের একটি মাত্র “ভিত্তি” নির্ধারণ করা একই জিনিস নয়।

আপনি যদি বলেন বাংলা সংস্কৃতির ওপর কোনো ধর্মের একচেটিয়া মালিকানা নেই, কিন্তু পরের বাক্যেই বলেন একটি বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি তার “ভিত্তি”, তখন মালিকানা অস্বীকার করেও আপনি উৎসের একটি স্তরবিন্যাস তৈরি করছেন।

একটি সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে মূল।

বাকিরা হয়ে যাচ্ছে সংযোজন।

সমস্যাটা এখানেই।

বাংলা সংস্কৃতি কোনো গাছ নয়, যার কাণ্ড হিন্দু আর বাকিরা শাখা

বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসকে একটা গাছের মতো কল্পনা করা খুব সুবিধাজনক—যার হয়তোবা একটি “মূল” থাকবে, যেখান থেকে পরে নানা ডালপালা বেরোবে।

কিন্তু ইতিহাস আসলে তেমন নয়।

বাংলা-টা তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের মতই সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অনেক বেশি এক বদ্বীপের মতোই।

বাংলায় যেমন নদী এসেছে বিভিন্ন দিক থেকে। একটার জল আরেকটার সঙ্গে মিশেছে। পলি জমেছে। নদী পথ বদলেছে। নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে। তেমনই তার সংস্কৃতি ও কৃষ্টির পরিবর্তনের চলচ্ছবিটিও।

রিচার্ড ইটন-এর কথা বলা যেতে পারে যিনি তাঁর বিখ্যাত The Rise of Islam and the Bengal Frontier বইতে বাংলাকে বোঝাতে ধর্মান্তরকে নিছক “এক ধর্ম এসে অন্য ধর্মকে সরিয়ে দিল”—এই কাঠামোয় দেখেননি। কৃষি সম্প্রসারণ, নদীবাহিত নতুন বসতি, সুফি-পীরের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে বাংলার ইসলামি সমাজ গড়ে ওঠে তার ধারণা করেছেন।

তার মতো ভাবলে- বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি কোনো আমদানি-করা আরবীয় প্যাকেজ নয়।

কিন্তু তাই বলে সেটি “মূলত হিন্দু সংস্কৃতি”-ও নয়।

এটি বাংলার ইতিহাসের ভিতরেই তৈরি বাংলার ইসলাম।

নীলেশ বোস-ও ঔপনিবেশিক বাংলার মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস নিয়ে দেখিয়েছেন যে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় উত্তর ভারতের কোনো প্রস্তুত “মুসলিম পরিচয়” নকল করে তৈরি হয়নি; তা গড়ে উঠেছিল স্থানীয় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও আঞ্চলিক বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে গভীর কথোপকথনের মধ্যে।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আমি বলতে চাইছি- স্থানীয় হওয়া মানে হিন্দু-উৎসজাত হওয়া নয়।

আমরা যে বাংলা বলি, তার ভিতরেই ইতিহাস বসে আছে

আরেকটা খুব সহজ পরীক্ষা করা যাক।

আমাদের ভাষা।

বাংলা ভাষার শরীরেই তো বহু সভ্যতার দাগ আছে।

ফারসি সংস্কৃতি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে শতাব্দীর পর শতাব্দী গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ বাংলায় হাজার হাজার ফারসি-আরবি শব্দ ঢুকে গেছে।

আমরা বলি—

খবর, দরকার, বাজার, দোকান, কাগজ, দফতর, হিসাব, আদালত, রায়, হাজির, জবাব, সাহস, মেহনত, মজুরি—

এসব বলার সময় কি আমরা প্রতিবার ফারসি বা আরবি সংস্কৃতি পালন করছি?

না।

এগুলো এখন বাংলা হয়ে গেছে।

সংস্কৃতি ঠিক এভাবেই কাজ করে।

ধার নেয়।

বদলে দেয়।

নিজের করে নেয়।

আবার অন্যকে দেয়। চলতে থাকে-

সুতরাং সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা খোঁজা ইতিহাসের কাজ নয়। সেটা সাধারণত প্রকল্পনির্ভর রাজনীতির কাজ।

আউল- বাউল

আরও বড় সমস্যা হবে বাউলদের নিয়ে। তাদের তবে কোথায় রাখা হবে?

বাউল ঐতিহ্যকে হিন্দু না মুসলমান—কোন বাক্সে রাখবেন?

