রবীন্দ্র প্রতিকৃতিতে কালির পোঁচ: সংস্কৃতির দেয়ালে বিভাজনের দাগ
দেয়ালে আঁকা প্রতিকৃতিতে কালির দাগ হয়তো সহজেই মুছে ফেলা যায়, কিন্তু সমাজের মনে যে বিভাজনের দাগ কেটে দেওয়া হয়, তা মুছতে প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সময়, উদার চিন্তার আর সম্মিলিত উদ্যোগের।
শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে দেওয়ার ঔদ্ধত্য নিছক কোনো সাময়িক আক্রোশ নয়। ঘটনাটি আদতে আমাদের জাতীয় মনন, সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তাকে কি ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতায় মেপে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে? সংস্কৃতিকে আমরা কীভাবে দেখব, ইতিহাসের কোন অংশকে ধারণ করব আর কোন অংশকে বর্জন করব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে কেমন পরিচয় তুলে দিয়ে যাব; ওই পুরোনো রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ এই ঘটনা।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম কলকাতায়, বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এই ভৌগোলিক সত্য নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু জন্মস্থান দিয়েই কি একজন মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সীমানা টানা যায়? কাজী নজরুল ইসলামের জন্মও বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান এলাকায়, অথচ তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এই দুই উদাহরণই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানার খাঁচায় বন্দী থাকে না।
তাহলে নজরুলকে আমরা গ্রহণ করব, অথচ রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার কথা উঠবে কেন? একইভাবে সত্যজিৎ রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়ন যদি তাদের জন্মস্থান দিয়ে শুরু হয়, তবে তো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অখণ্ড ঐতিহ্যকেই সংকুচিত করে ফেলতে হবে। কোনো কবি, সাহিত্যিক বা শিল্পীকে গ্রহণ কিংবা বর্জনের ক্ষেত্রে তার জন্মস্থান, ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, বরং তার সৃষ্টিকর্ম ও অবদানই হওয়া উচিত মূল মানদণ্ড।
রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করার অর্থ কিন্তু তার সব চিন্তার সঙ্গে একমত হওয়া নয়। তার সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, তার রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু যুক্তি আর আলোচনার পথ ছেড়ে তার গ্রাফিতিতে কালি লেপন তো অন্য বার্তা দেয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, আপত্তি কি তার কোনো নির্দিষ্ট লেখা বা বক্তব্যের ওপর, নাকি বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে তার স্থায়ী উপস্থিতিটার ওপরই?
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সাংস্কৃতিক বিভাজনের বিষয়টিকে গভীরভাবে বোঝা জরুরি। কারণ, সমাজ কিন্তু সব সময় সরাসরি সংঘাতের মধ্য দিয়ে বিভক্ত হয় না। বিভাজন তৈরি হয় মানুষের ইতিহাসবোধ, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণাগুলো বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। একটা সমাজকে যখন শেখানো হয় যে তার ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট কোনো অংশ গ্রহণযোগ্য, আর কোনোটা বর্জনীয়, তখন ধীরে ধীরে তার সম্মিলিত আত্মপরিচয়ে ফাটল ধরতে শুরু করে।
এই প্রবণতার পেছনে রাজনীতিও সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কৃতি যেমন মানুষের আবেগ আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তেমনি অতীতকে মানুষ যেভাবে দেখে, বর্তমানকে সেভাবেই বিচার করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবনা সাজায়। ফলে, সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারলে মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও নিজের মতো করে প্রভাবিত করা সহজ হয়।
বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে যদি এভাবে একের পর এক গুণী ব্যক্তিত্ব, শিল্প-সাহিত্যের মৌলিক ধারা আর ঐতিহাসিক সত্যকে ছেঁটে ফেলা হয়, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আত্মপরিচয়ের সংকট মারাত্মক রূপ নেবে। ইতিহাসের বহুমাত্রিকতার জায়গায় জেঁকে বসবে সংকীর্ণ এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, মত ও ধারার মানুষের অবদান আড়ালে পড়ে যাবে। এর ফলে সমাজের মানুষের ভেতর পারস্পরিক দূরত্ব আর অবিশ্বাসের বিস্তার ঘটতে পারে। এমন বিভাজন একসময় এতটাই গভীরে চলে যাবে যে, মানুষে মানুষে সহাবস্থান আর আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে লেগে যাবে দীর্ঘ সময়।
সাংস্কৃতিক বিভাজনের বিপদটা ঠিক এই জায়গাতেই। কে রবীন্দ্রসংগীত শুনবে আর কে শুনবে না, কিংবা কে কোন সাহিত্য পড়বে, তা যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটা দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কি একে অপরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করতে শিখব, নাকি ধর্ম ও মতাদর্শের দেয়াল তুলে ওই উত্তরাধিকারকে ভাগ করে ফেলব? আমাদের বহুত্ববাদী সমাজের ভবিষ্যৎ কিন্তু ওই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।
নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থেই যে সাংস্কৃতিক বিভাজনকে ব্যবহার করা হতে পারে, ওই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলে দেওয়া, সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোকে বিতর্কিত করা কিংবা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা প্রায়শই কোনো না কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হয়ে ওঠে। তাই এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; এর সামাজিক প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে।
তাই রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শুধু একজন কবিকে অস্বীকার করার বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে থাকা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রবাহকেও আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
রবীন্দ্রনাথ তার ‘জাতীয়তাবাদ’ গ্রন্থে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও ক্ষমতার দম্ভের সমালোচনা করেছেন। ‘গীতাঞ্জলি’-এর ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতায় তিনি এমন এক মুক্ত সমাজের স্বপ্ন এঁকেছিলেন, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে, জ্ঞানের চর্চা করবে এবং ভয়হীন চিত্তে সত্যকে খুঁজবে। তার এই রাষ্ট্রচিন্তা আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, জীবনানন্দ কিংবা সত্যজিৎ রায়কে মূল্যায়ন করতে হবে তাদের সৃষ্টিকর্ম ও কালজয়ী অবদানের আলোয়। তাদের জন্মস্থান কিংবা ধর্মীয় পরিচয়কে যদি প্রধান মাপকাঠি বানানো হয়, তবে বাংলা সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও ঐতিহাসিক গভীরতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ বজায় রাখা, যেখানে ধর্ম, মত ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের পার্থক্য সত্ত্বেও সবাই নিজেদের একই ইতিহাসের অংশ মনে করবে। সাংস্কৃতিক বিভাজন ওই ঐক্যের ভিতটা দুর্বল করে দেয়, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায়। একসময় ভিন্নমতের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও উঠে যায় এবং সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়। এর দায় শুধু বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও টানতে হয় এক খণ্ডিত ইতিহাস ও সংকীর্ণ পরিচয় নিয়ে। ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্পরিক আস্থা আর সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন। তাই সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রক্ষা করা মানে শুধু অতীত ঐতিহ্য বাঁচানো নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক উদার ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাও।
দেয়ালে আঁকা প্রতিকৃতিতে কালির দাগ হয়তো সহজেই মুছে ফেলা যায়, কিন্তু সমাজের মনে যে বিভাজনের দাগ কেটে দেওয়া হয়, তা মুছতে প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সময়, উদার চিন্তার আর সম্মিলিত উদ্যোগের। দিনশেষে একটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না; তা গড়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে। আর ওই পরিচয় রক্ষার শক্তিটাও মানুষের ভেতরেই থাকে। জয় হোক মানুষের।
রহমান লেনিন: স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক। ই-মেইল: rahmanlenin21@gmail.com