নৃতাত্ত্বিক গবেষণা দেখায়, বাউল ঐতিহ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব সহজিয়া, যোগ-তান্ত্রিক সাধনা এবং সুফি চিন্তা একসঙ্গে কাজ করেছে।

এটাই তো বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আশ্চর্য জিনিস।

যে জায়গায় রাষ্ট্র বা ধর্মীয় গোঁড়ামি বলে—

“তুমি হিন্দু না মুসলমান?”

তখন লোকসংস্কৃতি মাথা তুলে বলে—

“প্রশ্নটাই তো ভুল।”

আরো একটা উদাহরণ দিই— সুন্দরবনের বনবিবি ঐতিহ্যের দিকে তাকান। সেখানে মুসলমান এবং দলিত হিন্দু বনজীবী ও মৎস্যজীবীদের যৌথ আচারজগত নিয়ে গবেষণা দেখিয়েছে কীভাবে ইসলাম এবং হিন্দু লোকবিশ্বাস একে অপরের মধ্যে ঢুকে এমন একটি স্থানীয় জগৎ তৈরি করেছে, যাকে দুটো আলাদা ধর্মের সীমানা দিয়ে বোঝাই কঠিন।

তাহলে বনবিবি কার?

হিন্দু?

মুসলমান?

না কি বাংলার?

“সমন্বয়” কথাটা কি যথেষ্ট

এখানে আমি আরও এক ধাপ এগোব।

আমরা সহজে বলি বাংলা “সমন্বয়ী”—হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতি মিশেছে।

কিন্তু এটাও কখনো কখনো একটু সরল হয়ে যায়।

কারণ এতে মনে হয় আগে দুটি বিশুদ্ধ সংস্কৃতি ছিল—হিন্দু সংস্কৃতি এবং মুসলমান সংস্কৃতি—তারপর তারা এসে মিশল।

বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই সেই “বিশুদ্ধ” সংস্কৃতিগুলো নিজেরাই ইতিহাসের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

নৃতত্ত্ববিদ মাসাহিকো তোগাওয়া বাংলার যৌথ পীর-সন্ত উপাসনা নিয়ে কাজ করে দেখিয়েছেন, “সমন্বয়” শুধু দুই প্রস্তুত ধর্ম মেশার নাম নয়; আমাদের দেখতে হবে কোন সামাজিক পরিস্থিতিতে মানুষ একই আচার, পবিত্র স্থান ও সাংস্কৃতিক ভাষা ভাগ করে নিতে পারে।

অর্থাৎ বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস শুধু মিশ্রণ নয়।

এটা সহ-নির্মাণ।

এটি একে অপরকে তৈরি করার ইতিহাস।

এই “হিন্দু সংস্কৃতি” কী

একটু খুলে দেখা যাক- যখন কেউ বলেন “হিন্দু সংস্কৃতিই ভিত্তি”, তখন প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত:

কোন হিন্দু সংস্কৃতি?

শাক্ত?

বৈষ্ণব?

শৈব?

তান্ত্রিক?

ব্রাহ্মণ্য?

লোকায়ত?

বাউল?

সহজিয়া?

বেদান্ত?

গ্রামীণ দেবদেবীর ঐতিহ্য?

এগুলোর মধ্যে বহু ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে গভীর মতপার্থক্য আছে।

ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার-এর খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বহুবার দেখিয়েছেন যে হিন্দুত্ব আর হিন্দুধর্ম এক জিনিস নয়।

তাঁর যুক্তি হলো, ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ধর্মাচরণ ছিল বহুধারার; আধুনিক হিন্দুত্ব সেই বহুত্বকে একটি একরৈখিক রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি একে “সংগঠিত বা কেন্দ্রীভূত হিন্দুধর্ম নির্মাণের প্রবণতা” হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

এই পার্থক্য না করলে “হিন্দু সংস্কৃতি” কথাটা খুব সহজেই একটি বিশাল, বহুবিচিত্র ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে এক ধরনের সমরূপ রাজনৈতিক শ্রেণিতে পরিণত হয়।

এখানেই আজকের পরিচয়ের রাজনীতি ঢুকে পড়ে।

ঔপনিবেশিক আধুনিকতার কথা

আমরা আজ যেভাবে ধর্মকে পরিচ্ছন্ন, আলাদা বাক্স হিসেবে ভাবি—হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান—এটাও ইতিহাসের বাইরে নয়।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন, জনগণনা, আইন এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের মাধ্যমে উনিশ শতকে ধর্মীয় পরিচয় অনেক বেশি কঠোর ও গণনাযোগ্য হয়ে ওঠে।

রোমিলা থাপারও মনে করিয়ে দেন যে “হিন্দুধর্ম”-কে একক, সমজাতীয় ধর্ম হিসেবে সাজানোর প্রবণতার সঙ্গে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আর পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নিজেই “ঐতিহ্য” নতুন করে নির্মাণ করেছিল—বিশেষ করে সংস্কৃতি, গৃহ, নারী, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদিকে জাতির খাঁটি অন্তর্লোক হিসেবে স্থাপন করে।

অর্থাৎ আমরা যাকে সনাতনী “চিরন্তন সংস্কৃতি” বলে ভাবছি, তার অনেকটাই আসলে আধুনিক নির্মাণ।

এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে তার কোনো অতীত নেই।

তার অর্থ হল—

অতীতকে আমরা কীভাবে সাজিয়ে বর্তমানের পরিচয় বানাচ্ছি, সেটাই রাজনীতি।

“ভিত্তি” শব্দটি কি নিরীহ

“বাংলা সংস্কৃতিতে হিন্দু ঐতিহ্যের প্রভাব আছে”—এটা ঐতিহাসিক বক্তব্য।

“বাংলার বহু উৎসব, সাহিত্যরীতি, আচার এবং নান্দনিক ঐতিহ্য হিন্দু ধর্মীয় ইতিহাস থেকে এসেছে”—এটাও ঐতিহাসিক বক্তব্য।

কিন্তু—

“হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি”

আরেক ধরনের বক্তব্য।

কারণ এখানে প্রভাব থেকে চলে যাওয়া হচ্ছে উৎপত্তির বংশসূত্রে।

বংশসূত্র থেকে অগ্রাধিকারে।

অগ্রাধিকার থেকে খুব সহজেই মালিকানায়।

এবং মালিকানা থেকে নাগরিকত্বের স্তরবিন্যাস তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগে না।

প্রথমে বলা হয়:

“তোমাদের সংস্কৃতিও আসলে আমাদের থেকেই এসেছে।”

তারপর:

“তোমরা এখানে আছ, কিন্তু মূল আমরা।”

তারপর:

“তোমাদের আনুগত্য প্রমাণ করতে হবে।”

এটাই সাংস্কৃতিক সংখ্যাগুরুবাদের পরিচিত ব্যাকরণ।

“কিন্তু মুসলমানরা তো পরে এসেছে”—

এটাও খুব শোনা কথা। প্রায়ই শোনা যায়। এই যুক্তিরও সমস্যা আছে।

প্রথমত, বাংলার মুসলমান জনসংখ্যার বিরাট অংশ কোনো বিদেশি বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠী নয়। ইটন-এর গবেষণা বাংলার ইসলামায়নকে দীর্ঘ কৃষিভিত্তিক ও আঞ্চলিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করে; অর্থাৎ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক রূপান্তরের গল্প এটি।

দ্বিতীয়ত, সংস্কৃতির বৈধতা কে আগে এসেছে তার ওপর নির্ভর করে না।

নইলে ইংরেজি শিক্ষা বাদ দিতে হবে।

চা বাদ দিতে হবে।

কলকাতার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য বাদ দিতে হবে।

মুদ্রণযন্ত্র বাদ দিতে হবে।

আধুনিক বাংলা গদ্যের বিশাল অংশ বাদ দিতে হবে।

ব্রাহ্ম আধুনিকতা বাদ দিতে হবে।

সিনেমা বাদ দিতে হবে।

কারণ সংস্কৃতি কোনো পুরাতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতার পরীক্ষা নয়।

বাংলা সংস্কৃতির আরেকটি বিশাল উৎস—ধর্মের বাইরেই

আর আমার মনে হয় এখানেই আমাদের আলোচনার সবচেয়ে বড় অদেখা জায়গা।

আমরা কেন ধরে নিচ্ছি সংস্কৃতির প্রধান উৎস ধর্মই হতে হবে?

বাংলা সংস্কৃতি তৈরি করেছে—

নদী।

বর্ষা।

ধান।

পাট।

মাছ।

দুর্ভিক্ষ।

নৌকা।

বন্দর।

কৃষক।

তাঁতি।

কারিগর।

শ্রমিক।

নারীর গার্হস্থ্য জগৎ।

দেশভাগ।

অভিবাসন।

কলকাতার ঔপনিবেশিক আধুনিকতা।

গ্রামের মৌখিক সংস্কৃতি।

মুদ্রণযন্ত্র।

থিয়েটার।

সিনেমা।

কমিউনিজম।

নারীবাদ।

নাস্তিকতা।

বিজ্ঞানমনস্কতা।

ভাষা আন্দোলন।

এগুলোর অনেকগুলিই হিন্দু বা মুসলমান নয়।

এগুলো সবই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা।

সংস্কৃতি ধর্মের অধীন কোনো উপবিভাগ নয়।

ধর্ম সংস্কৃতির একটি মাত্র উপাদান।

এই কথাটি না বললে আমরা অজান্তেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তৈরি কাঠামোর মধ্যেই তর্ক করতে থাকবো।

তারপর রবীন্দ্রনাথ

আজ যদি বাঙালি সংস্কৃতিকে ধর্মীয় বংশপরিচয় দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও অস্বস্তি তৈরি হবে।

রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বহুত্ব, বিশ্বমানবতা এবং হিন্দু-মুসলমান সহাবস্থান—একক ধর্মীয় জাতির ধারণা নয়।

তিনি ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মেছিলেন—এটা সত্য।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক জগৎ কি “ব্রাহ্ম সংস্কৃতি” দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায়?

বাউল ছাড়া রবীন্দ্রনাথ সম্ভব?

পাশ্চাত্য সঙ্গীত ছাড়া?

ব্রাহ্ম চিন্তা ছাড়া?

হিন্দু আচার - ধর্মীয় ধারণা ছাড়া?

বাংলার গ্রামজীবন ছাড়া?

উপনিষদ ছাড়া?

ইউরোপীয় সাহিত্য ছাড়া?

ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিরুদ্ধে তাঁর সমালোচনা ছাড়া?

এই তো সংস্কৃতি।

এটি তাই কোন বংশধারা নয়। এটি হল সাক্ষাৎ, সংঘর্ষ ও বিনিময়ের মিশ্রণ।

এবং নজরুল

নজরুলকে তবে আমরা কোথায় রাখব?

যিনি একই কবিতার জগতে আল্লাহ, কালী, কৃষ্ণ, মুহাম্মদ, শিব—সবাইকে নিয়ে আসেন?

তাঁর শ্যামাসঙ্গীত কি তবে হিন্দু সংস্কৃতি?

তাঁর ইসলামী গান শুধুই মুসলমান সংস্কৃতি?

না কি দুটিই বাংলারই সংস্কৃতি?

একজন মানুষই যদি পরিচ্ছন্ন ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে দেন, একটা গোটা সভ্যতাকে কীভাবে একটি ধর্মীয় ভিত্তি দিয়ে বোঝানো যাবে?

তসলিমার বক্তব্যের ভিতরের আসল অসঙ্গতি যা

এবার আবার তাঁর কথায় ফিরি।

আমি বলব না যে তসলিমা বাঙালির বহুত্ব অস্বীকার করছেন।

তিনি তা করেননি।

বরং তিনি বলেছেন ধর্মহীন বাঙালিও বাঙালি।

কিন্তু এই কারণেই তাঁর “হিন্দু সংস্কৃতিই ভিত্তি” কথাটি আরও সমস্যাজনক।

কারণ এখানে একটি ধারণাগত স্খলন ঘটছে।

অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সমতা, কিন্তু উৎসের ক্ষেত্রে স্তরবিন্যাস।

সবাই বাঙালি—

কিন্তু একজনকে করা হচ্ছে “মূল” সাংস্কৃতিক পূর্বপুরুষ।

অন্যরা যেন সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো।

আমার আপত্তি এখানেই।

কারণ বহুত্ব শুধু সবাইকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া নয়।

বহুত্ব মানে ঘরটার মালিক একজন নয়।

হিন্দুত্বের ভাষার সঙ্গে এই বক্তব্যের কোথায় সাযুজ্য তৈরি হয়?

এখানেও সতর্ক হওয়া দরকার।

তসলিমার কোনো বক্তব্য হিন্দুত্ববাদী ভাষ্যের সঙ্গে মিলে গেলেই তাঁকে RSS সদস্য বা BJP-র সহযোগী বলা যায় না। তার জন্য আলাদা প্রমাণ লাগবে।

কিন্তু একটি ভাষ্য অন্য একটি ভাষ্যের সঙ্গে কোথায় মিলে যাচ্ছে, সেটা অবশ্যই বিশ্লেষণ করা যায়।

হিন্দুত্বের অন্যতম কেন্দ্রীয় কৌশল হল ভারতের বহু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক বৃহৎ হিন্দু সভ্যতাগত বংশপরম্পরার মধ্যে আত্মসাৎ করা।

Savarkar নিজেই Hindutva এবং Hinduism-কে এক করেননি; Hindutva তাঁর কাছে বিশ্বাসের চেয়ে বড় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল। পরে RSS-এর চিন্তাবিদেরা এই সমরূপতার ধারণাকে আরও জোরালো করেন।

তাই যখন বলা হয়—

মুসলমান বাঙালিও আসলে হিন্দু সাংস্কৃতিক ভিত্তির সন্তান—

কথাটা দেখতে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।

কিন্তু এর ভিতরে একটি আত্মসাৎমূলক ইঙ্গিত আছে:

তুমি থাকতে পারো—যতক্ষণ তোমার ইতিহাসের মূলটাকে আমি সংজ্ঞায়িত করি।

এখানেই প্রশ্নটা জরুরি।

ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার একটি বিষয়ে সতর্কতা করে দিয়েছেন- আমার মনে হয় সেটি মনে রাখা দরকার।

তিনি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার কথা বলেছেন—জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এমন এক “চিরকাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত গৌরবময় সত্তা” হিসেবে কল্পনা করা, যার ভিতরের সমস্যা যেন আসে শুধু বাইরের আক্রমণ বা আধিপত্য থেকে।

এই কাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

কারণ তখন ইতিহাস খুব সহজ হয়ে যায়।

একটা বিশুদ্ধ “আমরা”।

একটা বহিরাগত।

একটা স্বর্ণযুগ।

একটা দূষণ।

তারপর পুনরুদ্ধার।

কিন্তু বাংলার ইতিহাস এই ছিমছাম গল্পটাকে বারবার ভেঙে দেয়।

এখানে বহিরাগত এসে আপন হয়েছে।

আপন অন্য বহিরাগতের ভাষা নিজের করেছে।

ধর্ম লোকসংস্কৃতির কাছে বদলেছে।

ভাষা বিজেতার শব্দ খেয়ে ফেলেছে।

আর মানুষ ধর্মীয় গোঁড়ামির সীমানা পেরিয়ে কতশত গান গেয়েছে।

তাহলে বাংলা সংস্কৃতির “ভিত্তি” কী?

আমার উত্তর:

একটা কোনো ভিত্তি নেই।

এটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে অসুবিধাজনক সত্য।

বাংলা সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মের কন্যা-সংস্কৃতি নয়।

এটি বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য, শাক্ত, বৈষ্ণব, ইসলামি, সুফি, ফারসি-প্রভাবিত, বাউল, লোকায়ত, আদিবাসী, ঔপনিবেশিক, খ্রিস্টীয়, ব্রাহ্ম, নাস্তিক, যুক্তিবাদী, মার্ক্সবাদী, নারীবাদী, আধুনিকতাবাদী এবং আরও অসংখ্য ধারার সংঘর্ষ, ধার নেওয়া, দরকষাকষি ও সহাবস্থানের ফল।

এবং তারও আগে—

এটি নদী, ভূমি, ভাষা, শ্রম ও মানুষের ইতিহাস।

এই জন্যই আমি “হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি” কথাটাকে শুধু একটি নিরীহ ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে নিতে পারি না।

কারণ প্রভাবকে ভিত্তি বলা মানে ইতিহাসের একটি অংশকে বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত বংশপরিচয় দেওয়া।

আর বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত বংশপরিচয় খুব দ্রুত বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত মালিকানায় পরিণত হতে পারে।

আমার আপত্তি হিন্দু ঐতিহ্যের উপস্থিতিতে নয়।

তার উপস্থিতি বিপুল, গভীর—অস্বীকার করার প্রশ্নই নেই।

আমার আপত্তি তার একচ্ছত্র বংশসূত্র নির্মাণে।

বাংলার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্ব যদি কিছু থাকে, সেটা বিশুদ্ধতায় নয়।

তার অবিশুদ্ধতায়।

তার ধার নেওয়ায়।

তার মিশে যাওয়ায়।

তার তর্কে।

তার বিদ্রোহে।

তার নাস্তিকতায়।

তার ধর্মে।

তার ধর্মত্যাগে।

তার বাউলে।

তার পীরের মেলায়।

তার দুর্গাপুজোয়।

তার মহরমে।

তার রবীন্দ্রনাথে।

তার নজরুলে।

তার লালনে।

তার ভাষায়।

এবং সেই ভাষার একটা বাক্যেই হয়তো পুরো কথাটা বলা যায়—

বাংলা সংস্কৃতির কোনো একক মালিক নেই, কারণ বাংলা সংস্কৃতির কোনো একক জন্মদাতাও নেই।

আর বহুত্বের অর্থও ঠিক সেটাই:

সবাইকে একই “মূল”-এর সন্তান ঘোষণা করা নয়; বহু মূলের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া।

নথি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। ২০১৫ সালে তসলিমা নিজেই ভারতে “হিন্দু ধর্মান্ধদের” উত্থান, যুক্তিবাদীদের হত্যা এবং গোমাংসকে কেন্দ্র করে হত্যার সমালোচনা করেছিলেন; বলেছিলেন, এমন অসহিষ্ণু ভারত নিয়ে তিনি গর্ব করতে পারেন না। তাঁর পুরনো অবস্থানেও লড়াইটাকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম মৌলবাদ, যুক্তিবাদ বনাম অন্ধবিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তারপর ২০২৫ সালে আমরা পাই সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটি বক্তব্য:

“হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি।”

শুধু তাই নয়—তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান এবং নাস্তিক বাঙালিদের পূর্বপুরুষদেরও “সবাই, অথবা প্রায় সবাই, ভারতীয় হিন্দু” বলে বর্ণনা করেন।

আমার আপত্তিটা এখানেই আরও গভীর। এটি হিন্দুধর্মের পক্ষে কথা বলা নয়। আমার পাঠে, এটি এমন এক সভ্যতাগত বংশপরিচয় নির্মাণের ভাষা, যা আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত যুক্তির সঙ্গে মিলে যায়—ভারতের বহুবিধ মানুষ, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে শেষ পর্যন্ত একটি “হিন্দু” উৎসের সন্তান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা।

তসলিমা সেই রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য কি না, বিজেপির সঙ্গে তাঁর কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক আছে কি না—সেটা আলাদা প্রশ্ন, এবং তার প্রমাণও আলাদা লাগবে। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য যে হিন্দুত্বের আত্মসাৎমূলক ভাষ্যকে শক্তি জোগায়, সেই সাযুজ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ বৈধ।

আর এখানেই তাঁর অতীতকে সামনে আনতে হবে।

এই তসলিমাকে তাঁর নিজের অতীতের তসলিমার পাশে বসিয়ে দেখুন। যে তসলিমা একসময় বলেছিলেন লড়াইটা যুক্তিবাদ বনাম অন্ধবিশ্বাস; যিনি ভারতে হিন্দু মৌলবাদের উত্থানও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন; যিনি বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীর সমান অধিকারের কথা বলেছেন—সেই লেখকই যখন আজ বলেন, “হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি”, তখন অন্তত একটি গভীর বৌদ্ধিক সরে যাওয়া চোখে পড়ে।

তিনি এখনও ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষা বলেন; কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি সাংস্কৃতিক বংশপরম্পরা উচ্চারণ করছেন, যা ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদকে ভিতর থেকেই স্তরবিন্যাসে বদলে দেয়। আমার উদ্বেগ ঠিক সেখানেই।

হিন্দুত্বের সাফল্য তখনই সম্পূর্ণ হয় না যখন একজন মানুষ নিজেকে হিন্দুত্ববাদী ঘোষণা করেন। তার বড় সাফল্য ঘটে তখন, যখন তার ইতিহাস-বোধ, তার শব্দভাণ্ডার, তার “কে মূল আর কে পরে এসেছে”—এই ধারণাগুলো এমন মানুষের মুখেও স্বাভাবিক শোনাতে শুরু করে, যিনি একদিন সেই ধরনের ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন।

সেখানে দাঁড়িয়ে বাংলা সংস্কৃতির মূল ও অতীত খুঁজতে এসে তসলিমা সম্ভবত নিজের স্বপরিচয়ের নাস্তিক ধর্মনিরপেক্ষ মূল ও অতীতটিকেই গুলিয়ে ফেললেন ।